ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

রিফাত কান্তি সেন

গ্রাম ছাড়িয়ে শহরে...

প্রকাশিত: ০৫:২৮, ২৩ নভেম্বর ২০১৭

গ্রাম ছাড়িয়ে শহরে...

আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/হয়ত মানুষ নয় হয়ত শঙ্খচিল শালিখের বেশে;/হয়ত ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে..কবি জীবনানন্দ দাশ- তাঁর কবিতার মাধ্যমে বাংলার প্রকৃতির রূপ তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ সবুজ-শ্যামলে পরিপূর্ণ এক অপরূপ দেশ। এ দেশের প্রতিটি ধুলোকণায় মিশে আছে ভালবাসার স্পন্দন। বাংলার কৃষকের মুখে হাসি ফুটে গোলা ভরা ধান দেখে। হেমন্তে ফসলের মাঠ হলদে রঙ ধারণ করে। চারদিকে হলুদ আর সবুজের সমারহে প্রকৃতি নব যৌবন লাভ করে। তবে আধুনিক যুগে মানুষ যত উন্নত হচ্ছে, যত আধুনিক হচ্ছে, ততই নিষ্ঠুর হচ্ছে। ফসলি জমিতে ঘর নির্মাণ করছে, করছে কৃত্রিম মৎস্য খামারও। আবাদি জমির মাটি কেটে সেখানে তৈরি করছে মৎস্য চাষ প্রকল্প। আবার কেউ কেউ উর্বর জমিগুলোতে রাসায়নিক সার ব্যাপক প্রয়োগের ফলে জমির উর্বরতা শক্তিকে বিনষ্ট করছে। এখন আর আগের মতো ফসলি জমি চোখে পড়ে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দিন-দিনই মানুষের বাসস্থানের চাহিদা বাড়ছে। আবার আধুনিকতাকে পুঁজি করে অনেকেই এখন কৃষিকাজ থেকে দূরে আছেন। এক সময় ধান কাটার মৌসুম এলেই বাঙালীর ঘরে ঘরে ধান তোলার উৎসব কাজ করতো। এই তো ক’বছর আগেও উৎসবমুখর ছিল কৃষকের বাড়ি। আধুনিকতা আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নেয়া শুরু করেছে। কৈশরে আমাদের নিজ গ্রামের বাড়িতে প্রচুর ধান দেখেছি আমরা। আর এখন কেনা চাল কিনে খেতে হচ্ছে। আবাদি জমি ও নেই এখন আর। যেখানে প্রচুর ফসল হতো এখন সেখানেই ঘর তুলে আমরা বসবাস করছি। আমার আব্বা এক সময় ধানের আবাদ করতেন। নিজেদের জমি না থাকলে ও ‘বরগা চাষ’ মানে অর্ধেক ধান এর বিনিময় আমাদের ধান চাষ করা হতো। এছাড়া আমার নানাদের প্রচুর ফসলি জমি ছিল, যেখানে তাঁরা ধান আবাদ করত। নতুন ফসল ঘরে তোলার কী যে আনন্দ- তখন বোঝা যেত। এখন তো সেগুলো প্রায় নেই বললেই চলে। পিঠা-পুলির উৎসব হতো নবান্ন এলে। কৃষাণী বধূর অজ¯্র বায়না থাকত তাঁর কৃষক বরের কাছে। নোলক, চুড়িসহ কত যে আবদার। সে ফসল দিয়ে চলত জীবিকা নির্বাহ। এছাড়া ফসল বাজারে বিক্রিতে যে অর্থ পাওয়া যেত তা দিয়ে খুব আয়েশী জীবন অতিবায়িত হতো। অভাব ছিল না সুখের। অল্পতে সুখ খুঁজে পাওয়া যেত। নবান্ন উৎসব বাঙালীর একটা প্রাণের উৎসব। আবহমান কাল থেকে এ উৎসবটি বাঙালী সংস্কৃতিতে দৃশ্যমান হয়ে আসছে। এখনও নবান্ন উৎসব হয় শহরে। গ্রামের অনেকে বলতেই পারবে না যে আজ নবান্ন উৎসব। অবশ্য এজন্য আমরা নিজেরাও দায়ী। আজ যদি আমাকে কেউ বলে, বাংলা আজ কত তারিখ? আমি হা করে তাকিয়ে থাকব। কেননা বাঙালী হলেও বাংলা তারিখটা জানা নেই, ভিনদেশীটা ঠিকই মুখস্থ করে আছি। আমি দেখেছি এখন তরুণপ্রজন্ম নবান্ন উৎসব কী সেটা বাস্তবে জানে না। শুধু বই পুস্তকে পড়েছে যে নবান্ন উৎসবে কৃষকের ঘরে আনন্দের জোঁয়ার বয়ে যায়। কৃষাণী বধূ পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত হোক। আসলে চাক্ষুস তাঁরা এটা আজও দেখেনি। আর কবে থেকে নবান্ন উৎসব সেটা জানা থাকলে ও এর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। অবশ্য ভিনদেশী সংস্কৃতিরও একটি প্রভাব রয়েছে এতে। খুব খায়েশ আর আমেজে পালন করি বিদেশী সংস্কৃতি। নানা রকম ভিনদেশী চ্যানেল নিয়ে মাতোয়ারা। সংস্কৃতির এসব দিবসগুলো মিডিয়াতে যেমন ঘটা করে প্রচার করা উচিত; তেমনি যে যার অবস্থান থেকে সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাও উচিত। নবান্নসহ প্রতিটি উৎসবে বাঙালীর সে চিরচেনা রূপ ফিরিয়ে আনা হোক, এটা সময়ের দাবি। ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর থেকে