ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯

ট্রাকচালক রুবেল মেয়েকে ডাক্তার বানাতে চান

-

প্রকাশিত: ০১:২৮, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২; আপডেট: ০১:৩১, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

ট্রাকচালক রুবেল মেয়েকে ডাক্তার বানাতে চান

ভাড়ার অপেক্ষায় ট্রাকের কাছে রুবেল

আজ থেকে ৩০ বছর আগের কথা। ১১ বছরের রুবেল হাওলাদার। বাবার চাকরি করা সংসারে দুরন্তপনা রুবেল নামের একমাত্র ছেলেটি স্কুল আর খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকত সারাক্ষণ। অভাব অনটন কি জিনিস তা ঘুণাক্ষরে একটুও টের পায়নি কোনদিন। বন্ধুবান্ধব নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করে স্কুলজীবন পার করছিল রুবেল। ছেলেটির বাবা ছামাদ হাওলাদার হঠাৎ একদিন মারা যান। দুচোখে অন্ধকার দেখা দেয় সংসারে। অভাব অনটনে পড়ে যান মা-ছেলে। সৎভাবে চাকরি করা বাবার জমানো কোন অর্থকড়িও ছিল না তেমন। বাবার চাকরি থেকে যা কিছু পেয়েছেন তাও শেষ হয়ে যায় অল্প কিছুদিনের মধ্যেই। রুবেলের পড়াশোনা করাত দূরের কথা ৩ বেলা আহারও যোগাড় করতে পারছিলেন না তারা। ১১ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়া একমাত্র ছেলেটি মায়ের মুখে দুমুঠো আহার যোগাতে নিজ বাপ-দাদার ঘরবাড়ি মাদারীপুর জেলার ব্রাহ্মণদী গ্রাম ছেড়ে মাকে নিয়ে চলে আসে ঢাকা শহরে। ওই সময়টাতে রুবেলদের জায়গাজমি যা ছিল তাও দখল করে নেয় প্রতিবেশীরা।
১৪ বছরে পা দেয়া রুবেল। রিকশা চালানোর এমন কষ্ট থেকে লাঘব পেতে ১৫ বছর বয়সে যোগ দেয় ঢাকা টঙ্গী গাজীপুর সড়কে চলাচলকারী বলাকা বাসের হেলপার হিসেবে। হেলপার থেকে প্রমোশন পেয়ে বাসে কন্ডাকটরের কাজ করতে থাকে কয়েক বছর। বয়স ১৮ বছর পার হয়ে গেলে গাড়ি চালাতে শুরু করে রুবেল। এক সময় পাকা ড্রাইভারের খাতায় নামও লেখে সে। এরই মাঝে পরিচয়ের সূত্রে বিয়েও করে ফেলে বরিশাল জেলার মুলাদির জোহরা আক্তারকে। এভাবে মা-বউ নিয়ে ৩ বছর বাস চালিয়ে ভালই চলছিল রুবেলের নয়াসংসার। সংসার আরেকটু ভাল করতে টঙ্গী চেরাগআলী মিলগেট ট্রাকস্ট্যান্ডে মালিকের পিকআপ চালানো শুরু করে সে।  ৪৩ বছর বয়স জীবনে কোন অন্যায় করেননি তিনি। কেন কিসের ওয়ারেন্ট জানতে চাইলে পুলিশ জানালো, পিক-আপের কিস্তি বকেয়ার মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালত থেকে টাটা কোম্পানির পিকআপ ডিলার ওয়ারেন্ট জারি করিয়েছে। রুবেল জানতেনই না যে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়ে ওয়ারেন্ট পর্যন্ত জারি হয়ে গেছে। ওই রাতেই পুলিশের সঙ্গে রফা করে আদালত থেকে জামিনে আসেন রুবেল। এ অবস্থায় পিক-আপের ডিলার আবারও তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করায়। বেশ কিছুদিন বাড়ি ছাড়া থাকার পর জামিন করান আবারও।

মায়ের বড় শখ মাইয়ারে ডাক্তার বানাইব। স্যার জানেন, আমি কি বলেছি ওর মায়রে? বললাম কি বলেছেন? রুবেল বলল, দেখতে হুনতে আমার মাইয়াডা তো কম সুন্দর না, ভাল জাগায় বিয়া দেওন যাইব, লম্বাচুড়াও কম না, বিয়া দিয়া দিমু, খরচ দিবার পারি না, আর পড়ামু না। কথাগুলো বলতে বলতে রুবেলের দুচোখ বেয়ে কখন যে গাল গড়িয়ে পানি ঝরছে তা রুবেল টের না পেলেও আমি কাছ থেকে দেখেছি রুবেলের কত কষ্ট হচ্ছে এসব কথা বলতে! এ অবস্থায় রুবেল আরও বলতে লাগল, স্যার ট্রাকের চাকা ঘুরাইয়া মালিকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরাইয়া দিছি, কিন্তু দীর্ঘ ২৫ বছরেও ঘুরাইবার পারি নাই নিজের ভাগ্যের চাকা। ‘স্যার আমি একজন পাক্কা ড্রাইভার। কেউ যদি ভাল বেতনে একটা ড্রাইভারি চাকরি দিত তাইলে মাইয়াডার লেখাপড়া করাইবার পারতাম, ওর মায়রেও আর মাইনষের বাসায় বাসায় কাজ করতে যাইতে অইতো না’
নূরুল ইসলাম, টঙ্গী থেকে