শনিবার ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২১ মে ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রাম বন্দরে টর্নেডোর আঘাত, ছিটকে গেছে ২ বিদেশী জাহাজ

  • ৫ ইয়ার্ডের অর্ধশতাধিক কন্টেনার লন্ডভন্ড

মোয়াজ্জেমুল হক/হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ পাঁচদিন ধরে চলমান বর্ষণের মাঝে বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরে আঘাত হেনেছে টর্নেডো। এটা এত শক্তিশালী ছিল যে, ৫টি জেটি ও সংলগ্ন ইয়ার্ডের অর্ধ শতাধিক কন্টেনার ছিটকে পড়ে যায়। এছাড়া জেটিতে নোঙ্গর করে থাকা কন্টেনার বোঝাই ২টি বিদেশী জাহাজ টর্নেডোর তান্ডবে কর্ণফুলী নদীর মাঝ বরাবর ছিটকে চলে যায়। অপরদিকে, বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে রাঙ্গামাটি হ্রদের পানি বিপদসীমার ওপর চলে যাওয়ায় কাপ্তাইয়ের স্পিলওয়ের ১৬টি গেট ৬ ইঞ্চি খুলে দেয়া হয়েছে, যা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক পানি নেমে যাচ্ছে। এতে গোটা রাঙ্গুনিয়া এলাকার লোকালয়ে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে, বৃহস্পতিবার অপেক্ষাকৃত বর্ষণের মাত্রা কমে এলেও দুর্ভোগ কমেনি। জোয়ারের সঙ্গে মহানগরীর বিভিন্ন্ এলাকায় পানি ঢুকছে। আবার ভাটার টানে কর্ণফুলী নদী দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে, কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং না হওয়ায় এবং চাক্তাই খাল ব্যাপকভাবে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা জনদুর্ভোগে একাকার হয়ে আছে। এদিকে, পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সূত্রে বলা হয়েছে, হালকা বা মাঝারি আকারের বর্ষণ আরও দুদিন হতে পারে।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে মূলত বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই আকস্মিকভাবে ভারি বর্ষণের ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগরীতে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে লঘুচাপটি কেটে গেলেও ঘন মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে আছে সার্বিক পরিবেশ। বৃহস্পতিবারও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। সমুদ্রবন্দরগুলোর জন্য বহাল রয়েছে ৩ নম্বর সতর্কতা

সঙ্কেত। সকালে মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী টর্নেডোর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর জেটির শেড। নোঙ্গর ছিঁড়ে বেশকিছু দূরে ছিটকে যায় এমভি ওইএল স্ট্রেটস ও এমভি ভেরি ট্রেডার্স নামের কন্টেনার বোঝাই বিদেশী দুই জাহাজ। টর্নেডোর আঘাতে ল-ভ- হয়ে যায় জেটিতে স্টেকিং করে রাখা অর্ধশতাধিক কন্টেনার। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১০ শ্রমিক।

এদিকে, প্রবল বর্ষণ এবং পাহাড়ী ঢলের কারণে নগরীর বাইরে ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, মীরসরাই, সীতাকু-, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। কৃষক ও মৎস্য চাষীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। সব মিলিয়ে ঈদের আগে মানুষের দুর্ভোগ যেন কাটছেই না।

বন্দরে সকাল পৌনে ৯টার দিকে আঘাত হানে টর্নেডোটি। কয়েক মিনিট স্থায়ী এই টর্নেডো বন্দরের ৯ থেকে ১৩ নম্বর জেটির ওপর দিয়ে বয়ে যায়। এর আঘাতে উড়ে যায় তিনটি জেটির টিনশেড। আকস্মিক এই টর্নেডোতে জেটিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক জানান, টর্নেডোর আঘাতে একটি জাহাজের দড়ি ছিঁড়ে যাওয়া ছাড়াও এমভি ভেরি ট্রেডার্স নামের আরও একটি জাহাজ জেটি থেকে সরে যায়। বন্দর কর্তৃপক্ষের টাগবোট দ্রুত জাহাজ দুটিকে টেনে এনে ফের নোঙ্গর করায়। টর্নোডোর ধাক্কায় এলোমেলো হওয়া কন্টেনারগুলোর বেশিরভাগই খালি ছিল বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি নয়। দ্রুততার সঙ্গে সবকিছু সামলে পুনরায় কাজ শুরু হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ৮ মিলিমিটার। এটি আগের চার দিনের তুলনায় খুবই কম। এর আগে বুধবার ১৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার, মঙ্গলবার ৯৪ দশমিক ২ মিলিমিটার এবং সোমবার ২২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। লঘুচাপ কেটে গেলেও সমুদ্রসীমা এবং উপকূলে সঞ্চালনশীল মেঘমালা এবং বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্য রয়েছে। বৃহস্পতিবার বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯৫ শতাংশ। মৌসুমিবায়ুর কারণে আরও বৃষ্টি এবং ঝড় হাওয়ার আশঙ্কা থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। মাছ ধরার নৌকা এবং ছোট ছোট জলযানকে উপকূলের কাছাকাছি সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামে বৃহস্পতিবার বৃষ্টি কমলেও এখন নিচু এলাকা ভয়াবহভাবে প্লাবিত হচ্ছে পাহাড়ী ঢলে। ফটিকছড়ি, রাউজান, মীরসরাই, সীতাকু-ের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি ভয়াবহ। গ্রামীণ সড়ক ও জনপথ তলিয়ে গেছে পানিতে। ক্ষেতের ফসল চারদিনেরও বেশি সময় ধরে পানির নিচে। পুকুরের পাড় ডুবে ভেসে গেছে মাছ। কৃষক এবং মাছ চাষীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আগামী আরও অন্তত দুদিন এমন অবস্থা থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। তবে বৃষ্টির প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে আসবে।

ঈদের আগে সৃষ্ট এই দুর্যোগে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন বাড়িমুখী যাত্রীরা। বৃহস্পতিবার ছিল সর্বশেষ কর্ম দিবস। অনেকেই একটু আগেভাগে বেরিয়ে কেনাকাটার কাজও সেরেছেন। কিন্তু সড়ক নিমজ্জিত এবং যানবাহন প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল থাকায় ঈদ বাজারে দুর্ভোগ যেন সীমা ছাড়িয়ে যায়। বৃষ্টির কারণে যানবাহন কম। কিন্তু ঈদের কারণে যাত্রী বেশি। প্রয়োজনের তুলনায় সার্ভিস না থাকায় যানবাহনের ভাড়াও হয়ে যায় দ্বিগুণ এমনকি এর চেয়েও বেশি। বৃষ্টিতে সড়কের দুরবস্থার কারণে যানবাহনগুলো শহরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে যাত্রীদের পোহাতে হয় বাড়তি কষ্ট।

এদিকে রাঙ্গুনিয়া থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে রাঙ্গামাটি হ্রদের পানি বিপদসীমার ওপরে চলে যাওয়ায় বুধবার রাত থেকে কাপ্তাই ড্যামের স্পিলওয়ের ১৬টি গেট ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেয়া হয়েছে। এতে প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক পানি নেমে যাচ্ছে। এ নেমে যাওয়া পানি ঢুকছে রাঙ্গুনিয়াসহ সংলগ্ন লোকালয়ে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উত্তর রাঙ্গুনিয়ার পারুয়া, দক্ষিণ রাজা নগর, কদমতলী, মরিয়মনগরসহ বিভিন্ন লোকালয়। রাঙ্গামাটি হ্রদের পানি রাঙ্গুনিয়া হয়ে কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। এতে কর্ণফুলী নদীর পানির উচ্চতাও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইতোমধ্যে কালুরঘাট এলাকায় বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। লোকালয়ের বিভিন্ন ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করে। তবে মহানগরীতে বৃহস্পতিবার ভারি বর্ষণ না হওয়ায় ইতোপূর্বেকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ঈদের প্রাক্কালে মানুষের বাড়ি ফেরা ও কেনাকাটায় এই বর্ষণ সৃষ্টি করেছে ব্যাপক দুর্ভোগ।

নিজস্ব সংবাদদাতা বাঁশখালী জানান, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়নের সোনারখিল গ্রামে টর্নেডোর আঘাতে ২৫ বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ জুন) সকালে ৫-১০ মিনিটের টর্নেডোর ছোবলে পুরো এলাকা লন্ডভ- হয়ে যায়। এ সময় বাড়িঘর ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। তাছাড়া গাছপালা উপচে পড়ে বিদ্যুত সঞ্চালন লাইন বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে পুকুরিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে পাহাড় ধসের ঘটনাও ঘটেছে। এ সময় কেউ হতাহত না হলেও ৪ বসতবাড়ি মাটি চাপা পড়ে। এদিকে টানা ৫ দিনের প্রবল বর্ষণে উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার বাসিন্দার মাঝে চরম দুর্ভোগ নেমে এলেও ঈদকে সামনে রেখে বেঁচে থাকার তাগিদে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। সবমিলিয়ে পুরো উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে অন্তত সহ¯্রাধিক পরিবার। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছর পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলেও বাঁশখালীর একদিকে গহিন অরণ্য থাকায় পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ তেমন পাহাড় ধসের ভয়াবহতা সম্পর্কে এখনও সচেনতা লাভ করেনি। তাই এই মৌসুমে বাঁশখালীর পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড় ধসের আশঙ্কা প্রকাশ করছে স্থানীয় অভিজ্ঞ মহল। তাছাড়া অচিরেই পাহাড়ে বসবাসরত মানুষকে সরিয়ে আনা না হলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

শীর্ষ সংবাদ: