ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

তৃতীয় দিনে টিকা নিলেন লক্ষাধিক ব্যক্তি

প্রকাশিত: ২২:৪৩, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

তৃতীয় দিনে টিকা নিলেন লক্ষাধিক ব্যক্তি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ করোনা ভাইরাসের গণ টিকাদানের তৃতীয় দিনে টিকা নিলেন আরও এক লাখ এক হাজার ৮২ জন। গত ২৭ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩১৮ জনে। বেড়ে গেছে দৈনিক টিকা গ্রহণকারী ও রেজিস্ট্রেশনকারীর সংখ্যা। তৃতীয় দিন যারা টিকা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৯৪ জনের সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রথম দিন ৯২ জন এবং দ্বিতীয় দিন ২১ জনের মধ্যে সে রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। এ পর্যন্ত সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গেছে ২০৭ জনের মধ্যে। তবে কারও ক্ষেত্রে গুরুতর কিছু ঘটার খবর এখনও আসেনি বলে জানিয়েছে অধিদফতরের মেডিক্যালে ইনফরমেশন সার্ভিসেস বিভাগ। স্পট নিবন্ধনে টিকা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশে দেয়া হচ্ছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি অক্সফোর্ড-এ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাসের টিকা। সবাইকে এ টিকার দুটি ডোজ নিতে হবে। সরকারের কেনা এ ভ্যাকসিনের তিন কোটি ডোজের মধ্যে প্রথম ৫০ লাখ ডোজ গত মাসে হাতে আসার পর প্রধানমন্ত্রী টিকাদান কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন। এছাড়া ভারতের উপহার হিসেবে আরও ২০ লাখ ডোজ অক্সফোর্ডের টিকা পেয়েছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার তৃতীয় দিনের মতো টিকা দেয়া হয়েছে সারাদেশে। রাজধানীর নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের তুলনায় টিকা গ্রহণকারী এবং খোঁজখবর নিতে আসা লোকজনের বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যালের টিকাকেন্দ্রে আগের দু’দিনের চেয়ে ভিড় বেশি দেখা গেছে। তাদের মধ্যে বয়স্ক নাগরিকরাও এসেছেন। মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের টিকা কেন্দ্র ঘুরে দেখার পর স্বাস্থ্য সচিব মোঃ আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে প্রথম দিকে কারও কারও মধ্যে ভয় থাকলেও এখন তা কেটে গেছে। যতটা ভয়ভীতি ছিল, এখন একেবারেই নাই; একটা উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আবদুল মান্নান বলেন, আপনারা (সাংবাদিক) নিজেরাই দেখছেন, আমার বলার কিছু নাই। মানুষের লাইন আছে, একের পর এক আসছে এবং টিকা দেয়ার কোন ঝামেলা নাই। অনেকের কাছে জানতে চেয়েছি, কিন্তু সবাই জানিয়েছেন, টিকা নেয়ার পর কোন অস্বস্তি তারা বোধ করছেন না। সামনের দিনগুলোতে আরও মানুষ আসবে এবং সামগ্রিক পরিবেশ আরও ‘উৎসবমুখর’ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন সচিব। ইতোমধ্যে ছয় লাখের বেশি মানুষ টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা চাইছি মানুষ নিরাপদে এবং আনন্দের সঙ্গে টিকা নেবে। ভিড় করার দরকার নেই। আমাদের সব সাপোর্ট এখানে দেয়া আছে। সবাইকে নিবন্ধন করে টিকা নিতে আসার আহ্বান জানিয়ে মান্নান বলেন, স্পটেও রেজিস্ট্রেশন করছি, কিন্তু কোনটা করছি? বয়স্ক মানুষ চলে এসেছেন, তার নাম রেজিস্ট্রেশন করে দিচ্ছি। সবাইকে আশ্বস্ত করে সচিব বলেন, অস্থিরতা কোন কারণ নেই। পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন আছে। আরও ভ্যাকসিন আমরা পাচ্ছি বিভিন্ন সোর্স থেকে। স্বাস্থ্য সচিব জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির নেতৃত্বাধীন প্ল্যাটফর্ম কোভ্যাক্স থেকেও বাংলাদেশ অক্সফোর্ডের টিকা পাবে। এছাড়া ফাইজারের কিছু টিকাও আসবে। আর সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে প্রতিমাসে যে ৫০ লাখ ডোজ পাওয়ার কথা, তার ফেব্রুয়ারির চালান আসার তারিখ চূড়ান্ত না হলেও সময়মতোই তা পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি। আবদুল মান্নান বলছেন, সব মিলিয়ে দেশে টিকা নিয়ে কোন সঙ্কট ‘হবে না’ বলেই সরকার আশা করছে। যতদিন জনগণ টিকা নিতে চাইবে, টিকার মূল্য যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সুরক্ষা দিতে মানসিকভাবে ও আর্থিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন। যে টিকা বাংলাদেশে দেয়া হচ্ছে, তার প্রতিটি ভায়ালে থাকে ১০টি ডোজ। অর্থাৎ প্রতিটি ভায়াল খোলার পর দশজনকে টিকা দেয়া যায়। এ ক্ষেত্রে কোন অপচয় হওয়ার সুযোগ থাকছে কি না- সেই প্রশ্নে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এবিএম খুরশীদ আলম বলেন, যে কোন ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ নষ্ট ধরেই হিসাবে করা হয়। তারপরও আমরা বলেছি দশের গুণিতক লোক না আসা পর্যন্ত ভায়াল না খুলতে। তবে আমরা হিসাবে করে দেখেছি, অপচয় দশ শতাংশ এখনও হয়নি।’ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ নাজমুল হক জানান, এ কেন্দ্রে সোমবার ৫০০ জনকে প্রথম ডোজ দেয়া হয়েছিল। মঙ্গলবার দুপুরের আগেই সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানান নাজমুল হক। এদিকে, মঙ্গলবার হুইল চেয়ারে করে টিকা কেন্দ্রে আসেন সাবেক অর্থমন্ত্রী ৮৭ বয়সী আবুল মাল আবদুল মুহিত। টিকা নেয়ার পর বললেন, ‘নো ফিলিং এ্যাট অল’। বেলা সোয়া ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে টিকা নিতে আসেন বাংলাদেশের তিনি। মাস্ক, ফেসশিল্ড পরা মুহিতের টিকা নেয়ার আগের আনুষ্ঠানিকতা সারেন পরিবারের স্বজনরা। আনুষ্ঠানিকতা সেরে সাড়ের ১১টার দিকে ভিআইপিদের জন্য নির্ধারিত বুথ থেকে টিকা নেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মুহিত। তিনি বলেন, নোভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর গত মার্চ মাস থেকে বাসায় ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার টিকা নেয়ার জন্য বাসার বাইরে এসেছেন। করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে সবাইকে টিকা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা সকলে ভ্যাকসিন নেন। এটা আপনার এবং আপনার পরিবারের জন্য প্রয়োজন, সমাজের জন্য প্রয়োজন। ৮৭ বছর বয়সে আমার শেষই হয়ে গেছে জীবন। আমি (টিকা) নিচ্ছি। এ সময় সাবেক অর্থমন্ত্রীর ছোট ভাই এ কে এ মুবিন, এএসএ মুইজ, বোন শাহলা খাতুন, শিপা হাফিজা, নাজিয়া খাতুন, রিও আজিজা, মুবিনের স্ত্রী লুলু মুবিন এবং মুহিতের পুত্রবধূ মানতাশা আহমেদ ছিলেন। তারাও টিকা নিয়েছেন। মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যালের টিকাকেেেন্দ্র আগের দু’দিনের চেয়ে ভিড় বেশি দেখা গেল। তাদের মধ্যে বয়স্ক নাগরিকরাও এসেছেন। টিকা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক তাসমিনা পারভীন বলেন, আমাদের এখানে প্রথম দিন ২৭০ জন টিকা নিয়েছিলেন। গতকাল নিয়েছেন ৫০০ জন। আর আজ তৃতীয় দিনে সকালেই অনেকে এসেছেন টিকা নিতে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক আলাউদ্দিন আল আজাদ জানান, এ পর্যন্ত যারা টিকা নিয়েছেন, তারা সবাই ‘ভাল আছেন’। জেমকন গ্রুপের চেয়ারম্যান কাজী শাহেদ আহমেদ এবং গ্রুপের পরিচালক ও বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী আমিনা আহমেদ করোনা প্রতিষেধক টিকা নিয়েছেন। মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকা নেন তারা। এই টিকা কার্যক্রমের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন কাজী শাহেদ আহমেদ ও আমিনা আহমেদ। টিকা নেয়ার পরে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কাজী শাহেদ আহমেদ বলেন, খুব সুন্দর পরিবেশে ভ্যাকসিন নিতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার ও নার্সরা যত্ন নিয়ে ভ্যাকসিন প্রয়োগের কাজ করছেন। তাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকেও কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তার প্রচেষ্টায় খুব দ্রুততার সঙ্গে দেশে ভ্যাকসিন এসে পৌঁছেছে।
×