ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

নাচে গানে শরত বন্দনা রাজধানীতে

ওরে যাব না আজ ঘরে রে ভাই, যাব না আজ ঘরে...

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:৪৯, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

ওরে যাব না আজ ঘরে রে ভাই, যাব না আজ ঘরে...

বর্ণিল শরত উৎসবে শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনা

চারুকলার প্রাঙ্গণটি সবুজে একেবারে মোড়ানো। কত রকমের গাছ। পরিণত বৃক্ষ। আয়েশী ভঙ্গিতে ছড়িয়ে দেয়া ডালপালা গোটা পরিবেশটাকে যেন নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছে। অকৃত্রিম এ প্রকৃতি পরিবেশের একেবারে ভেতরে বসেই শুক্রবার হলো শরত বন্দনা। সকালে ঢাকায় আয়োজিত নাগরিক উৎসব থেকে বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যের কথা মনে করিয়ে দেয়া হলো। ষড়ঋতুর মধ্যে শরতের অবস্থান কোথায়, কী এর বৈশিষ্ট্য, কেন একে ঘিরে উৎসব- নেচে গেয়ে তা জানিয়ে দিলেন শিল্পীরা। গান নাচের পাশাপাশি ছিল কবিতা। গল্প আড্ডা জমে ওঠেছিল। সব মিলিয়ে বড় ভাল একটি সকাল কেটেছে।
ছুটির দিনে রাজধানী শহরের অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমিয়ে ঠিক তখন জমে ওঠেছিল উৎসব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ক্যাম্পাসে, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, বকুলতলায় সমবেত হয়েছিলেন সবাই। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বাংলা ঢোলের বোলে শুরু হয় শরত উৎসব। স্বপন মিয়ার ঢোল উৎসবের বার্তাটা আশপাশের এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়। উপস্থিত সবার ভেতরটাও যেন বেজে ওঠে নতুন করে। যন্ত্রসঙ্গীতের পর শুরু হয় মূল আয়োজন। কখনও গান, কখনও নাচ কিংবা কবিতার ভাষায় চলে শরত বন্দনা। বরাবরের মতোই গাওয়া হয় রবীন্দ্রনাথের গানগুলো। কবিগুরুর গানে শরত কী যে স্নিগ্ধ হয়ে ধরা দেয়। ফাহিম হোসেন চৌধুরীর কণ্ঠে গাওয়া গানটির কথাই যদি বলি, শিল্পী গাইছিলেন ঃ ‘এবার শিউলিসুরভি রাতে বিকশি জ্যোৎস্নাতে/মৃদু মর্মরগানে তব মর্মের বাণী বোলো/এবার অবগুণ্ঠন খোলো।’ চমৎকার গাওয়া, নিজস্ব গায়কী শরতের রূপ ও মনের আবেগকে দারুণভাবে তুলে ধরে। অনিমা রায় পরিবেশন করেন ‘আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা/নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই- লুকোচুরি খেলা।’ খুব চেনা এই গানে শরত আনন্দের, উদ্যাপনের উপলক্ষে হয়ে আসে। নিজস্ব গায়কী আনন্দটা আরও যেন বাড়িয়ে দেয়। সম্মেলক কণ্ঠে একই গান পরিবেশন করেন পঞ্চভাস্বরের ক্ষুদে শিল্পীরা। ছোটদের এই দলটি যখন গাইছিল ‘ওরে যাব না আজ ঘরে রে ভাই, যাব না আজ ঘরে’ তখন শ্রান্ত ক্লান্ত নাগরিক মন অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে তাদের। শিল্পবৃত্ত নামের শিশু সংগঠনটিও পরিবেশনা দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে। মিষ্টি ছড়া গানে শরত বন্দনা করে ২৫ জনের দলটি।
বিমান চন্দ্র মিস্ত্রির কণ্ঠে ছিল নজরুলের গান। তিনি শরতে বিরহী মন নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। গাইলেন, ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই।’ অনন্যার অনন্য সুন্দর পরিবেশনায়ও ছিলেন নজরুল। কবি গানে যে শিউলি বিছানো পথের কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেই পথের কথা মনে করিয়ে দেন সুরনন্দনের শিল্পীরা। সুরবিহারের শিল্পীদের কণ্ঠে ছিল নজরুলের আরেক বিখ্যাত গান ‘শিউলিতলায় ভোরবেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।’ বহ্নিশিখা বেছে নেয় আগমনী গান। আর কদিন পর শারদীয় দুর্গোৎসব। দুর্গতিনাশিনীকে ‘শিশিরে শিশিরে শারদ আকাশে ভোরের আগমনী’ গেয়ে আমন্ত্রণ জানান তারা। তাপসী ঘোষের কীর্তন,
এদিনের শরত বন্দনার আরেক বৈশিষ্ট্য ছিল লোকগান। বেশ কয়েকটি লোকগান পরিবেশন করেন শিল্পীরা। বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, মামুন জাহিদ খান সঞ্জয় কবিরাজ আরিফ রহমানের গান নাগরিক বোধ এক রকম ভেঙ্গে চুরে প্রকৃত অনুভূতির গভীরে নিয়ে যায়। আবেগে ভাসায় শ্রোতাদের। কবিতায় শরত বন্দনা করেন নায়লা তারাননুম কাকলী, মাসুদুজ্জামান, আহসান উল্লাহ তমাল প্রমুখ।
উৎসবে অতিথি হয়ে এসেছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামান, সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, আয়োজক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট।