ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

বদলি, নিয়োগ, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করলে ৮০ ভাগ দুর্নীতি কমবে

প্রকাশিত: ১১:০০, ৩০ মার্চ ২০১৯

 বদলি, নিয়োগ, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করলে ৮০ ভাগ দুর্নীতি কমবে

তপন বিশ্বাস ॥ খাদ্য মন্ত্রণালয় ও তার অধীন সকল সেক্টর দুর্নীতি মুক্ত করতে কাজ শুরু করেছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধনচন্দ্র মজুমদার। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দুর্নীতির সুতিকাগার চিহ্নিত করে সেখানে হানা দিতে যাচ্ছেন। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে বদলির ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে বিশেষ বরাদ্দ বাতিল, জনবল নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী সাধনচন্দ্র মজুদমদার জনকণ্ঠকে বলেন, বদলি, নিয়োগ ও টেন্ডার এই তিনটি খাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এই সেক্টরের দুর্নীতি ৮০ ভাগ কমে যাবে বলে মনে করি। বাকিটুকু মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খাদ্য অধিদফতর তথা মাঠ প্রশাসনে দুর্নীতির সুতিকাগার হলো খাদ্য গুদাম। খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে এই সেক্টরের দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে। গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহযোগীদের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত টাকা ওঠাতে থাকে। এ টাকার অংশ চলে আসে শীর্ষ মহল পর্যন্ত। এই সেক্টরে অতীতে যারা অবসরে গেছেন তাদের অধিকাংশ কর্মকর্তা বিপুল বিত্তবৈভবেরও মালিক। এসব টাকা সারাদেশ থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে। ইতোপূর্বে অধিদফতরের প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাছে প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ টাকা পৌঁছে দিতেন খাদ্য গুদামে চাকরি করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জানা গেছে, বড় গোডাউনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পেতে টাকা ঘুষ দেয়ার প্রতিযোগিতা হওয়ারও নজির আছে এই বিভাগে। দুর্নীতি করলেও কিছু হয় না। উর্ধতন কর্মকর্তাকে ঠিকমতো কমিশন দিলে তিনি ভাল কর্মকর্তা বনে যান। আবার কমিশনে ঘাটতি হলে তার সামনে ঝুলতে থাকে । এমনকি মন্ত্রীর নির্দেশে কেউ কোন গুদামে বদলি হলে তাকেও দিতে হয় উর্ধতন কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের উপঢৌকন। তাতে গুদামের কর্মকর্তারাও বাধ্য হন দুর্নীতি করে তা পুষিয়ে নিতে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সহকারী খাদ্য পরিদর্শককেও (যাদের খাদ্য গুদামের দায়িত্বে দেয়ার কথা নয়) বড় খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে তারা এই নিয়োগ পেয়ে আসছেন। এসব কথা বিবেচনায় নিয়ে এই প্রথমবারের মতো খাদ্য পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শকসহ বিভিন্ন পদে গ্রেডেশন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নতুন খাদ্যমন্ত্রী। এটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। জ্যেষ্ঠতা, সততা এবং কর্মদক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে এই গ্রেডেশন করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, গ্রেডেশন করা সম্পন্ন হলে দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের বড় খাদ্য গুদামে পদায়ন করা হবে। স্বচ্ছতার সঙ্গে এই পদায়ন দিলে আশা করি তারাও দুর্নীতি থেকে সরে আসবে। এর পরও তাদের ওপর থাকবে মনিটরিং ব্যবস্থা। তখন কেউ দুর্নীতি করলে ছাড় পাবে না। তাকে শাস্তি পেতে হবে। তিনি বলেন, পদায়নের জন্য এই নীতিমালা করা হচ্ছে। সেটিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সূত্র জানায়, গ্রেডিং করা হলে প্রতি দুই বছর পর মনিটরিংয়ের ভিত্তিতে গ্রেডেশন তালিকা পরিবর্তন হবে। তাদের পদায়নের জন্য একটি নীতিমালাও থাকবে। কিন্তু খাদ্য অধিদফতরের কিছু কর্মকর্তা শুরুতে এই গ্রেডেশনের বিরোধিতা করেন। তারা মন্ত্রীকে বলেন, এটা করা সম্ভব নয়। কিন্তু মন্ত্রী তাদের সাফ জানিয়ে দেন, গ্রেডেশন তালিকা থাকতে হবে। হোটেল-রেস্তরাঁয় যদি গ্রেডেশন থাকতে পারে তবে কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কেন থাকবে না। আমি কোন কথা শুনতে চাই না। এটা হবে, হবে। তার পর অধিদফতর কাজটি শুরু করে। বর্তমানে এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। জানা গেছে, এই গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুত করার জন্য খাদ্যমন্ত্রী সাধনচন্দ্র মজুমদার দেশে সকল খাদ্য পরিদর্শক ও সহকারী পরির্দশকদের তালিকা সংগ্রহ করেছেন। তিনি নিজেও এটি দেখছেন। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে কোন্ কর্মকর্তা-কর্মচারী কোথায়-কতদিন চাকরি করেছেন, তাও খুঁজে দেখছেন মন্ত্রী। এতে দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ভাল স্টেশনে চাকরি করছেন। সেটি কি কারণে করছেন তাও দেখা হবে; দক্ষতার ভিত্তিতে নাকি তদ্বিরের ভিত্তিতে। পাশাপাশি ধারণক্ষমতার ভিত্তিতে খাদ্য গুদামগুলোরও গ্রেডিং করা হবে। খাদ্য গুদামগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হবে। ‘এ’ গ্রেড, ‘বি’ গ্রেড এবং ‘সি’ গ্রেড। কর্তকর্তাদের গ্রেডেশন তালিকা থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘এ’ গ্রেডের খাদ্য গুদামে পদায়ন পাবেন। এভাবে ‘বি’ গ্রেড ও ‘সি’ গ্রেডের খাদ্য গুদামে পদায়ন পাবেন। এছাড়া খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সব টেন্ডারিংকে ই-টেন্ডারিং করার নির্দেশ ইতোমধ্যে দিয়েছেন মন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তিনি বলেছেন, কোন অবস্থায় আমি টেন্ডার বা অন্য কোন ক্ষেত্রে দুর্নীতি সহ্য করব না। এ ব্যাপারে যা যা করা প্রয়োজন তা করতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। খাদ্য অধিদফতরে প্রায় এক হাজার ছয় শ’ পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, এক হাজার ছয় শ’ পদের বিপরীতে প্রায় ১৩ লাখ আবেদন জমা পড়েছে। এটি বিসিএস’র আদলে প্রথমে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করতে হবে। পরে সেই বাছাইকৃতদের মধ্যে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে প্রকৃত মেধাবীদের নিয়োগ দিতে হবে। এই লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচীর ক্ষেত্রে বিশেষ বরাদ্দ বাতিল করেছেন মন্ত্রী। এ বিষয়ে বলেন, অতীতে এই বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে অনেক কথা শোনা গেছে। এ বিষয় নিয়ে নানা অভিযোগও রয়েছে। তাই বিতর্কিত বিষয় ঝেড়ে ফেলতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে বিশেষ বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে।