ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯

মানপত্র ম্যাগাজিন পুস্তিকায় সেই ইতিহাস

’৭১’র আবেগ, যুদ্ধ জয়ের উচ্ছ্বাস-সবই ছিল বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:১৬, ১০ আগস্ট ২০২২

’৭১’র আবেগ, যুদ্ধ জয়ের উচ্ছ্বাস-সবই ছিল বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে

বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে বঙ্গবন্ধু

গোড়াতেই উল্লেখ করা উচিত হবে যে, প্রদর্শনীটি নতুন নয়জাতীয় জাদুঘর আগেও এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেপ্রতিবছর আগস্টে অভিন্ন আয়োজন নিয়ে সামনে আসে সরকারী প্রতিষ্ঠানএবারও তা-ই হয়েছেবঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে লেখা মানপত্র, চিঠি, একাত্তরে প্রকাশিত পুস্তিকা, দেশী বিদেশী ম্যাগাজিন ও আলোকচিত্র দিয়ে সাজানো এখন নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিযারা আগে দেখেছেন তাদের কথা আলাদা, বাকিদের কাছে অনেক কিছুই নতুন হয়ে ধরা দেবে

বস্তুত বিবিধ মাধ্যমে বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে এখানে তুলে ধরা হয়েছেমুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের আবেগ, উত্তাপ, যুদ্ধজয়ের উচ্ছ্বাস সবই ভীষণভাবে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ছিলপ্রদর্শনী ঘুরে এ সত্য আবিষ্কার করা যায়নতুন করে অনুভব করা যায়

এ ক্ষেত্রে ভাল উদাহরণ হতে পারে মানপত্রগুলোসদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্দেশে এসব মানপত্র লেখাও পাঠ করা হয়েছিলদেশের যে প্রান্তে তিনি পা রেখেছেন সে প্রান্তেই আনন্দের বন্যা বয়ে গেছেবঙ্গবন্ধুকে বিপুল সংবর্ধনা জানিয়েছে সাধারণ মানুষএরই অংশ হিসেবে তারা মানপত্র রচনা করে বঙ্গবন্ধুতে উপহার দিয়েছেনমুক্তিযুদ্ধের পরম বন্ধু ভারত থেকেও একই রকম উপহার পেয়েছেন তিনিসব মিলিয়ে, যত দূর জানা যায়, ৩৪টি মানপত্র

১৯৭২ সালে স্মারকগুলো জাতীয় জাদুঘরে দান করেন নেতাএরপর থেকে জাদুঘরেই সংরক্ষণ করা হচ্ছেজায়গার অভাব, তাই গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হচ্ছে মাত্র তিনটিবাকিগুলো থাকে স্টোর রুমেবর্তমানে প্রদর্শনী উপলক্ষে বাইরে আনা হয়েছেমুজিব বন্দনার পাশাপাশি এসবে তুলে ধরা হয়েছে বাঙালীর আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসপ্রিয় নেতাকে কাছে পাওয়ার তরতাজা অনুভূতি পাঠ করা যায় মানপত্রে

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭২ সালের ২৯ মার্চ প্রথম চট্টগ্রাম সফর করেন শেখ মুজিবুর রহমানসেখানে তাকে একটি মানপত্র প্রদান করা হয়এ মানপত্রে শেখ মুজিবকে বাঙালী জাতির আত্মদর্শনহিসেবে উল্লেখ করা হয়নেতাকে উদ্দেশ করে লেখা হয়, ‘আপনি বাংলার পলিমাটিতে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের বীজ বপন করেছেনবাংলার প্রবহমান নদীর ঘাটে ঘাটে আমরা সাড়ে সাত কোটি বাঙালী শ্যামল বর্ণে রক্তসূর্যকে মেহনতি মজবুত হাতে আকাশে তুলে ধরেছি

মানপত্রে শুধু বাংলাদেশের নেতা নয়, বিশ্বনেতা হিসেবে তুলে ধরা হয় বঙ্গবন্ধুকেবলা হয়, ‘আপনি নিপীড়িত বিশ্বের মুক্তির অরুণোদয়বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার কাজে সহায়তা করার অঙ্গীকার করে চট্টলার সংগ্রামী জনগণ এতে লিখেন, ‘আপনার সোনার বাংলার প্রতি ঘরে আমরা সর্ব সংস্কার মুক্ত ভেদ মুক্ত এক মহান সমাজ গঠনের শপথ গ্রহণ করবলোভ-লালসা পরিহার করে আমরা এ দেশের প্রতিটি সম্পদকে সকল মানুষের কল্যাণের জন্য নিয়োজিত করব

আরেকটি মানপত্র পাঠে জানা যায়, একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি খুলনার পাইকগাছা পরিদর্শন করেন শেখ মুজিবপাইকগাছা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাকে কাছে পেয়ে যারপরনাই উফুল্ল হনশিক্ষার্থীরা বঙ্গবন্ধুকে বাঙালীর মুক্তি সেনানীসংবোধন করে লিখেন, ‘সকালের নক্ষত্রটি যেমন আপনার অনাড়ম্বর কিরণধারা ঢেলে সমগ্র আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে তুমিও তেমনি স্বাধীনতার অতন্দ্রপ্রহরী রূপে সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীকরূপে, নিজের জীবন বিপন্ন করে স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দ্যচিত্তে বিরাট দায়িত্বভার স্কন্ধে নিয়ে, স্থির লক্ষ্যের পানে শত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে ছুটে সহস্র অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে লড়ে বাংলার ভাগ্যাকাশে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের ন্যায় আবির্ভূত হয়ে বিশ্ববাসীকে একেবারে বিস্মিত করে দিয়েছে

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চিত্রও ফুটে ওঠে মানপত্রেশিক্ষার্থীরা লিখেন, ‘হে জয় বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা, যুদ্ধ শেষ হয়েছে বটে কিন্তু নিপীড়িত নিষ্পেষিত সর্বহারা জনগণ আজ আর এক বৃহত্তর যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েসে যুদ্ধ দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, সে যুদ্ধ শোষণমুক্ত সমদর্শী সমাজ গঠনের দায়িত্বে, সে যুদ্ধ বিশ্ব দরবারে নিজেদের যোগ্য স্থান অধিকারের তাগিদে

এ মানপত্রে মহান এ নেতার অবদানের কথা তুলে ধরে বলা হয়, ‘মানবকল্যাণ পাথেয় করে যেসব মহাপুরুষ যুগে যুগে বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ন্যায়, সত্য ও প্রেমের অমর স্বাক্ষর বহন করে জগদ্বাসীর কাছে বরিত হয়েছে তুমিও তাদের অনুসারী

১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে মানপত্র প্রদান করেন বরিশালের হরিগোবিন্দ সংস্কৃত মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষজাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত এ মানপত্রটি তিনি লিখেন সংস্কৃত ভাষায়বাংলা তরজমা করলে দাঁড়ায়, মৃত্যুকে করিয়া জয়- হে মোর অমর/মৃত্যুঞ্জয় তুমি আজ...মহ কল্যাণ কার্য তোমাতে অর্পিত...সুসিদ্ধ করিয়া তোল আপন সাধনা’ 

মানপত্র ছাড়াও বঙ্গবন্ধুকে ব্যক্তিগতভাবে অনেকে লিখেছেনকখনও পাকিস্তানী হায়েনাদের হাতে ধর্ষিতা মেয়ের অসহায় বাবা নেতাকে তার মেয়ের দুঃসহ জীবনের কথা লিখে জানিয়েছেনকখনও লিখেছে একেবারে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাওতেমনি একজন ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী সুরাইয়া বেগম৫৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পত্র লিখে সে

