ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

মোঃ রুহুল আমীন

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

প্রকাশিত: ০৬:৪১, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

তিন দিক দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য বেষ্টিত ফেনী জেলাকে বাংলাদেশের নাভি বলা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এ ফেনী জেলা ২নং সেক্টরের অধীন বিলোনিয়া সেক্টর নামে পরিচিত ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতায় ফেনী জেলার অবদান অপরিসীম। পুরো বাংলাদেশ যখন ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে পাক-হানাদার বাহিনী মুক্ত হয় সেখানে ফেনী জেলা তার ১০ দিন পূর্বে অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাক হায়েনাদের পরাজিত করে অত্রাঞ্চল স্বাধীন করে। আজকের আলোচনায় মূলত ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে অবতারণা করতে চাই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত আগরতলা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী। আগরতলা হতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালুকরণের মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্যের বিকাশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিলোনিয়া স্থলবন্দরে গতিশিলতা আনায়নসহ বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে। ত্রিপুরা উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্য। এই রাজ্যের আয়তন ১০.৪৯১.৬৯ বর্গ কিলোমিটার এবং এটি ভারতের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য। ত্রিপুরা উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কর্তৃক বেষ্টিত। রাজ্যের পূর্বভাগে ভারতের অপর দুই রাজ্য অসম ও মিজোরাম অবস্থিত। ত্রিপুরা একটি ভূ-বেষ্টিত পার্বত্য রাজ্য এবং সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১৫-৯৪০ মিটার। ত্রিপুরা অসমের করিমগঞ্জ জেলা ও মিজোরামের আইজল জেলার দ্বারা ভারতের মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত। ত্রিপুরা ৮টি জেলা ও ২৩টি মহাকুমায় বিভক্ত। ত্রিপুরা রাজ্যের অন্যতম প্রধান শহরগুলো হলো বিশালগড়, যোগেন্দ্র নগর, ধর্ম নগর, সোনামুড়া, অমরপুর, প্রতাপগড়, উদয়পুর, কৈলাস শহর, তেলিয়ামু, ইন্দ্রনগর, খোয়াই ও বেলোনিয়া। তন্মধ্যে আগরতলা ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী। ত্রিপুরা রাজ্য হলো অসমের পরেই উত্তর পূর্ব ভারতের দ্বিতীয় জনবহুল রাজ্য। এ বিশাল জনসংখ্যার ভ্রমণপিপাসু পর্যটকগণ ব্যবসা বাণিজ্যসহ সমুদ্র দর্শনের নিমিত্তে ভারতের মূল ভূখ-ের সঙ্গে অসমের মধ্য দিয়ে ৪৪তম জাতীয় সড়ক এবং লুমডিং ও শিলচর পর্যন্ত বিস্তৃত ব্রডগেজ রেলওয়ে লাইন দ্বারা চলা চল করে থাকে। এছাড়া আগরতলা বিমানবন্দর থেকে কলকাতা, গুয়াহাটি, ব্যাঙ্গালুরু, চেন্নাই, দিল্লী ও শিলচরের উদ্দেশে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। সেক্ষেত্রে এতদ্দাঞ্চলের মানুষের ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা, ভ্রমণপিপাসা নিবারণ ও সমুদ্র দর্শন ব্যাপকভাবে সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুলও বটে। যা অপরদিকে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা হতে বাংলাদেশের বিলোনিয়া স্থলবন্দর পর্যন্ত দুরত্ব মাত্র ৯০ কিলোমিটার। পরশুরামের বিলোনিয়া হতে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম এর দুরত্ব প্রায় (৮৭+৩০) = ১১৭ কিমি.। সর্বসাকুল্যে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা হতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের দুরত্ব মাত্র (৯০+১১৭) = ২০৭ কিমি. যা বাসযোগে ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামাজিক, বাজনৈতিক এবং পর্যটনের বিকাশ তথা বিশ্বায়নের যুগে ত্রিপুরার আগরতলা হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালুকরণের মাধ্যমে উভয় দেশের জনগণের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের লাভের পাল্লাটাভারী বেশি। কি কি লাভ বা সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে এ সার্ভিস চালু হলে। ক) বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা অত্রাঞ্চলের উন্নয়নে ত্রিপুরার আগরতলা হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালু করলে বাংলাদেশের এউচ খাতে বিশাল ভূমিকা রাখবে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দর হতে ৬৭ কিমি. অদূরে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজী অঞ্চলে ৭ হাজার ৬১৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সেখানে থাকবে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনের ১২২২টি কারখানার প্লট। কর্মসংস্থান হবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের। এই বিশেষ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র, ইকোপার্ক, সুপ্রশস্ত রাস্তা। মিরসরাই-সোনাগাজী বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য মাত্র ৩০ কিমি. অদূরে বিলোনিয়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহ যেমন, ত্রিপুরা, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরামসহ অসমের বাজারে পৌঁছতে পারলে বাংলাদেশে এউচ নিঃসন্দেহে প্রত্যাশার মাত্রা ছাড়িয়ে ২০৪১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে। খ) ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিপুরা, অসম, মিজোরামসহ অন্যান্য অঞ্চলে ২০০৯ সালে বিলোনিয়া স্থলবন্দর দিয়ে সিমেন্ট, ইট, পাথর ও সুটকি রফতানির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বর্তমানে নতুন করে ঢেউটিন, খৈল, স্টিলবার, মশারি এবং চুনের রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১৬-১৭ অর্থবছরে বিলোনিয়া স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে প্রায় ৫২,১৩,৪৫,৭৫৮,৬৬১ টাকা যেখানে বিগত ১৫-১৬ অর্থবছরের আয়ের পরিমাণ ছিল ৪০,৩৪,১২০৬৮.০০ টাকা। অর্থাৎ ক্রমে এ স্থলবন্দরের ভূমিকা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্ববহন করছে। সেক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং উভয় দেশের সরকারের সম্পর্ক আরও জোরদারকরণ আবশ্যক। অন্যদিকে বিলোনিয়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে গবাদিপশু, মাছের পোনা, তাজা ফল-মূল, গাছ-গাছালির বীজ, কয়লা, গম চুনা, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ ও আদা আমদানির অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও অদ্যবধি বাংলাদেশ কোন ধরনের পণ্য আমদানি করতে পারেনি। মূলত একমুখী রফতানি বাণিজ্য দিয়ে চলছে এ স্থলবন্দর। গ) ২০০৯ সালের ৪ আক্টোবর বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে আমদানি-রফতানি সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিলোনিয়া স্থলবন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, লোকবল, গুদাম ও মালামাল পরিমাপের যন্ত্র সঙ্কটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম তেমন আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি। উভয় দেশের জোরালো ভূমিকার অভাবে বিলোনীয়া মূলবন্দর দিয়ে শুধু রফতানি কার্যক্রম চলছে। ব্যাপক পণ্য আমদানির সুযোগ ও চাহিদা থাকলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে ভারত থেকে কোন ধরনের পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। বন্দর চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০-৯০ লাখ টাকার মতো ভ্রমণ কর আদায় হয়েছে। সেক্ষেত্রে আগরতলা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালু করলে অত্র বিলোনিয়া স্থলবন্দরে গতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি ভ্রমণ কর আদায়ের অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে। ঘ) ত্রিপুরার আগরতলা হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাস সার্ভিস নিয়মিত চালু থাকলে বাংলাদেশের পর্যটন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, ইনানী সী বীচ, সেন্টমার্টিন, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যটন শিল্পের বিকাশে ভারতের পৃর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহের পর্যটকদের আকর্ষণ করার অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। ভারতীয় পর্যটকদের এ দেশের আগমনের ফলে বাংলাদেশের উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধিপাবে যা পণ্যের ব্রান্ডিং হিসেবে কাজ করবে এবং পরবর্তীতে ভারতীয় পর্যটকদের এ দেশের পণ্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করবে। সর্বোপরি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চৌত্তখোলায় স্থাপিত বাংলাদেশের স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য, মেলাঘর, দেরাদুন শরণার্থী শিবিরসহ বঙ্গবন্ধুর বিশেষ স্মৃতি বিজড়িত আগরতলা (যে স্থানের নামে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সৃষ্টি করা হয়েছিল) ভ্রমণের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে ভারত সরকার এ উদ্যোগ সমর্থন করে বিশেষভাবে উপকার হওয়ার সুযোগ রয়েছে যেমন- ক) খুব অল্প সময়ে এবং অল্প খরচে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ভ্রমণের সুযোগ; খ) খুব অল্প খরচে আন্তর্জাতিক মানের বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য আমদানির সুযোগ; গ) ত্রিপুরা রাজ্যের বাসিন্দারা যে পণ্য ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলো হতে আনয়ন করতে অধিক খরচ ও সময় ব্যয় করতে হয় সেখানে খুব অল্প খরচের মাধ্যমে বাংলাদেশে থেকে এ সমম্ভ পণ্য আমদানি করতে পারবে। এছাড়া ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহের বাসিন্দাদের ভারতের মূল ভূখ-ের সঙ্গে যোগাযোগ করত বিভিন্ন পণ্যের ব্যবহার ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ। অধিকন্তু ভারত সরকার তাদের বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্য কলকাতার হলদিয়া বন্দরের মাধ্যমে আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিলোনিয়া স্থলবন্দর ব্যবহার করত ৬৭ কিমি. অদূরে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারে সুযোগ পেলে উভয় দেশ বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে তা নিঃসন্দোহে বলা যায়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সমুদ্রনগরী কক্সবাজার, ইনানী সী বীচসহ সামুদ্রিক দ্বীপ সেন্টমার্টিন ভ্রমণে অবারিত সুযোগ পাবে ভারতের পর্যটকরা যা তাদের সময়, অর্থ এবং কষ্ট লাঘবে বিরাট ভূমিকা রাখবে। এমতাবস্থায় উভয় দেশের সরকারের উচিত উভয় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এবং পর্যটনের বিকাশের নিমিত্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা হতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাস সার্ভিস চালু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।