সোমবার ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৬ ডিসেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

উজানে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তা অববাহিকায় অকাল বন্যা, নদী ভাঙ্গন

উজানে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তা অববাহিকায় অকাল বন্যা, নদী ভাঙ্গন

নিজস্ব সংবাদদাতা, রংপুর ॥ উজানে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর ভারতীয় অংশে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তিস্তা ব্যারাজের ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেয়ায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা অববাহিকায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিস্তাবেষ্টিত লালমনিরহাট ও নীলফামারী ছাড়াও রংপুরের গঙ্গাচড়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় দেখা দিয়েছে আকস্মিক বন্যা। পানি বেড়েছে কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার তিস্তা নদীসহ ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, ধরলাসহ ছোট নদনদীতে। এর ফলে রংপুরের গঙ্গাচড়াতে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন।

আকস্মিক বন্যার পানির তোড়জোড়ে উপজেলার আলমবিদিতর, লক্ষ্মীটারি, কোলকোন্দ, নোহালী ও গজঘণ্টার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে।

অনেক পরিবার এখন পানিবন্দি হয়ে আছে। নদীঘেঁষা চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় অনেকেই উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে চেষ্টা করছে। লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের চরইশরকুল, ইছলি, পূর্ব ইছলি, পশ্চিম ইছলি ও শংকর, বাগেরহাট, কেল্লারহাটসহ বেশকিছু নিচু এলাকায় কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে আছে। পানিপ্রবাহ বেড়েছে গঙ্গাচড়া শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতুর মহিপুর পয়েন্টে।

হামরা বাঁচমো ক্যামন করি? ‘হামার আবাদি জমি সোগ তলে গেইচে। এ্যালা তিস্তার পানিত ধান, আলু, শাকসবজি সোগ ডুবি আছে। হঠাৎ এদোন করি ভারত পানি ছাড়লে হামরা বাঁচমো ক্যামন করি? একে তো এবারের বানোত (বন্যা) হামার মেলা ক্ষয়ক্ষতি হইছে।

তার ওপর এই অসময়ে ফির বান! নদী পাড়োত হামার সুখ-শান্তি নাই।’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কৃষক নাছিমুুদ্দী বকস। তিনি থাকেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদী তীরবর্তী লক্ষ্মীটারি ইউনিয়েনের কেল্লারহাট গ্রামে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ্ আল হাদি বলেন, কার্তিক মাসে নদীতে চর জেগে ওঠায় নদীতীরবর্তী মানুষ চাষাবাদ শুরু করেছে। গেল বন্যার ধকল সামলে না উঠতেই আবার বন্যা দেখা দিয়েছে। এই অসময়ে ভারতের উজান থেকে আসা তিস্তায় পানি বেড়েছে। এতে বাড়িঘর, আবাদি জমি, নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে। ভয়াবহ এ বন্যায় ইউনিয়নের কেল্লারপাড়, শংকরদহ, বাগেরহাটসহ বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

তিস্তাপাড়ের মানুষজনকে নিরাপদ স্থানে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাত থেকে পানি বাড়তে শুরু করেছে। ভোর থেকে নদীতীরবর্তী মানুষজনকে নিরাপদ স্থানসহ আশ্রয় কেন্দ্রে আসার জন্য মাইকিং করেছি। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সার্বিক পরিস্থিতি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছি। এখন যে পরিস্থিতি, তাতে আর দু-এক দিন এভাবে পানি বাড়তে থাকলে স্মরণকালের বন্যা হবার আশঙ্কা রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ভারী বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পানির চাপ কমাতে সবগুলো জলকপাট খুলে দিয়েছে ভারত। এতে ভোর থেকে তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করে। লালমনিরাহাটের হাতীবান্ধার দোয়ানী ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। সময়ের সঙ্গে এটি আরো বাড়তে পারে।

বুধবার (২০ অক্টোবর) সকাল ৯টায় হাতীবান্ধার দোয়ানী ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানি রেকর্ড করা হয় ৫৩ দশমিক ২০ সেমি, যা বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার বেশি। অন্যদিকে, নীলফামারীতে ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে তিস্তার পানি।

পাউবোর ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদ্দৌলা প্রিন্স বলেন, উজানে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তিস্তা পয়েন্টে এ মৌসুমের সর্বোচ্চ পানিপ্রবাহ। এ জন্য আমরা তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দিয়ে নদীর পানিপ্রবাহ অব্যাহত রেখেছি।

সরেজমিনে জানা গেছে, তিস্তার পানি দোয়ানি পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজের সড়কের 'ফ্লাড বাইপাস' ভেঙে গেছে। ফলে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। অন্যদিকে পানিবৃদ্ধির কারণে ভারত থেকে গেট খুলে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় ফ্লাড বাইপাস ভেঙে যাওয়ায় বড়খাতার বাইপাস সড়কের তালেব মোড় এলাকার সড়কটিতে পানি ছুঁইছুঁই করছে। এ ভাঙনের ফলে এরই মধ্যে ওই এলাকার ২০০টি ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে নীলফামারীর ডিমলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জ নামক স্থানের ৪০০ মিটার গ্রোয়েন বাঁধ। এতে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৪০০ পরিবারের ঘরবাড়ি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, দেশের উজানে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সিকিম, দার্জিলিং, জলপাইগুড়িতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে তিস্তা নদীর পানি সমতল বাংলাদেশে মঙ্গলবার (১৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করেছে। বর্তমানে ডালিয়া পয়েন্টে ৫৩.২০ মিটার লেভেলে বিপৎসীমার ৬০ সেমি ওপর অবস্থান করছে। বিগত ১২ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি সমতল ডালিয়া পয়েন্টে প্রায় ২০০ সেমি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পানি বৃদ্ধি বুধবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আরও ১০ থেকে ১৫ সেমি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ অক্টোবর) ভোর নাগাদ এই পানি বিপৎসীমার নিচে চলে আসতে পারে। উল্লেখ্য, ভারতের উত্তরাখান্ড রাজ্যে ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যায় সৃষ্ট এ পানির চাপ কমাতেই ব্যারাজের গেট খুলে দিয়েছে দেশটি।

শীর্ষ সংবাদ: