সোমবার ৪ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

শিশু কোলে ছুটছে মা সঙ্গে হাঁস-মুরগি, শেষ সম্বল

শিশু কোলে ছুটছে মা সঙ্গে হাঁস-মুরগি, শেষ সম্বল
  • শিল্পীর তুলিতে ফুটে উঠল ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর রোড’

সাজেদ রহমান ॥ ঝুঁড়ির ভেতর বসিয়ে বৃদ্ধা মাকে দুই সন্তান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁকে করে যশোর রোড ধরে এগিয়ে চলেছে ভারতের বনগাঁর দিকে। সঙ্গে আরও অনেক শরণার্থী। কিংবা কোন বৃদ্ধা সংসারের শেষ সম্বল হারিকেন, হাঁস-মুরগি, ছোট্ট শিশুদের কোলে নিয়ে, পোটলা-পুটলিতে বাঁধা সংসারের অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে শত শত মাইল ঘুরে যশোর রোড ধরে এগিয়ে চলেছে ভারতে আশ্রয়ের খোঁজে।

বিজয়ের ৫০ বছর উদ্যাপনে যশোরে রবিবার শুরু হয়েছে ২১ দিনব্যাপী বিজয় সাংস্কৃতিক উৎসব। ঐতিহাসিক যশোর রোডকে উপজীব্য করে ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর রোড’ শীর্ষক আর্ট ক্যাম্পে ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ উৎসব। যশোর জেলা প্রশাসনের সহায়তায় জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে পৌর উদ্যানে এ আর্ট ক্যাম্পের মাধ্যমে বর্ণাঢ্য এ উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। ক্যাম্পে ৫০ জন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী ছবি আঁকেন।

ক্যাম্প উদ্বোধন করেন চিত্রশিল্পী তপন কুমার ঘোষ। প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান। সভাপতিত্ব করেন ‘বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন পর্ষদ’২১ এর চেয়ারম্যান হাবিবা শেফা। স্বাগত বক্তব্য দেন আয়োজক পর্ষদের সদস্য সচিব সানোয়ার আলম খান দুলু। সঞ্চালনা করেন মামুনুর রশিদ। উপস্থিত ছিলেন আয়োজক পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান সুকুমার দাস, হারুন অর রশীদ, দীপংকর দাস রতন, ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল, অনুষ্ঠান উপপরিষদের আহ্বায়ক এ্যাডভোকেট মাহমুদ হাসান বুলু, অর্থ উপপরিষদের আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম তারু, স্বেচ্ছাসেবক উপপর্ষদের আহ্বায়ক নওরোজ আলম খান চপল প্রমুখ।

‘লক্ষ শিশু দেখছে আকাশ অন্ধকার উদর স্ফীত, বিস্ফোরিত চোখের ধার যশোর রোডে-বিষণ্ণ সব বাঁশের ঘর ধুঁকছে শুধু, কঠিন মাটি নিরুত্তর।’

আসলে যশোর রোডের বয়স কয়েকশ’ বছরের। কিন্তু তা বিখ্যাত হয়েছে আমেরিকার কবি এ্যালেন গিন্সবার্গের কারণে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিকে ভারতের কলকাতায় এসেছিলেন এবং উঠেছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে। তখন বাংলাদেশ থেকে অনেক শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী অন্যান্য শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সুনীলকে সঙ্গে নিয়ে তিনি শরণার্থী শিবির দেখতে বের হন। সে সময় অনেক বৃষ্টি হওয়ায় যশোর রোডের অনেক স্থানে পানিতে ডুবে গিয়েছিল। সড়কপথে যেতে না পেরে গিন্সবার্গ নৌকায় করে বনগাঁ পেরিয়ে যশোর সীমান্তে পৌঁছেন। তারা যশোর সীমান্ত ও এর আশপাশের শিবিরগুলোতে বসবাসকারী শরণার্থীদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন। পরে তিনি আমেরিকায় ফিরে যান। সেখানে গিয়ে ওই বছরের নবেম্বরের ১৪ থেকে ১৬ তারিখের মধ্যে শরণার্থী শিবিরের অভিজ্ঞতা থেকেই গিন্সবার্গ লেখেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামের একটি বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা। ১৯৭২ সালে প্রথমে এটি অনুবাদ করেন খান মোহাম্মদ ফারাবী। ফারাবীর অনুবাদ শুধু যে শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে তাই নয়, তিনি বাঙালীর হয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এক ঐতিহাসিক দায়িত্বও পালন করে গেছেন।

তার কবিতায় যশোর রোডকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, অন্য কেউ পারেনি। সেজন্য যশোরে আর্ট ক্যাম্পের উপজীব্য বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর রোড’।

ক্যাম্পে ছবি আঁকেন তপন কুমার ঘোষ, মাহাবুব জামাল শামিম, মাহামুদুর রহমান, সৈয়দ গোলাম দস্তগীর মিঠু, দেবব্রত দাস, মোরশেদ অনু, রেজাউর রহমান, মণি মাঝি, আবিদ সাঈদ শিপু, সারাফাত পাশা, শাওন আকন্দ, তানজীনা রহমান, কৃষি গৌতম, নিবেদিতা মুখার্জী, সৈকত চৌধুরী, মোমায়রা আফরোজ মিতালী, প্রসূণ বিশ্বাস, নাজমুন নাহার রহমান, সিগমা হক অংকন, মাহফুজা বিউটি, ফারজানা ইয়াসমিন, জসিম উদ্দীন, ওবায়েদ জসিম, সজল ব্যানার্জী, ইসহাক হালদার, আনু শাহরিয়ার লিটন, সুকুমার বাগ্চী, রায়হান উদ্দিন, সৌমিত্র মোস্তবী, মোহন মল্লিক, দেবাশীষ সরকার, প্রশান্ত হালদার, অনুপ বাহাদুর, উত্তম বৈরাগী, সুমন ভট্ট, অনাদী কুমার, রিপন সিকদার, প্রশান্ত দাস, চন্দ্র শেখর দাস, কৃত্তিবাস হালদার, রাজীব রায়, দেওয়ান স্বীকৃতি, এহসান উর রশীদ, জাহিদুল ইসলাম দামাল, তরুণ ঘোষ, দস্তগীর, সোহেল প্রাণণ, সাদি তাইফ, সান্ত¡না শাহারীণ প্রমুখ।

যশোর পৌর পার্কের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসে এই ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। সকাল থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ছবি আঁকেন শিল্পীরা।

শুধু শরণার্থী ভারতে যাওয়া নয়, এই পথ ধরেই বিজয় উল্লাসে মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীরা ফিরে আসেন। সেই সব ছবিও ফুটে উঠেছে শিল্পীর তুলিতে। শিল্পী সোহেল প্রাণণ বলেন, আমি এঁকেছি মা, তার শেষ সম্বল শিশুকে কোলে নিয়ে শরণার্থী হয়ে যশোর রোড ধরে ভারতে যাচ্ছেন। সঙ্গে যাচ্ছে একটি হাঁস, বাচ্চার হাতে একটি টিয়া পাখি। বাচ্চার সঙ্গে যে পাখির সম্পর্ক, সেই পাখিটাকে সে আগলে রাখার চেষ্টা করছে। মায়ের সঙ্গে গৃহস্থালিতে যে হাঁস-মুরগি থাকে, যুদ্ধের ভেতর সেটাই তার শেষ সম্বল, সেটা নিয়ে যে পালাচ্ছে। তার নিজ গাঁয়ে থাকার কোন পরিস্থিতি নেই। সব হারিয়ে ফেলেছে। এইটুকু সম্বল নিয়ে সে চলে যাচ্ছে। তাই আমি আমার ছবির নাম দিয়েছি ‘সম্বল’।

উৎসব বিষয়ে বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন পর্ষদ’২১ এর চেয়ারম্যান হাবিবা শেফা বলেন, বিজয়ের ৫০ বছর উদ্যাপন আমাদের জীবনে এক অনন্য প্রাপ্তি। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা, বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত করা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সর্বোপরি বিজয়ের ৫০ বছরকে স্মরণীয় করে রাখতে এ উৎসব মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন পর্ষদ’২১ এর সদস্য সচিব সানোয়ার আলম খান দুলু জানান, বিজয়ের ২০ বছর আমরা উদ্যাপন করেছিলাম যশোরে। এর ৩০ বছর পর এই প্রথম যশোরে এত বড় সম্মিলিত উৎসব হতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিককালের সেরা উৎসবেও পরিণত হতে যাচ্ছে এটি। কারণ উৎসবে শুধু যশোর শহরেই নয়, বরং সাতটি উপজেলার সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনা, লোকজ গান, বাউল গানের আয়োজন রয়েছে। যে আয়োজনে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত হবে।

আর্ট ক্যাম্পে বরেণ্য এ শিল্পীদের অঁাঁকা ছবিসমূহ নিয়ে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিতে ৬ ডিসেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিক্রয়ের জন্য চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।

শীর্ষ সংবাদ: