সোমবার ১১ মাঘ ১৪২৮, ২৪ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় করোনার ভ্যাকসিন

ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় করোনার ভ্যাকসিন
  • জান্নাতুন নিসা

বিশ্বজুড়ে আজ শব্দের বারান্দায় দুঃখের কপাট খুলেছে মহামারী করোনাভাইরাস। আর ভৈরবী কৃষ্ণচূড়ার বিষণ্ণ রঙের স্বচ্ছ আল্পনায় মেলে ধরেছে, পড়ন্ত সুখের বুকে ছিটকে পড়া টগবগে শবের জীবন্ত মিছিল। তবে মানুষও সেই ক্রান্তিকালীন মিছিলের হাত ধরে পিছিয়ে নেই। নীরব সাধনায় চন্দ্রখসা বৃন্ত থেকে এই মহামারী নির্মূলে প্রতিষেধক, ওষুধ কিংবা টিকা অর্থাৎ ভ্যাকসিন আবিষ্কারে একের পর এক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানী-গবেষকগণ মহামারীর ধবল ছায়ার ক্রান্তদর্শী নীলাভ স্পর্শে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে আঁধারে ডুবন্ত বন্দীদশা থেকে বিশ্বকে মুক্ত করতে। মেতে উঠেছে কোভিড-১৯ ধ্বংসের যথোপযুক্ত ওষুধ কিংবা টিকা আবিষ্কারে। নেমেছে টিকা আবিষ্কারের প্রতিযোগিতায়, তুমুল বেগে ছুটছে কোভিডযুদ্ধে জয়ী হওয়ার আকাক্সক্ষায়। এই যুদ্ধ জয়ের নেশায় মত্ত ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই তাদের অস্তিত্বের দিকে তাকাচ্ছে। কারণ মহামারী কিংবা এর সংক্রমণ সম্পর্কে এখনও সঠিক ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে ব্যবসায়িক এই খেলায় সে-ই জিতবে যে আগে করোনার টিকা বাজারে আনবে, এতে কোন দ্বিমত নেই। সেইসঙ্গে ভয়ের বিষয় হচ্ছে টিকা আবিষ্কারের এই খেলায় তাড়াহুড়ো করলে বিপদ বাড়বে সহস্রগুণ। অন্যদিকে সার্সের মতো একবার সংক্রমণ কমে গেলে এ নিয়ে গবেষণা বা টিকা উৎপাদনের কাজটি আর এগোবে না। আর তাই সাংঘর্ষিক কারুলিপির জলন্ত পিন্ডের শান্ত শিবিরে বসেই বিশ্বজুড়ে চলছে ভ্যাকসিন কিংবা টিকা আবিষ্কারের দুর্দান্ত ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা।

অবাক হলেও সত্যি এটাই যে, চিকিৎসার মূলমন্ত্র সেবা হলেও যেমন একজন চিকিৎসককে রোগী দেখার পর ফি নিতে হচ্ছে ঠিক তেমনি প্রতিষেধক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিনিয়োগ এবং উপার্জনের দিকে তাকাতে হচ্ছে। আর এই তাকানোই এক সময় ব্যবসায়িক রূপরেখার বদৌলতে মুনাফাজ্ঞানে জমজমাট হয়ে উঠে। অর্থাৎ যে কোন রোগ বড় আকারে বিশ্বব্যাপী না ছড়ালে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনবোধে গবেষণা বা টিকা উৎপাদনে আগ্রহ হারায়। কারণ টিকার এই গবেষণা ও উৎপাদন বিশাল বিনিয়োগের ব্যাপার। ফলে এত সময় নষ্ট ও খরচের পর যদি পর্যাপ্ত মানুষ আক্রান্ত না থাকে, তাহলে ব্যবসায়িক দিক থেকে তা একেবারেই ক্ষতির সম্ভাবনায় পূর্ণ। সেক্ষেত্রে করোনাভাইরাসকে বিনাশ করতে ব্যস্ত গোটা বিশ্ব। বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে বলে, ‘২০১৯ সালে ক্যান্সার সংক্রান্ত ওষুধ তৈরি ও গবেষণায় বড় ফার্মাগুলো ১৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলার আয় করেছে। অন্যদিকে, সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় তাদের আয় পাঁচ হাজার কোটির কিছু বেশি।’ ২০২০ সালে করোনার কারণে বড় ফার্মাগুলোর মনোযোগ এরই মধ্যে সরে এসেছে অনেকখানি। ‘সামনে এই মহামারীর চিকিৎসার ওষুধ তৈরিতেই মনোযোগ সবচেয়ে বেশি হবে।’ এমনটি ধারণা করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাই নিজেদের মতো করে যতটা সম্ভব দ্রুত গতিতে প্রতিষেধক বা টিকা তৈরির পথে হাঁটছে অনেক দেশ। কেবল তাই-ই নয়, তারা অর্থ উপার্জনের বিষয়টিকে প্রধান বিবেচনা করেই এগোচ্ছে। সেক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের টিকা আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববাসীকে অর্থের সংকুলান করতে হবে সেকথা নিশ্চিত!

এদিকে করোনাভাইরাসের থাবায় ক্ষতবিক্ষত গোটা বিশ্বের মানুষের যখন একটাই চাওয়া, ঠিক তখনই টিকার জন্য অপেক্ষা না করে এ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে করোনা থেকে মুক্তি মিলবে বলে বলছেন অনেক বিজ্ঞানী। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়াগোর বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে গবেষণা করেছেন। আমেরিকার শীর্ষ সংক্রমক রোগ বিশেষজ্ঞ এ্যান্থনি ফাউসি বলছেন, ‘শরীরে এ্যান্টিবডি প্রয়োগের মাধ্যমে করোনা মোকাবেলায় সফলতা আসবেই। যখন ভাইরাস শরীরে আক্রমণ করে তখন কিছু লক্ষণ দেখা দেয়। শরীরে এ্যান্টিবডি তৈরি হলে এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে। ভাইরাসটি যেন না ছড়াতে পারে এ্যান্টিবডি সে বিষয়টি প্রতিরোধ করে।’ ওষুধ প্রস্তুতকারী অনেক প্রতিষ্ঠানের মতে এ্যান্টিবডির মাধ্যমেই করোনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। তারা আরও বলছেন, ‘এ্যান্টিবডি চিকিৎসা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে অস্থায়ীভাবে সংক্রমণ রোধ করতে পারে। ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত এগুলো থেরাপিউটিক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’ তবে একটি এ্যান্টিবডি নাকি দুটি এ্যান্টিবডি করোনা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এই নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এরই মধ্যে মানবদেহে ডুয়েল এ্যান্টিবডির ট্রায়ালের কথা ভাবছে এ্যাস্ট্রাজেনেকো। টিকা আবিষ্কার এ্যান্টিবডি ট্রায়াল কিংবা প্রতিষেধক বাজারজাতকরণ প্রসঙ্গে ইওয়াই-এর গবেষক আলেক্সান্ডার নুইকেন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ের সঙ্গে খেলছে এবং দেখছে গ্রীষ্মের পর পরিস্থিতি কোনদিকে যায়।’ নুইকেন আরও বলেন, ‘দৃশ্যত প্রায় ৯৭% টিকা অনুমোদন পাবে না। অথচ বড় ফার্মাগুলো ইতোমধ্যেই প্রচুর বিনিয়োগ করেছে।’ জার্মান ফার্মা গবেষক গ্যার্ড স্ট্যুর্ৎস বলেন, ‘২০১৯ সালের নতুন গবেষণার জন্য বিনিয়োগের কারণেই ফার্মাগুলো বর্তমান সঙ্কটে এত কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে।’ সেই সুবাদেই হয়ত ইতোমধ্যে প্রায় ১৬০টি সম্ভাব্য, ৬টি প্রায় সফল ভ্যাকসিন ও ২৪০টি থেরাপিউটিক এজেন্ট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রায় ৭০০টি টেস্ট বাজারে এনেছে বড় কিছু ফার্মা। এসবকিছু নিয়েই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে বিশ্ববাসীর চাওয়া একটিই, কোভিডমুক্ত পৃথিবী!

করোনার টিকা নিয়ে যখন ক্রমশ আশার আলো ঝলমলে হচ্ছে তখন বাজারজাতকরণের আগেই বিশ্ববাসীকে টিকার মূল্যের বিষয়টি ভাবতে হচ্ছে। কারণ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, গবেষক কিংবা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ এই প্ররিশ্রমের ফসল এত শীঘ্রই হয়ত বিনামূল্যে মানুষের হাতে পৌঁছবে না। এরই মধ্যে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজার এবং বায়োএনটেক যদিও তাদের চুক্তির শর্তানুযায়ী ওষুধের দাম এখনও প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় তাদের উৎপাদনকৃত করোনার দুই ডোজের একটি টিকার দাম পড়বে প্রায় ৩৯ ডলার। চীনের দুই ডোজের একটি টিকার মূল্য হতে পারে প্রায় ১০ ডলারের মধ্যে। সিএনএনের এক খবরে বলা হয়েছে মর্ডানার সম্ভাব্য টিকার দাম পড়বে প্রায় ৪০-৫০ ডলার। তবে তা কেবল মার্কিন নাগরিকদের জন্য। কিন্তু তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মকে মাথায় রেখে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের যেসব দেশের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ডলারের বেশি নয় তাদের ফ্রিতে টিকা দেয়ার কথা বলছে। তবে সবচেয়ে সস্তায় করোনার টিকা দেয়ার কথা সরাসরি ঘোষণা দিয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের ভ্যাকসিন পার্টনার এস্ট্রেজেনেকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে প্রতিটি টিকার দাম হবে মাত্র এক কাপ কফির দামের সমান। তবে তা শখের কফির মতো লাখ ডলার নয় বরং তিন থেকে চার ডলার মাত্র। এদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বড় ফার্মাগুলো এইডস কিংবা ক্যান্সারের মতো তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলো থেকে সরে আসবে না। মহামারী সংক্রমণ থেমে যাওয়া অনিশ্চিত। তাই ব্যবসার সব মনোযোগ এখানে সরিয়ে আনাও সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অনেকেই। ইওয়াইয়ের গবেষণা বলছে, এরই মধ্যে অনেকগুলো একত্রিত ও অধিগ্রহণ (এম এ্যান্ড এ) পরিকল্পনা বাতিল হয়ে গিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার ভ্যাকসিন ভ্যাকসিন খেলা চলছে। চলুক, তাতে ক্ষতি নেই! কারণ বিনিয়োগ মানেই লাভ না হলেও নিশ্চিত উপার্জন। তাই আজ পৃথিবীর মানুষ তাকিয়ে আছে অন্তত একটি সফল ভ্যাকসিনের দিকে। যেখানে প্রতিটি চাহনীর টগবগে উচ্ছ্বাসে, উড়ন্ত মশালের ফ্যাকাশে স্ফুলিঙ্গের ধোঁয়ায় পূর্ণতা পাচ্ছে কেবল একটিই সমোচ্চারিত শব্দের হাহাকার। বিশ্বজীবনের ছন্দহীন ঘরবন্দী জীবনে ভেসে আসছে কেবল একটিই প্রার্থনা-কোভিডমুক্ত পৃথিবী চাই। যে পৃথিবীর পথে আমরা ঘুরে বেড়াব, আনন্দোল্লাসে মেতে উঠব সবাই মিলে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও নারীনেত্রী

শীর্ষ সংবাদ: