ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

রুমকির পাখিরা

অজিতা মিত্র

প্রকাশিত: ০১:৫১, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

রুমকির পাখিরা

.

রুমকির সংগ্রহে ছয়টি পাখি আছে। এরা খুব মিষ্টি সুরে কিচিরমিচির করে। খাঁচার ভেতরেই একটু পর পর ওড়াউড়ি করে। খুটুরখাটুর করে খাবার খায়। ছোট্ট জলের পাত্রে ঠোঁট ডুবিয়ে জল খায়, ডানা ঝাপটায়। এসব দেখে রুমকি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। পাখিদের খাবার দিতে সবচেয়ে ভাল লাগে তার। কিন্তু এই পাখিরা কথা বলতে পারে না। রুমকির ইচ্ছে, একটি পাখি অন্তত তার সঙ্গে কথা বলুক, রুমকি রুমকি বলে ডাকুক। সে শুনেছে ময়না পাখি নাকি কথা বলতে পারে। আসছে জন্মদিনে সে নানাভাইকে বলে রেখেছে একটি ময়না পাখি কিনে দিতে। জন্মদিন আসতে এখনও সাতাশ দিন বাকি। সাতাশ দিন পার হলেই আনন্দ।
বাবা আজ আরও বড় আনন্দের সংবাদ দিলেন। সবাই মিলে কক্সবাজারে যাওয়া হবে। মনে মনে অনেক পরিকল্পনা করে ফেলে রুমকি। সমুদ্র সৈকতে শামুক ঝিনুক কুড়াবে, ঝিনুকের পুতুল কিনবে। একটি বার্মিজ ছাতা কিনে মাথায় দিয়ে সৈকতে হেঁটে বেড়াবে। আরও খুঁটিনাটি পরিকল্পনায় সাতাশ দিনের হিসেবটা সহজ হয়ে যায়।
বাবা-মা আর রুমকি কক্সবাজারে এসে পৌঁছেছে আজ সকালে। হোটেলে পৌঁছেই রুমকি বাইরে যাওয়ার জন্য উসখুস করতে লাগল। মা বললেন, এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। না হলে শরীর খারাপ হতে পারে। মায়ের কথায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও রুমকি ঘুমিয়ে পড়ে। দেড় ঘণ্টা পরে তার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলেই সে মাকে ডেকে বলে, মা ওঠো, চলো বাইরে যাই এবার। মা-বাবা দুজনই ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে, বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে। বাবা বললেন, রুমকি, আরও একটু ঘুমাও। বৃষ্টিতে বাইরে বের হওয়া যাবে না। রুমকির মন খারাপ হয়ে যায়। তবু কী আর করা। চুপচাপ শুয়েশুয়ে পাখিদের কথা মনে পড়ে। জরিনা খালা পাখির খাঁচাগুলো সরিয়ে নিয়েছে তো? নাকি ওরা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। খুব চিন্তা হয় তার। সে মায়ের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে জরিনা খালাকে ফোন করে। খালা জানায়, ঢাকায় এখন বৃষ্টি হচ্ছে না। শুধু আকাশ মেঘে ঢেকে আছে। রুমকি পাখিদের খবর জানতে চায়, নিশ্চিন্ত বোধ করলেও তার খুব ইচ্ছে জাগে পাখিদের খাবার দিতে, কিচিরমিচির শুনতে। কিন্তু কিছুই করার নেই। মনটা আরও খারাপ হয়ে যায় তার।
বৃষ্টি আর বাতাস কিছুটা কমেছে, কিন্তু থামেনি। কক্সবাজারে আট নম্বর বিপদসংকেত ঘোষণা করা হয়েছে। রুমকি অপেক্ষা করতে করতে আরও অবসন্ন হয়ে পড়ে। সারাদিন কেটে যায়, সন্ধ্যা কেটে যায়। হোটেলের লবিতে খেলতে তার মোটেই ভাল লাগে না। দৌড় দেওয়া ছাড়া কিছু খেলারও উপায় নেই। দুটো চকলেট খেয়ে লবি থেকে অভিমান নিয়ে ঘরে ফিরে আসে বাবার হাত ধরে। রাতে মন খারাপ করে ঘুমিয়ে পড়ে।
পরের দিন সকালে চোখ খুলে দেখে একই রকম বৃষ্টি হচ্ছে, ঝোড়ো বাতাস বইছে। কাউকে কোন প্রশ্ন করে না রুমকি। জানালার কাছে একটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসে। বাইরে তাকিয়ে থেকে গাছের কাত হয়ে যাওয়া দেখে। কিছু গাছের ডাল ভেঙে ঝুলে আছে। কয়েকটি গাছ পড়ে গেছে। নারকেল গাছের পাতা বাতাসে এক দিকে সরে যাচ্ছে আর উড়ছে চুলের মতো। সমুদ্রের রং আজ ধূসর। এর আগে যতবার এসেছে কক্সবাজারে, নীল জল দেখে তার মন ভরে গেছে। অথচ আজ সমুদ্রের চেহারাটা পুরোপুরি বদলে গেছে। আজও সারাদিন বিপদ সংকেত জারি ছিল, রুমকির ঘোরাঘুরি হলো না।
তৃতীয় দিন খুব ভোরে তীর্যক রোদ এসে রুমকির চোখেমুখে পড়ে। রুমকি চমকে উঠে বাবা মাকে ডেকে তোলে। তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে সৈকতে ঘুরতে যায়। রের হাওয়ায় প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেয়। সমুদ্রের জলে পা ডুবিয়ে হাঁটতে থাকে। ঢেউ এসে এসে আছড়ে পড়ে তাকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। দুদিনের কষ্ট এক নিমেষেই ভুলে যায় সে।
ঢাকায় ফিরে এসে রুমকি তার পাখিদের কাছে ছুটে যায়। নিজ হাতে খুব যত্ন করে খাবার দেয়, জলের পাত্র ভরে দেয়। বিকেলে নানাভাই রুমকিকে দেখতে এসেছেন। তিনি সঙ্গে করে একটি ময়না পাখি আনতে ভোলেননি। জন্মদিন আসার আগেই উপহার পেয়ে যায় রুমকি। কিন্তু তার মুখে কোন হাসি নেই, উচ্ছ্বলতা নেই, বরং উপহার পেয়ে সে যেন চুপসে গেছে। কারও সঙ্গে কোন কথা বলছে না।
কিছুক্ষণ পরে রুমকি সব খাঁচা এক এক করে বাড়ির ছাদে নিয়ে যায়। সবাইকে ডেকে ডেকে ছাদে যেতে বলে। নানাভাই বলেন, খুব ভাল হয়েছে, পাখিদের একটু বেড়ানো হোক ছাদে। রুমকিরও মন ভাল হয়ে যাবে। রুমকি এবার তার মনের কথাটা প্রকাশ করে। ‘আমি কক্সবাজারে হোটেলের ঘরে ঝড়বৃষ্টির কারণে দুদিন আটকে থেকে বুঝতে পেরেছি, এভাবে বন্দী থাকা কতটা কষ্টের। আমি ওদেরকে খুব ভালবাসী। কিন্তু খোলা আকাশে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে না পারলে ওদের নিশ্চয়ই মন খারাপ হয়, কান্না পায়।’ এই বলে রুমকি একটি একটি করে খাঁচার দরজা খুলে দেয়। একে একে পাখিরা ডানা মেলে কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে যায় অসীমে। প্রাণভরে পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখে রুমকি। আনন্দে নিজেকেও একটি ছোট্ট হালকা পাখি বলে মনে হয় তার। মনে মনে সেও ঝিরিঝিরি হাওয়া গায়ে মেখে ডানা মেলে উড়ে যায়। আহা কী আনন্দ!