শনিবার ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২১ মে ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

স্টেশনের শিশুদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ॥ ইসমাইল। বয়স বেশি না। সাত থেকে আট বছর হবে। দেখতে বেশ ভালই। পরনে একটা হাফ হাতা শার্ট আর হাফ প্যান্ট। শার্ট আর প্যান্ট ময়লার কালো আবরনে পুরু হয়ে গেছে। গায়েও ময়লা স্পষ্ট।

প্রচন্ড গরমে ঘেমে আছে। সে হাঁটছে আর গায়ের ময়লা হাত দিয়ে ঘঁষে ঘঁষে তুলছে। তার সঙ্গে আরও দুটি শিশু রয়েছে। হাজার হাজার মানুষ যখন স্বজনদের সঙ্গে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন, স্টেশনে ট্রেন ছাড়া অপেক্ষায় ট্রেনে বা প্লাটফর্মে বসে আছেন, তখন তারা তিনজনে মিলে কমলাপুর রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে ঘুরে বেড়াচ্ছে শুধু পেটের দায়ে। কিছু আয়ের জন্য যা দিয়ে তারা একবেলা খাবে। শুধু ওরা তিনজন নয়। আবার ট্রেন আসার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক শিশুদের কেউ দৌড়ে গিয়ে ট্রেনে উঠছে, বোতল, কাগজ কুড়াচ্ছে, এখানে-ওখানে ঢুঁ মারছে, একটা পরিত্যক্ত বোতল সামনে পড়লে তা তুলে নিচ্ছে। কোন কোন বোতলে অবশিষ্ট পানি কিংবা জুস থাকলে তা খুলে খাচ্ছে। মা-বাবার সঙ্গে যারা ঈদে আনন্দ করতে নিজ বাড়িতে ফিরছে সেসব শিশুদের প্লাটফর্মে অপেক্ষা করতে দেখে তাদেরও আক্ষেপ হচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। কারণ তারা পথশিশু। কারও বাবা খাইয়ে দিচ্ছে, কারও মা খাইয়ে দিচ্ছে। আর এসব শিশুরা তাকিয়ে দেখছে।

ইসমাইলের সঙ্গে থাকা দুই জনের মধ্যে একজনের নাম ইমন আরেক জনের নাম রহিম। ইমনের বাড়ি যাওয়া হলেও ইসমাইলের কিন্তু বাড়ি যাওয়া হবে না। স্টেশনেই সে ঈদ করবে। কারণ বাড়িতে তার কেউই নেই। ইসমাইল জনকণ্ঠকে জানায়, তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। মা-বাবা আলাদা হয়ে গিয়ে দুইজনেই বিয়ে করে নিয়েছে। তার খবর কেউ রাখে না। সে দীর্ঘদিন ধরে ময়মনসিংহ স্টেশনে ছিল। মাসখানেক হলো কমলাপুর স্টেশনে এসেছে। এখানেই তার দিনরাত কাটে। স্টেশনে কি করে জানতে চাইলে ইসমাইল জানায়, সে অন্যের বোঝা বয়ে, অনেকের কাছে চেয়ে যা পায় তা দিয়েই তার পেট চলে। এ সময় ইমন বলে উঠল, ও মিথ্যা কথা বলেছে। ওরা দুইজন পকেট মারে। ছিনতাই করে। ইসমাইলও পাল্টা জবাব দিল ‘না’। তারা এসব করে না।

শুধু ইসমাইল নয়, তার মতো কয়েক শ’ শিশুর ঈদ কাটবে স্টেশনে। তারা চেয়ে থাকবে অন্যের দিকে। হয়ত জুটবে সেমাই, মিষ্টি মিঠাই বা ভাল কোন খাবার। হয়ত জুটবে না নতুন পোশাক। ময়লার আবরনে কালো হয়ে যাওয়া পোশাক পরেই ঈদ কাটবে তাদের। বৃহস্পতিবার দুপুরে স্টেশনের বাইরে এক কোনে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি কয়েকজন শিশুকে প্যাকেট দিচ্ছেন। কাছে গিয়ে কথা বলে জানা গেল কয়েকজন তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্টেশনের শিশুদের পোশাক আর খাবার দিচ্ছেন। সেচ্ছাসেবীদের একজন শর্বরী ফাহমিদা। তিনি বলেন, আমরা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য মূলত তাদের নতুন পোশাক দিচ্ছি। আমাদের সামর্থ অনুযায়ী এক শ’ শিশুকে আমরা জিন্সের প্যান্ট, টি শার্ট ও দুপুরে খাওয়ার জন্য বিরিয়ানি দিয়েছি। এ সময় তিনি এসব শিশুদের হাতে মেহেদি লাগিয়ে দেন। তারা এক শ’ শিশুকে দেয়ার জন্য আগে থেকেই টোকেন দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু টোকেন ছাড়া অনেকেই এসে পোশাকের জন্য ঘুরছে। তাদের তারা দিতে পারছে না। কারণ তাদের আর সামর্থ নেই।

এই সেচ্ছাসেবীর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন অনেক শিশুকেই এগিয়ে এসে টোকেনের জন্য বায়না ধরছিল। এদের মধ্যে একজন রাজন। তার বাড়ি হবিগঞ্জ। তার বাবার নাম শামিম আর মায়ের নাম শামিমা। তবে সে তার সৎ বাবার আশ্রয়ে ছোটবেলা কাটিয়েছে। ছোট বেলায় সৎ বাবার হাতে মার খেতে খেতে সে অধৈর্য হয়ে যায়।

শীর্ষ সংবাদ: