ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

জাসিন্তা আরেং

নন্দিত হোক প্রবীণদের জীবন

প্রকাশিত: ২০:৫৭, ১ অক্টোবর ২০২০

নন্দিত হোক প্রবীণদের জীবন

জীবনের নন্দিত ও চিরন্তন এক অধ্যায়ের নাম প্রবীণকাল। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই জীবনের দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ চলতে চলতে আজ তারা প্রবীণ। এ জীবনে পৌঁছেও যেন প্রবীণদের সংগ্রাম থেমে নেই। তবে তা নিন্দার বা অবহেলার নয়, বরং তা প্রশংসার ও গুণকীর্তনের। করোনাকালে পরিবার ও সমাজে প্রবীণরা কতটুকু সুরক্ষা ও সেবা পাচ্ছে তা প্রশ্নাতীত। সাধারণত অনেক পরিবারেই প্রবীণেরা যথাযথ নিরাপত্তা ও সেবা এবং চিকিৎসা-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে, ছেলেমেয়েদের দ্বারা পরিত্যক্ত অনেক প্রবীণই বৃদ্ধাশ্রমে অনুযোগ ও অভিযোগবিহীন জীবন কাটাচ্ছেন। তা ছাড়া মানসিক চাপ, দারিদ্র্যতা ও একাকীত্ব এগুলো প্রবীণদের নিত্যসঙ্গী। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাঙালী সংস্কৃতির মর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে। বাঙালী সংস্কৃতিতে প্রবীণদের বৃদ্ধাশ্রমে প্রেরণ যাতে কোন সংস্কৃতি হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রবীণেরা শক্তি, সামর্থ্য ও স্মৃতিশক্তির দিক দিয়ে দুর্বল হলেও জ্ঞানে, প্রজ্ঞায় ও অভিজ্ঞতায় প্রবীণদের জুড়িমেলা ভার। কেননা, তাদের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার আলোকেই বর্তমানের ও আগামীর পথ প্রসারিত হয়। কাজেই, সমাজে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে একতা আনয়ন করতে হলে প্রবীণদের অনুপ্রেরণা নিয়েই আগামীর পথে হাঁটতে হবে। বাস্তবিক কারণেই শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা কারও কারও সন্তান-সন্ততি, আপনজন ও পাড়া-প্রতিবেশী সকলের কাছে প্রবীণদের গুরুত্বকে কম-বেশি কমিয়ে দেয়, যা তারা পদে পদে অনুভব করতে পারেন। অনস্বীকার্য যে, একাকীত্ব, বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা, শক্তি-সামর্থ্য হারানোর তীব্র কষ্ট তাদের অস্তিত্বহীন ও বাড়তি বোঝা ভাবতে বাধ্য করে। এই কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তারা যেন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। তাদের শিশুসুলভ আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যেন আমরা প্রবীণদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ না করি। বরং তাদের মতামত প্রকাশের ও জীবনকে উপভোগ করার সুযোগ দেই। স্মরণে রাখতে হবে যে, যুবাকালে তারা যেসব ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা উপভোগ করার অধিকার চর্চা করেছে, প্রবীণকালেও তারা সে সব অধিকার চর্চা করার অধিকার রাখে। প্রবীণ হলেও তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। যদি তা আমরা কেড়ে নেয়ার দুঃসাহস দেখাই, তবে তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধ হবে। বর্তমানে করোনার আঘাত প্রবীণদের জীবন সংগ্রামে যেন নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। প্রবীণদের মধ্যে করোনাভাইরাসের অবাধ সংক্রমণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকায় তাদের জীবন সংগ্রাম হয়ে দাঁড়িয়েছে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যার ফলে প্রবীণরা স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আতঙ্কিত ও ভীতসন্ত্রস্ত জীবনযাপন করছেন। প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এ্যান্তনিও গুতেরেস বলেন, ‘কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী প্রবীণদের মধ্যে অনাকাক্সিক্ষত ভীতি ও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জরুরী স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়াও এ মহামারীর ফলে প্রবীণদের মধ্যে দারিদ্র্যতা, বৈষম্য ও এককীত্বের সঙ্কট দেখা দিয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বসবাসকারী প্রবীণরা এর বিরূপ প্রভাবের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে।’ কাজেই, প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়াও বিশ্বায়নের ফলে, শিশু ও যুবাদের শুধু পিতা-মাতার সঙ্গেই নয়, বাড়ির প্রবীণদের সঙ্গে শারীরিক-মানসিক দূরত্ব বেড়েই চলেছে। আবার বয়সের বিশাল ব্যবধান থাকায় ছেলেমেয়েরা প্রবীণদের সঙ্গে সহভাগিতা করতে দ্বিধাবোধ করে। পিতা-মাতারাও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনাকালীন বাড়ির প্রবীণদের এড়িয়ে চলে। এভাবে আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটেও প্রবীণরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এসব কারণে প্রবীণরা নিজেদের অসহায় ও বোঝা ভাবতে শুরু করে ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে উদ্যোগী হতে হবে। সমাজে তাদের মানবাধিকার রক্ষা করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে সামাজিকতার চর্চা করতেও যেন পিছপা না হই। প্রবীণরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৈশ্বিক মহামারীর মতো যে কোন জরুরী অবস্থায় তাদের সেবাদান ও নিরাপত্তা প্রদান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে আমরা যেন অনীহা না দেখাই। কেননা আমরাও একদিন প্রবীণ হব। দায়িত্বশীল পিতা-মাতাদের শৈশব থেকেই প্রবীণদের প্রতি শিশুদের ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। যেন তারা পরবর্তীকালে প্রবীণদের হেয় করে দেখার সঙ্কীর্ণ মানসিকতা পরিত্যাগ করে আধুনিক যুগে কিভাবে আরও অভিনব উপায়ে প্রবীণদের নিরাপত্তা, সেবাদান ও মানসিক সমর্থন এবং মর্যাদা দেয়া যায় তা নিয়ে ভাবতে তৎপর হয় এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে তা চর্চা করে। দেশ ও সমাজকে আড়ালে থেকে সমৃদ্ধির পথে পরিচালনাকারী প্রবীণদের সেবা ও নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাকালকে প্রবীণদের প্রতি আরও যতœশীল ও সেবায় ব্রতী হওয়ার আহ্বান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। পরিশেষে বলতে চাই, প্রবীণদের সংগ্রামী যাত্রা যুগে যুগে নন্দিত হোক, বন্দিত হোক প্রবীণদের জয়গান। লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]