১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ লেখা পত্রটি এখনও ফ্রেমে বাঁধানোএর শিরোনাম একটি নাম একটি শপথএতে জাতির জনকের নামের প্রতিটি অক্ষর ভেঙ্গে নতুন নতুন অর্থ করা হয়েছেসব শেষে লেখাটি দাঁড়িয়েছে এ রকম- মান রাখব এই বাংলার শপথ করি এসো সবাই মিলেএকই রকম আরেকটি লেখায় খিলগাঁও সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র মোঃ আলী হাছান বখতিয়ার লিখেছে, ‘বন্ধু তুমি চির নিপীড়িত নির্যাতিত মানবের... ওহে মহান, ওহে মহামতি, কি দিয়ে করিব শ্রদ্ধাঞ্জলি?’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীর পাশে দাঁড়িয়েছিল বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের  সেনাবাহিনীসেইসঙ্গে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গের বাঙালীরা মুজিবকে গভীরভাবে ভালভাসতেনএকাধিক মানপত্রে সেই ভালবাসার প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়শুধু কলমের কালি বা ছাপার অক্ষরে নয়, নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে একাধিক ব্যক্তি আবেগঘন চিঠি বা মানপত্র রচনা করেছেনভালবাসার কথা জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকেএভাবে অদ্ভুত এক আবেগ অনুভূতির প্রকাশ ঘটে মানপত্রগুলোতেভিন্ন মাত্রায় প্রকাশিত হন বঙ্গবন্ধু

প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে দেশী-বিদেশী বেশ কয়েকটি ম্যাগাজিনবিশ্ববিখ্যাত টাইমম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে চোখ আটকে যায়১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত ম্যাগাজিনে বাঙালীর মহান নেতা শেখ মুজিবের  চমকার একটি প্রতিকৃতিশিরোনাম: বাংলাদেশ : ফ্রম জেল টু পাওয়ারএমন প্রচ্ছদ এবং শিরোনাম মুজিবের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের কথাই মনে করিয়ে দেয়

বুধবার প্রদর্শনী দেখতে গ্যালারিতে এসেছিলেন শিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেনতিনি এ ম্যাগাজিনের দিকে তাকিয়ে কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েনকারণ জানতে চাইলে মুহূর্তেই ফিরে যান ৭৫ পরবর্তী দুঃসময়েস্মৃতি হাতড়ে বলেন, ’৭৭ সালের কথাতখন শেখ মুজিব একরকম নিষিদ্ধতার নাম নিলেও বিপদে পড়ার আশঙ্কা

এমন বৈরী সময়ে হঠা একদিন আমাদের কয়েক বন্ধুর হাতে আসে টাইম ম্যাগাজিনের এই সংখ্যাটিপুরনো সংখ্যাপ্রচ্ছদে বঙ্গবন্ধুর এত আর্টিস্টিক ইমেজ দেখে সবাই অভিভূত হয়েছিলামপরে এ ছবি সামনে রেখে ড্রইং করেন আমাদের চারুকলার সিনিয়র ভাই ফয়েজ আহমেদফয়েজ ভাইয়ের ড্রইংয়ে রং ভরার কাজ করেছিলাম আমরাপরে এ ছবি ব্যবহার করে তিনটি পোস্টার করা হয়েছিল

প্রদর্শনীতে এসে পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু আজ আরও বেশি উদ্ভাসিতসত্যের এমন জয় দেখে ভীষণ ভাল লাগছে

প্রদর্শনীতে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকাশনাও রাখা হয়েছেমুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে প্রকাশ করা পুস্তিকাগুলো সে সময়ের এক একটি দলিলআওয়ামী লীগের ছয় দফা কী ও কেন’, ‘আমি মুজিব বলছি’, ‘বজ্রকণ্ঠ’, ‘জয় বাংলা’, ‘বাংলাদেশ শোষণের চিত্র’, ‘জয় বাংলার দামাল ছেলে’, ‘রক্তাক্ত বাংলাদেশ ও বৌদ্ধ সমাজইত্যাদি শিরোনামে পুস্তিকাগুলো  প্রকাশ করা হয়েছিলহাতে হাতে এগুলো বিলি করা হত

তবে এসব পুস্তিকা পড়ে দেখার কোন সুযোগ প্রদর্শনীতে রাখা হয়নিএটি বলা চলে, প্রদর্শনীর সবচেয়ে দুর্বলতম দিকগ্লাসশোকে পুস্তিকা ও বই রেখে বাইরে থেকে তালা দিয়েছেন আয়োজকরাবছরের পর বছর এভাবেই পুস্তিকাগুলো প্রদর্শিত হচ্ছেএমন অর্থহীন প্রদর্শনীর কী মানে আছে? জানতে চেয়েও জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোন উত্তর পাওয়া যায়নি

সে যাই হোক, প্রদর্শনীর বাকি সবই সবার জন্য উন্মুক্তমাসব্যাপী প্রদর্শনী সময় করে ঘুরে আসুন