ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯

হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে নিজেরাই রান্না করেন

-

প্রকাশিত: ০১:১৫, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২; আপডেট: ০১:১৬, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে নিজেরাই রান্না করেন

ট্রাক স্ট্যান্ডের আশে পাশে কোন ব্যবস্থা না থাকায় ট্রাকের মধ্যেই রান্না

ওদের ঘর আছে, বাড়ি আছে। আছে পরিবারও। এসবের পরেও তারা পরিবার ও পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন। রুটিরুজির সন্ধানে ওরা হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আসেন বাংলাদেশে। ওদের থাকা আর খাওয়া একেবারে ভিন্ন। নিজেদের রান্না নিজেরাই করে থাকেন। এক বেলা খাওয়ার যোগান করলেও আরেক বেলা কাটাতে হয় না খেয়ে। এ ভাবেই ওদের কেটে যায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তবে নিজ দেশ থেকে ভিন্ন দেশে আসার পর ওদের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে পরিবার ও পরিজনের সঙ্গে যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখন ওদের কষ্ট হয় বেশি। যাদের কথা বলছিলাম তারা ভারতের বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্যের বাসিন্দা বা ট্রাকের চালক। দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর হলো বেনাপোল বন্দর। এই বন্দরে প্রায় প্রতিদিনই ভারতের বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্য থেকে দেশের চাহিদা মিটাতে যেমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল কাঁচামাল, গার্মেন্টস শিল্প, থেকে শুরু করে প্রসাধনী সামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে আসে শত শত ভারতীয় ট্রাক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লী, মহারাষ্ট্র, রাজেস্থান, নাগালেন্ড, হরিয়াণা, জামশেদপুর, কুচবিহার, তামিলনাড়ু পাঞ্জাব, পশ্চিমবাংলাসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে আমদানিকৃত পণ্যবাহী ট্রাকগুলো বেনাপোল স্থল বন্দরে ভারতীয় পণ্য নিয়ে প্রবেশ করে। ভারত থেকে আসা এসব ট্রাক চালকরা বেনাপোল বন্দরে পণ্য নিয়ে আসার পর তাদের নানা কষ্টের কথা জানান।

মঙ্গলবার বেনাপোল বন্দর ঘুরে ভারতীয় ট্রাক চালকরা জানান, প্রায় দুই মাস আগে ভারতের উত্তারাখা- রুদ্রপুর থেকে আমদানিকৃত পণ্য নিয়ে বেনাপোলের উদ্দেশ্যে আমরা কয়েক জন রওয়ানা হই। সেই থেকে আজ অবধি বেনাপোল বন্দরে আছি। এখনও পর্যন্ত আমাদের ট্রাকে থাকা পণ্য খালাস হয়নি। যার ফলে আমরা এখানে আটকা পড়ে আছি। কবে কখন তাদের ট্রাকের এসব পণ্য খালাস হবে তা তারা জানেন না। ট্রাকচালক অজয় বলেন, দীর্ঘ দুই মাসের বেশি সময় ধরে আছি বেনাপোলের ট্রাক টার্মিনালে। এখানে নেই কোন ক্যান্টিনের ব্যবস্থা কিংবা থাকার ব্যবস্থা। যার ফলে আমাদের ট্রাকের ভিতরেই রান্না বাড়া করে খেতে হয়। এবং নেই কোন টার্মিনালের ভিতরে ছাওনির ব্যবস্থা রোদ, বৃষ্টি ও দাবদাহের মাঝেও আমাদের ট্রাকের ভিতরেই দিন কাটাতে হয়। দীর্ঘদিন আটকে থাকার কারণে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও তেমন একটা হয়ে ওঠে না। এ নিয়ে আমরা খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটাই। চেন্নাই থেকে আসা আরেক ট্রাকচালক দুরাই স্বয়ামি বলেন, দীর্ঘ ২ হাজার ৫০০ কি.মি. পথ পাড়ি দিয়ে বেনাপোল বন্দরে এসেছি এক সপ্তাহ হলো। গুদামে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় পণ্য খালাস হচ্ছে না আমার।
যার কারণে আমাদের প্রতি মুহূর্ত ট্রাকের ভিতরেই কাটাতে হচ্ছে। আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আমরা প্রায় প্রতিদিনই গেটপাশ দেখিয়ে ওপার থেকে নিয়ে আসি এখানে। ভারতের নাগপুর থেকে আসা ট্রাক চালক কুলওয়ান সিং বলেন, আমরা মহারাষ্ট্র নাগপুর থেকে ছত্রিশগড়, রাজেস্থান, উড়িষ্যা, ঝারখ-, পশ্চিম বাংলা হয়ে বেনাপোল বন্দরে এসেছি দুদিন হয়েছে। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এসেও ভাল লাগছে যে আমার ট্রাকে থাকা পণ্য আজ খালাস হবে। আমার মতো অনেক ট্রাক ড্রাইভার পণ্য খালাসের জন্য সিরিয়ালে আছে। অনেক ট্রাক চালক তাদের দুর্বিসহ জীবনের কথা বলতে গিয়ে বলেন, মা, বাবা, পরিবার পরিজন রেখে বেশিরভাগ সময়ই কাটে বাহিরে। এতে হঠাৎ করে পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে আমরা পাশে থেকে তাদের সেবা করতে পারি না এবং পরিবারের কোন আনন্দ উৎসবের মুহূর্তেও আমরা তাদের সঙ্গে শামিল হতে পারি না। এতে করে আমরা যেমন কষ্ট পাই। তেমনি করে আমাদের পরিবারও কষ্ট পায়।
ভারতের দিল্লী থেকে আসা আরেক ট্রাকচালক জাফর আনসারি বলেন, আমি দীর্ঘ ২ হাজার কি.মি. পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের বেনাপোল বন্দরে পণ্য নিয়ে এসেছি ৪দিন হলো। কিন্তু আসার ২দিন পর পরিবার থেকে খবর আসে বাবা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বাবার অসুস্থতার কথা শুনেও আমার করার কিছু নেই। কারণ আমার ট্রাকে থাকা পণ্য খালাস হয়নি। আর খালাস হলেও আমার দিল্লী পৌঁছাতে সময় লাগবে অনেক দিন। এ কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে তার কণ্ঠ ভারি হয়ে আসছিল। এ সময় তার চোখ ছলছল করছিল। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানান, বন্দরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকার কারণে পণ্য খালাসে বিলম্ব হলেও থাকা এবং খাওয়ার জন্য সেখানে ক্যান্টিন আছে। কিন্তু ভারতীয় ট্রাক ড্রাইভাররা সেগুলো ব্যবহার না করে নিজেদের মতো নিজেরাই রান্নাবাড়া করে খান এবং ট্রাকের মধ্যে ঘুমান। এজন্য আমাদের কি করার আছে।
    আবুল হোসেন, বেনাপোল