ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

দি লক্ষণ দাস সার্কাস

পাকিদের হাত থেকে রেহাই পায়নি নিরীহ প্রাণীও

খোকন আহম্মেদ হীরা

প্রকাশিত: ২৩:২০, ২৪ জানুয়ারি ২০২৩

পাকিদের হাত থেকে রেহাই পায়নি নিরীহ প্রাণীও

দি লক্ষণ দাস সার্কাসের শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর কসরত ও হাতির ফুটবল খেলা

ছোটবেলা থেকেই লক্ষণ দাস শারীরিক কসরত দেখিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। যৌবনে তিনি ছিলেন একজন কুস্তিগির। একসময় যাদু দেখাতেন। নানাগুণে গুণান্বিত মানুষটি ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘লক্ষণ দাস সার্কাস’। পরে সেটিই রয়েল পাকিস্তান সার্কাস নামে পরিচিতি পায়। স্বাধীনতার পর এ দলের নাম হয় ‘দি রয়েল বেঙ্গল লক্ষণ দাস সার্কাস’। বর্তমানে রয়েল বেঙ্গল না থাকায় ‘দি লক্ষণ দাস সার্কাস’ নামে যার নামকরণ করা হয়েছে। মেধা, পরিশ্রম ও দক্ষতার অনবদ্য মিশেলে সার্কাস দলটির সুনাম ছড়িয়েছিল সারাদেশে। 
একইসঙ্গে বরিশালের গৌরনদীকে সারাদেশের মানুষ আলাদা করে চিনত দি লক্ষণ দাস সার্কাসের কারণে। সার্কাস দলটি একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এ কারণে পাক সেনাদের নির্মম বুলেটে প্রাণ দিতে হয়েছে সার্কাসের প্রতিষ্ঠাতা লক্ষণ দাসকে। ওইসময় ঘাতকের বুলেট থেকে রেহাই পায়নি লক্ষণ দাসের প্রিয় পোষা হাতি বাতাসীসহ সার্কাসের নিরীহ প্রাণীগুলো।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে লক্ষণ দাসের ছেলে অরুণ চন্দ্র দাস, বীরেন চন্দ্র দাস, চূড়ামণি দাস, খোকন চন্দ্র দাস ও নিমাই চন্দ্র দাস সার্কাসটি পুনরুজ্জীবিত করেন। অরুণ নিজেও একজন সার্কাসশিল্পী। গোলাকার বৃত্তে মোটরসাইকেল চালানোয় পারদর্শী। সবার সহযোগিতায় অল্পদিনেই সার্কাস দলটি দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে কালের বিবর্তনে আকাশ সংস্কৃতির যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে একসময়ের লোকজ সংস্কৃতির জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম সার্কাস শিল্প।

বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজো লক্ষণ দাস সার্কাসের নিভু নিভু আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন প্রতিষ্ঠাতার দুই ছেলে। অতিসম্প্রতি সরকারি অর্থায়নে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রের সূত্রে আবারও আলোচনায় এসেছে দি লক্ষণ দাস সার্কাসের অতীত ইতিহাস। এছাড়াও বিগত তিন বছর পর সার্কাস প্রদর্শনের জন্য প্রশাসনের অনুমতি মিলেছে। আগামী ২৮ জানুয়ারি থেকে এক মাসব্যাপী দেশের ঐতিহ্যবাহী দি লক্ষণ দাস সার্কাসের প্রদর্শন করা হবে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ২২৮তম বাৎসরিক সূর্যমণি মেলার মাঠে।  
পুরনো স্মৃতি ॥ সু-বিশাল সাতটি বড় নৌকার বহর ছিল লক্ষণ দাসের। ৮০ থেকে ৯০ জন খেলোয়াড়, কলাকৌশলী ছিলেন ওই দলে। এছাড়া হাতি, বাঘ, ভালুকসহ প্রায় ১৫ প্রজাতির প্রশিক্ষিত জীবজন্তু ছিল নানা খেলা দেখানোর জন্য। বৃহত্তর বরিশালসহ দেশের বিভিন্নস্থানের নদীর তীরবর্তী এলাকায় সার্কাস প্রদর্শন করা হতো। বিভিন্ন মেলায় প্রতিদিন তিন থেকে চারটি শো-হতো।
অস্তিত্ব সংকটে ॥ গৌরনদীর দক্ষিণ পালরদী গ্রামে ৩৫ একর জমিতে লক্ষণ দাসের বাড়ি। বছরে শুধু রমজান মাসে সার্কাসের সবাইকে নিয়ে বাড়িতে কাটাতেন লক্ষণ দাস। সেই বাড়িটি এখন নীরব। দীর্ঘদিন সার্কাস বন্ধ থাকায় লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হচ্ছে। 
প্রাণ নিল পাক সেনারা ॥ মুক্তিযুদ্ধের সময় সরকারি গৌরনদী কলেজে পাকিস্তানি হানাদারদের সবচেয়ে বড় স্থায়ী ক্যাম্প ছিল। ক্যাম্পের অদূরেই দক্ষিণ পালরদী গ্রামে লক্ষণ দাসের বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করায় লক্ষণ দাসকে হত্যার ছক কষে স্থানীয় রাজাকাররা। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পাশের আগৈলঝাড়া উপজেলার কোদালধোয়া 
এলাকায় স্ত্রী লীলা দাস, বড় ছেলে অরুণ দাসসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে লক্ষণ দাস আশ্রয় নেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সেখানেই লক্ষণ দাসকে হত্যা করে পাক সেনারা। সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তার বড় ছেলে অরুণ চন্দ্র দাস।
ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা ॥ লক্ষণ দাসের জ্যেষ্ঠপুত্র অরুণ ও দ্বিতীয় ছেলে বীরেন চন্দ্র দাস বর্তমানে সার্কাস দলটি পরিচালনা করছেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নিজাম উদ্দিনের নগদ ১০০ টাকা আর কয়েকটি হলুদ রঙের তাবু এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মেজর (অব.) শাহ আলম তালুকদারের সহযোগিতা আর মা লীলা দাসের কিছু অলঙ্কার বিক্রির টাকাই ছিল তাদের শেষ সম্বল। পরবর্তীতে সহোদর অন্যান্য ভাইদের সহযোগিতায় সার্কাসটি পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমেই অল্পদিনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

×