ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

মনের ওপর রঙের প্রভাব -শারমিন মুনা

প্রকাশিত: ০৫:৫৫, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

মনের ওপর রঙের প্রভাব     -শারমিন মুনা

পাঠক, কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, ফাস্ট ফুডের দোকানগুলোর বেশিরভাগেরই লোগো কেন লাল বা কমলা রঙের হয়? কেন সুবিশাল নীল আকাশের দিকে তাকালেই মনটা শান্ত, স্থির হয়ে যায়? কেন আমরা ব্যস্ত শহুরে জীবনের ঝুট ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে ছুটে যাই সবুজ প্রকৃতির কোলে? হয়তো না। আসলে চারদিকে হরেক রকমের রং দেখে আমরা এতটাই অভ্যস্ত যে, আমাদের কার্যকলাপ ও আচরণের ওপর একেক রঙের যে একেক ধরনের প্রভাব আছে, তা আর সচেতনভাবে লক্ষ্য করা হয়ে ওঠে না। লাল লাল রং সাধারণত প্রণয়, ভালবাসা, স্নেহময়তা, শক্তি, উত্তেজনা, সতেজতা এবং তীব্র আবেগ নির্দেশ করে। এটি শরীরের এ্যাড্রেনাল গ্রন্থি এবং স্নায়ুকোষকে উদ্দীপ্ত করে। হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি করে। শরীরের ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্সকে সক্রিয় করে তুলতে পারে। এ রংটি পুরুষত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। লাল রঙের শক্তিদায়ক বৈশিষ্ট্যের কারণে হাঁটা বা ব্যায়ামের সময়ে পরার জন্য এ রং উপযোগী। কারও মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যেও লাল একটি আদর্শ রং। গবেষণায় দেখা গেছে, লাল রঙের পোশাক পরিহিত নারীদের প্রতি পুরুষরা বেশি অনুরক্ত অনুভব করেন। তবে এই রঙের তীব্রতার কারণে আপোস, মীমাংসা বা মতবিরোধ জাতীয় আলোচনার সময় লাল রং এড়িয়ে যেতে পারলেই ভাল। এই রঙের পোশাকে শারীরিক গড়ন ভারি দেখাতে পারে। নীল নীল রং প্রশান্তি, শীতলতা, বিশ্বস্ততা, প্রজ্ঞা, সততা, আবেগশূন্যতা, বিরাগ, কেন্দ্রীভূত আচরণ প্রভৃতিকে নির্দেশ করে। নীল রং মস্তিষ্কে এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে যা মস্তিষ্ককে শান্ত রাখে। রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দনের হার কমাতে সাহায্য করে এটি। হালকা নীল রং যেখানে আকাশের মতো বিশালতা ও প্রফুল্লতা প্রকাশ করে, সেখানে গাঢ় নীল আবার বিষণœতা বা গভীর বিষাদের অনুভূতি জাগায়। নীল রং বিশ্বস্ততার পরিচয় বহন করে। তাই ফ্যাশন ডিজাইনাররা চাকরিপ্রার্থীদের ইন্টারভিউতে নীল পোশাক পরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। হলুদ এটি খুশি, আনন্দ, উচ্ছ্বলতা, স্নেহময়তা, আশাবাদীতা, তীব্র আবেগ, ক্ষুধা, হতাশা এবং রাগ প্রকাশ করে। হলুদ রং মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নিঃসরণের হার বৃদ্ধি করে, যা মনে সুখের অনুভূতি তৈরি করে। বলা হয়ে থাকে, এই কারণেই ইমোজি হলুদ রঙের হয়ে থাকে। উজ্জ্বল সূর্যালোকের মতই হলুদ রং আমাদেরকে উজ্জীবিত করে তোলে, আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, আশাবাদী মনোভাবের সৃষ্টি করে। হলুদ রঙের ঘরে উষ্ণ বোধ হয়, তাই বাড়ির উত্তরমুখী ঘরে এ রংটি ব্যবহার করা যেতে পারে। এ রং ক্ষুধা ও বিপাকক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি করে, সুতরাং খাওয়ার ঘরে প্রয়োগের জন্যে হলুদ রং বেশ উপযোগী। যেহেতু এ রংটি কর্মচাঞ্চল্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেহেতু যেসব ঘরে বিশ্রাম নেওয়া হয় (যেমন- শোবার ঘর), সেসব ঘরে এ রং মানানসই নয়। গোলাপী এই রংটি মূলত প্রণয়, ভালবাসা, ন¤্রতা, প্রশান্তি, নির্দোষিতা, সহমর্মিতা, সংবেদনশীলতার সঙ্গে জড়িত। গোলাপি রং মানব প্রজাতির টিকে থাকা ও প্রতিপালনের প্রতিনিধিত্ব করে। উদ্বেগ ও রাগ কমিয়ে শরীরে প্রশান্তির অনুভূতি ছড়িয়ে দেয় এই রং। এমনকি আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বায়োসোশ্যাল এ্যান্ড মেডিক্যাল রিসার্চের ড. এ্যালেকজান্ডার শাউস জানান যে, ‘গোলাপি রঙের উপস্থিতিতে কোন ব্যক্তি চাইলেও রাগান্বিত বা আগ্রাসী আচরণ করতে পারেন না। তার হৃদপেশীগুলো তখন দ্রুত স্পন্দিত হতে পারে না।’ কমলা এটি আনন্দ, উত্তেজনা, উদ্দীপনা, উদ্ভাবনক্ষমতা, সক্রিয়তা, সহিষ্ণুতা, স্নেহময়তা, সম্পদ, উন্নতি ও পরিবর্তনের পরিচয় বহন করে। কমলা রংটিতে লালের তীব্র আবেগ আর হলুদের আনন্দের সম্মিলন ঘটেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি করে, মনোযোগ বাড়ায় এবং স্নায়ুগুলোকে চাঙ্গা করে তোলে। এটি মানুষের আগ্রহ ও সৃজনশীলতাকে উদ্দীপ্ত করে। সবুজ এই রং প্রকৃতি, শান্তি, শীতলতা, উন্নতি, স্বাস্থ্য, উর্বরতা, অর্থ, অসুস্থতা ও ঈর্ষার প্রতীক। সবুজ রং চোখের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক ও সহজ, কারণ এ রংটি দেখার জন্য কোন চোখে বাড়তি কোন চাপ পড়ে না। তাছাড়া গবেষকগণ প্রমাণ করেছেন যে, সবুজ রং দৃষ্টিশক্তিরও উন্নতি ঘটায়। এটি ক্লান্তি ও মানসিক চাপ দূর করতে সাহায্য করে। সুতরাং কর্মস্থলে যাদেরকে লম্বা সময় ধরে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে কাজ করতে হয়, তারা সবুজ রঙের ডেস্কটপ ব্যাকগ্রাউন্ড রাখতে পারেন। এতে চোখের ওপর চাপ কম পড়বে এবং চোখের আরাম হবে। সাদা সাদা রং শুদ্ধতা, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, সরলতা, নির্দোষিতা, নিরপেক্ষতা, অজ্ঞতা, শূন্যতা ও দূরত্বের প্রতীক। কোন কোন সংস্কৃতিতে এটিকে শোকের প্রতীক বলেও ধরা হয়। শিশুদের ব্যবহার্য অধিকাংশ সামগ্রীতে তাদের সরলতার প্রতীক হিসেবে সাদা রঙের উপস্থিতি থাকে। আবার চিকিৎসকদের সাদা রং ব্যবহার তাদের পরিচ্ছন্নতা নির্দেশ করে। উপলক্ষ বুঝে সঠিক কাপড় ও নকশা নির্বাচন করতে পারলে সাদা রং অফিস থেকে শুরু করে বিয়ের অনুষ্ঠান, সবখানেই পরার উপযোগী হতে পারে। কালো এ রং কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, শক্তি, বুদ্ধি, নিরাপত্তা এবং কোন কোন সংস্কৃতিতে অমঙ্গল, দুর্দশা, মৃত্যু বা শোকের চিহ্ন বহন করে। কালো রং স্বচ্ছতা ও অকপটতার প্রতীক। এটি প্রতিরক্ষা বা প্রতিবন্ধকতার অনুভূতি তৈরি করে। আলোর সবটুকু শোষণ করে নেয় বলে এই রং ক্ষেত্রবিশেষে ভয় ও প্রচ্ছন্নতার ভাব জাগিয়ে তোলে। কালো রং প্রায়শই আগ্রাসী মনোভাব তৈরি করতে পারে। গবেষকরা ৫২,০০০ এরও বেশি জাতীয় হকি লীগ গেমসের পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে দেখেছেন যে, যেসব দল তাদের আগ্রাসী ব্যবহারের কারণে দণ্ডিত হয়েছে, তারা অধিকাংশই কাল জার্সি পরা দল ছিল। পরবর্তীতে জার্সির রং পরিবর্তনের পর তাদের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।