ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

সড়কে কেন মরণ কান্না

প্রকাশিত: ০৯:৩৪, ২৮ জানুয়ারি ২০২০

সড়কে কেন মরণ কান্না

প্রতিনিয়তই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। ঝরছে তরতাজা প্রাণ, কাঁদছে মানুষ। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সর্বদা মানুষ মৃত্যুর বিষয়টি শিকারির গুলিতে প্রতিনিয়ত ‘পক্ষী মারা’ সংক্রান্ত সহজ স্বাভাবিক বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। আমরা আমাদের উদরপূর্তির জন্য যেমন বাঁধাহীনভাবে হরহামেশাই পাখি হত্যা করে চলেছি তেমনি সড়কে চালক নামধারী মৃত্যুদানবের খামখেয়ালিপনায় প্রতিদিন পাখির মতো মানুষের জীবন নাশ হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যু আমাদের কপালে নিত্য লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা খ-ন করার উপায় কারও জানা নেই। এই নিরুপায় অঘটন আস্তে আস্তে মুমূর্ষু রূপ ধারণ করেছে, যেখান থেকে উত্তরণের কোন সন্তোষজনক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনার হৃদয়বিদারক খবর যেন সংবাদপত্রের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর এ অলক্ষুণে সংবাদ দিয়েই দিন শুরু করেন সংবাদপত্রের অগণিত পাঠক। প্রতিদিনকার সড়কে মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু সংবাদ সকলকে ভাবিয়ে তুলছে। ১৮ জানুয়ারির সংবাদপত্র জানিয়েছে, রাজধানীর উত্তরায় শুক্রবার বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই দিন চট্টগ্রামের পটিয়ায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দম্পতিসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে আলাদা সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ নিয়ে গত ২৬১ দিনে সড়কে ২১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ১৯ জানুয়ারির খবরে বলা হয়, যশোরে দুই প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিন নারী সদস্য এবং সিলেটে দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। গত ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, সারাদেশে গত বছর ৫ হাজার ৫১৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৭ হাজার ৮৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ১৩ হাজার ৩৩০ জন। ২০১৯ সালের সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল আগের বছর ২০১৮ সালের প্রায় সমান। ২০১৮ সালের তুলনায় গত বছর প্রাণহানির সংখ্যা ৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা হয় ১৫ জুন। এই দিনে ৩১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ১২১ জন আহত হয়। এ বছর সবচেয়ে কম সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ১৪ জুলাই। এই দিন ২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত হয়। [সূত্র : আ. সময়, ১২.০১.২০] অপরদিকে ঢাকার গণমাধ্যমকর্মীদের সংগঠন শিপিং এ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরাম (এসসিআরএফ) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৯ সালে চার হাজার ২১৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮৫ নারী ও ৭৫৪ শিশুসহ কমপক্ষে চার হাজার ৬২৮ জন নিহত ও আট হাজার ৬১২ জন আহত হয়েছেন। ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মহাসড়ক, জাতীয় মহাসড়ক, আন্তঃজেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কসহ সারাদেশে এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। ২০১৯-এ সড়ক দুর্ঘটনা ও আহতের সংখ্যা পূর্ববর্তী বছর ২০১৮ সালের তুলনায় কম হলেও প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০১৮ সালে চার হাজার ৩১৭টি দুর্ঘটনায় চার হাজার ৫৮০ জন নিহত ও ১০ হাজার ৮২৮ জন আহত হয়েছিল। [সূত্র : সমকাল, ০৩.০১.২০] প্রতি বছর কিংবা প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে বৈ কমছে না। এ দুর্ঘটনায় অকালে ঝরছে অসংখ্য প্রাণ, নিঃস্ব হচ্ছে অনেক পরিবার স্বজন। কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না সড়কে এই মহামারী তা-ব। আর কত প্রাণ ক্ষয় হলে আমাদের বোধোদয় হবে, সড়কে ফিরে আসবে শৃঙ্খলা। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় দুই কলেজশিক্ষার্থী বাসচাপায় মারা যাওয়ার পর সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে পড়ে রাজধানীর ব্যস্ত রাজপথ। সর্বস্তরের জনসমর্থনে এ আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে ওঠে। সড়ক দুর্ঘটনায় অকাল প্রয়াত দুই শিক্ষার্থীর শোকে স্তব্ধ শিক্ষার্থী সমাজ ক্ষোভের আগুনে জ্বলে ওঠে। সড়কে সর্বদা প্রাণ বিলীনে ব্যথিত মানুষজন নিজেদের সুপ্ত অন্তর্জ্বালা ছাত্রদের আন্দোলন সুযোগে বিস্ফোরিত প্রতিক্রিয়ার ব্যাপ্তি ঘটায়। সড়ক দুর্ঘটনার এ আন্দোলন পুরো দেশকে জাগিয়ে তুলে। ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের একত্রিত সড়ক উচ্ছৃঙ্খল অসন্তুষ্টির মর্মবেদনা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেয় বড় ধাক্কা। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার বিশেষ মনোযোগী হয়। গণপরিবহনের ভেতরে সৃষ্ট দীর্ঘ অসঙ্গতি অব্যবস্থাপনা সারাতে সরকার তাৎক্ষণিক কার্যক্রমে অংশ নেয়। কিন্তু ছাত্র আন্দোলন ও সরকারের সুস্থ সড়ক ব্যবস্থাপনার কর্মতৎপরতা কি অস্বাভাবিক মৃত্যু থামাতে পেরেছে? বরং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার মতো প্রাণ বধের অপ্রস্তুত অনাকাক্সিক্ষত খেলা। এই অস্বাভাবিক সড়ক মৃত্যুর শেষ কোথায়? শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় মারা যাওয়ার ঘটনায় স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে। সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী আন্দোলনের স্লোগান সমবেত সুর রাজধানী শহরের বাতাসে এখনও শোনা যাচ্ছে। সচেতন মানুষের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করা সাবধানী বাক্য ‘রাস্তা বন্ধ, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে’-এর পরিপক্ব বাস্তবতার রেশ এখনও সজীব। শোকাতুর ছাত্র আন্দোলনের তরতাজা দৃশ্যপট এখনও ভেসে উঠছে। কিন্তু আন্দোলনপূর্ব প্রাণ হরণের ব্যথিত অঘটন বাংলাদেশকে ছেড়ে যায়নি। আন্দোলন হয়ত শেষ হয়ে গেছে। সবাই সবার ঘরে ফিরে গেছে। কিন্তু জীবন নাশের দুরন্ত গতি থেমে নেই। দেশব্যাপী চলছে মরণঘাতী মহাদুর্যোগ। দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় তাদের সহপাঠী ছাত্র সমাজ হয়ত দুই পরিবারের সমব্যথি হয়ে রাস্তায় নেমেছে। তারা সকলের যৌক্তিক সমর্থন নিয়ে সরকারের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু দেশব্যাপী যে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজনশূন্য আর্তনাদ ও আজীবনের শোক বয়ে আনা অপূরণীয় ক্ষতির অস্বাভাবিক মরণযাত্রা অব্যাহত রয়েছে তার প্রতিবাদ কে করবে? ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল রাজধানীর কাওরান বাজারে দুই বাসের রেষারেষিতে তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের মারা যাওয়া; গৃহকর্মী রোজিনার প্রথমে পা হারানো, পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া; কুষ্টিয়ায় বাসের ধাক্কায় মায়ের কোল থেকে পড়ে শিশু আকিফার প্রাণহানি, চট্টগ্রামে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে রনি নামের এক যাত্রীকে বাস থেকে ফেলে হত্যা করার মতো অনেক অঘটন জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটিয়েছে। কিন্তু এতসব আন্দোলন প্রতিবাদের পরও যেন দুর্ঘটনা থেমে নেই। বরং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অস্বাভাবিক মৃত্যুর এ প্রতিযোগিতা। সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় কারণ অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে প্রতিনিয়ত বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালক বা মালিকের উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এছাড়া আইনে সরাসরি কঠোর শাস্তির বিধান না থাকায় চালকসহ সংশ্লিষ্টরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। তারা মনে করেন, অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হলে বেপরোয়া গাড়ি চালানো অনেকাংশে বন্ধ হবে। আর সবাই সচেতন হলে আশিভাগ দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। চালকের আসনে বসে যারা সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তাদের কয়জনের বৈধতা আছে? অধিকাংশ চালকের নেই গাড়ি চালানোর বৈধ কাগজপত্র। এভাবেই চলছে তাদের চালক জীবন। যার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। সড়কে চলাচলরত বেশিরভাগ গাড়ির চালকই অদক্ষ অনভিজ্ঞ অবৈধ। এদের দ্বারা যদি গাড়ি চালানো হয় তাহলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুই স্বাভাবিক। কিন্তু এ ব্যাপারে কারও নজর নেই। দুর্ঘটনায় দেশ কেঁপে উঠলেই কেবল হুলুস্থূল শুরু হয়। অন্যথায় খোঁজ নেই গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলার বিষয়টিতে। মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হওয়া সড়কের সুশৃঙ্খলায় যদি মনোযোগ না থাকে তবে যা হওয়ার তাই হবে। দেশজুড়ে মরণ মহাযজ্ঞের সড়ক অস্থিতিশীলতাই তার প্রমাণ। এ থেকে উত্তরণের পথ খোঁজাই উত্তম। মনে রাখতে হবে, একটি জীবন একটি দেশকে যেমন নেতৃত্ব দিতে পারে তেমনি একটি পরিবারকেও নেতৃত্ব দেয়। অতএব এই মহামূল্যবান জীবন যদি সড়ক দুর্ঘটনার মতো অস্বাভাবিক মৃত্যুর কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে থমকে যাবে অগণিত মানুষের নির্ভরশীল অগ্রযাত্রা। সড়ক দুর্ঘটনায় অসময়ের যাত্রী হওয়া জীবনগুলোকে রক্ষা করতে হবে। এ জন্য সরকারের বিশেষ মনোযোগ অবশ্যই জরুরী। সড়ক অব্যবস্থাপনার চিহ্নিত সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তা সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে অকালে প্রাণ বধের অপরাধে ছাত্র আন্দোলনের ক্ষুব্ধ কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তাই সময়ের কাজ সময়ে করাটাই শ্রেয়। আরেকটি বড় সমস্যা যেটা অনেকটা মৌন থেকে যায় তা হলো অসাবধানতা। সেই অসাবধানতার অন্যতম বাহক আমরা সকলে। ব্যস্ততম রাজধানীর যাতায়াত চিত্র লক্ষ্য করলে তা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। যেমন অনেকে ব্যস্ত রাজপথে জীবন ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। কেউ মোবাইলে আলাপচারিতায় পথ পাড়ি দিচ্ছেন। কেউবা আচমকা দৌড়ে ব্যস্ত মহাসড়কের এপাশ থেকে ওপাশে যাচ্ছেন। এই পথ পারাপারের জন্য আমরা সড়কে সটান দাঁড়িয়ে থাকা ওভারব্রিজ ব্যবহার করছি না। জনসাধারণের সুবিধার্থে সরকারের অঢেল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই ওভারব্রিজগুলো পথচারির প্রয়োজনেই নির্মাণ করা হয়েছে। একটু অসাবধানতায় আমরা কত বড় বিপদ ডেকে আনছি তা ভেবে দেখছি না। চলাচল নিরাপত্তায় প্রস্তুতকৃত ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে মানুষ দৌড়ে কিংবা অন্য কোন উপায়ে রাস্তা অতিক্রম করছে, এমন চিত্র মাঝে মাঝে পত্রিকান্তরে ছাপা হয়। এ ছাড়া ট্রাফিক আইন মেনে না চলার প্রবণতাও আমাদের মাঝে বেশ প্রবল। চালক অদক্ষতার সঙ্গে মানুষের এই নেতিবাচক দিকগুলো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। তবে চালকের অদক্ষতা ও সড়ক অব্যবস্থাপনাই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। লেখক : সাংবাদিক