ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

সত্তর বছরে অত্যাধুনিক নিজস্ব ভবনে পা রাখছে আওয়ামী লীগ

প্রকাশিত: ০৫:৩২, ২৩ জুন ২০১৮

সত্তর বছরে অত্যাধুনিক নিজস্ব ভবনে পা রাখছে আওয়ামী লীগ

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সত্যিই আজ এক অন্যরকম আনন্দের দিন গণমানুষের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের। প্রতিষ্ঠার ৬৯ বছর পর প্রথমবারের মতো সুরম্য ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন নিজস্ব কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলটি। দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের নতুন দশতলা ভবনটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের স্থায়ী ঠিকানা। বাংলাদেশের ইতিহাসে সকল রাজনৈতিক দলের তুলনায় এটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সর্বাধুনিক রাজনৈতিক কার্যালয়। আজ শনিবার ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন স্থায়ী কার্যালয়ের উদ্বোধন করবেন। ১০তলা এই ভবন উদ্বোধনের পর গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনার হাতে নতুন কার্যালয়ের চাবি তুলে দেবেন। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন শেষে সভাপতিম-লী, যুগ্ম সম্পাদকসহ অন্য নেতা ও সহযোগী সংগঠনগুলোর জায়গা নির্ধারণ করে দেবেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, নতুন ভবন উদ্বোধনের পর আওয়ামী লীগের সব সাংগঠনিক কার্যক্রম চলবে ২৩, বঙ্গবন্ধু এভিনিউর এ কার্যালয় থেকে। আর ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয় থেকে দলের নির্বাচনী কার্যক্রম ও সিআরআইসহ দলের অন্যান্য সংস্থার গবেষণামূলক কর্মকা- পরিচালিত হবে। শুক্রবার সকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর কাদের সাংবাদিকদের জানান, দেশের সর্বাধুনিক এই রাজনৈতিক কার্যালয়ে ডিজিটাল লাইব্রেরী, ভিআইপি লাউঞ্জ, সাংবাদিক লাউঞ্জ, ডরমিটরি ও ক্যান্টিন থাকছে। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অফিস থাকবে এই ভবনে। শুক্রবার দুপুরে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের নতুন দশতলা ভবনের কাজ শেষ। আজ প্রধানমন্ত্রী এ ভবনের উদ্বোধনের জন্য সকল প্রস্তুতিও সম্পন্ন। পুলিশসহ নিরাপত্তারক্ষীদের কড়াকড়ি ভবনজুড়ে। ঢুকেই হাতের বাঁ পাশে অভ্যর্থনা ডেস্ক। সিঁড়ির পাশাপাশি দুটি লিফট। বেজমেন্ট ও প্রথমতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও শুধু দলীয় প্রধানের গাড়ি ছাড়া অন্য কোন গাড়ি প্রবেশ করবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। সামনের সড়কে ছেড়ে দেয়া নিজস্ব জায়গায় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। নিচে রক্ষিত নির্দেশনা অনুযায়ী জানা যায়, চতুর্থ ও পঞ্চমতলায় সাধারণ অফিস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, মিডিয়া রুম। ষষ্ঠতলায় সম্মেলন কক্ষ। সপ্তমতলা দলের কোষাধ্যক্ষের জন্য। অষ্টমতলায় সাধারণ সম্পাদকের অফিস। আর নবমতলায় বসবেন দলের সভানেত্রীর জন্য আর দশমতলায় থাকবে ক্যাফেটেরিয়া। তবে নির্দেশনার কিছু ব্যত্যয় ঘটতে পারে। আগের নির্দেশনা অনুযায়ী বেজমেন্ট ও নিচতলায় কার পার্কিং এবং ছাদে হেলিপ্যাড স্থাপন আপাতত হচ্ছে না। দ্বিতীয়তলার কনফারেন্স রুমে ৩৫০ জনের বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তৃতীয়তলায় ২৪০ জনের বসার ব্যবস্থা থাকবে। মাঝখানে কনফারেন্স রুম আর দুই পাশে বেশকিছু কক্ষ রয়েছে। তিনতলার সামনের অংশটা ‘ওপেন স্কাই টেরাস’। অনেকটা বাসার ড্রয়িংরুম বা পাঁচতারকা হোটেলের আদলে করা হয়েছে এ অংশ। এখানে কৃত্রিম বাগানের ফাঁকে ফাঁকে চেয়ার-টেবিল দিয়ে বসার ব্যবস্থা থাকছে। পাশাপাশি থাকবে চা-কফি খাওয়ার আয়োজন। এছাড়া ভবনের চার ও পাঁচতলায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছাড়াও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিমসহ সমমনা অন্যান্য সংগঠনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সাত, আট ও নয়তলায় দলীয় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতিম-লীর সদস্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের কক্ষ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সভাপতির ফ্লোর থাকবে বুলেটপ্রুফ ডাবল গ্লাস। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে নতুন কার্যালয়টি যেখানে নির্মিত হয়েছে, সেই জমিটি ইতোমধ্যে ৯৯ বছরের জন্য সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয়া হয়েছে বলে জানান দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। সরকারী বিধি অনুযায়ী নানা কার্যক্রমের পর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভবন নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কাজে হাত দেয়া হয়। লক্ষ্য ছিল দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার। সেই হিসেবে আগামী সেপ্টেম্বরে ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার চার মাস আগেই শেষ হলো ভবন নির্মাণের কাজ। ভবন নির্মাণের নতুন কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য ভবন নির্মাণ করতে কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়নি। পূর্তমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ভবনটি নির্মিত হয়। বিল্ডিং কোড মেনে সামনের দিকে রাস্তা থেকে ১০ ফুট ও পেছনের দিকে ১৭ ফুট জায়গা ছেড়ে মোট জমির ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি জানান, নির্বাচনের আগে দলের নেতাকর্মীদের জন্য নতুন কার্যালয় একটি উপহার। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের জন্য রাখা হয়েছে সুপরিসর কক্ষ। নবম তলায় দলের সভাপতির কক্ষের সঙ্গে রয়েছে বিশ্রামাগার ও নামাজের জায়গা। এ ছাড়া বিভিন্ন তলায় ডিজিটাল লাইব্রেরি, ভিআইপি লাউঞ্জ, সাংবাদিক লাউঞ্জ ও ক্যান্টিন থাকছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় দুটি বড় সুসজ্জিত সম্মেলনকক্ষ। নেতারা জানান, দুটি সম্মেলনকক্ষে প্রায় ৬শ’ মানুষের বসার ব্যবস্থা হবে। নেতারা জানান, সম্পূর্ণ দলীয় ফান্ড থেকে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ১৩ থেকে ১৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ভবনের সামনের দেয়ালের দুই পাশ কাঁচ দিয়ে ঘেরা, মাঝখানে সিরামিকের ইটের বন্ধন। সামনের দেয়াল জুড়ে দলের সাইনবোর্ডসহ একাত্তরের রণাঙ্গনের তেজোদীপ্ত স্লোগান- ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। সংবিধানের চার মূলনীতি খোদাই করে লেখা। বসানো হয়েছে স্টিলের নৌকা। ভবনের সামনে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবনটির প্রথম থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোর ৪ হাজার ১০০ বর্গফুট। চতুর্থ তলা থেকে ওপরের সব ৩ হাজার ১০০ বর্গফুটের। নতুন ভবন উদ্বোধনের পর আওয়ামী লীগের সব সাংগঠনিক কার্যক্রম চলবে নতুন এই কার্যালয় থেকে। এ প্রসঙ্গে দেশের তৃণমূল থেকে আগত নেতাদের চোখে-মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। তারা বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে আওয়ামী লীগের নতুন ভবন উদ্বোধন দলের নেতাকর্মীদের বাড়তি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। দীর্ঘদিন পরে নিজস্ব কার্যালয়ে যাচ্ছি। এই অফিস ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আমাদের পার্টির কার্যক্রম আরও বেগবান হবে। উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগের অফিস স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে আট থেকে নয় বার। পুরান ঢাকার কে এম দাশ লেনের রোজ গার্ডেনে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার পর পালাক্রমে নেতৃস্থানীয় নেতাদের বাসায় বসে দল পরিচালনার নীতি-কর্মসূচী গ্রহণ করা হতো, কোন অফিস ছিল না। ১৯৫৩ সাল থেকে ৯ কানকুন বাড়ি লেনে অস্থায়ী একটি অফিস ব্যবহার করা হতো। ১৯৫৬ সালে পুরান ঢাকার ৫৬ সিমসন রোডে দলের অফিস স্থাপন করা হয়। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার পর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৯১, নবাবপুর রোডে দলের অফিস নেন। এর কিছু দিন পর অস্থায়ীভাবে সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলের গলিতে কিছু দিন বসেন নেতারা। পরে পুরানা পল্টনে দুটি স্থানে দীর্ঘদিন দলের অফিস ছিল। ১৯৮১ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দলের দায়িত্ব নেয়ার পর ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঠিকানা হয়।