ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

মাদারীপুরে নদী ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে ঘর-বাড়ি

প্রকাশিত: ২৩:৫৫, ২৬ আগস্ট ২০১৭

মাদারীপুরে নদী ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে ঘর-বাড়ি

নিজস্ব সংবাদদাতা, মাদারীপুর ॥ নদ-নদীর পানি হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁর ভাঙ্গন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদী ভাঙ্গনের ফলে শিবচরের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল বিধ্বস্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। নদ-নদীর পানি কমতে থাকায় চরজানাজাত ও কাঠালবাড়িতে আরো শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে শিবচর উপজেলার ৮ ইউনিয়নে আড়িয়ালখাঁ ও পদ্মানদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে ৪ শতাধিক ঘর-বাড়ি, ফসলী জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা। ভাঙ্গন ঝূঁকিতে রয়েছে ইলিয়াছ আহম্মেদ চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়সহ আরো ৪ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, কমিউনিটি ক্লিনিক, আশ্রায়ন প্রকল্প, হাট-বাজারসহ শত শত বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্টসহ বহু স্থাপনা। এদিকে শিবচর উপজেলা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে নদী ভাঙ্গন ও বন্যা কবলিতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। সরকারীভাবেও ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ভাঙ্গন কবলিতদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সুত্রে জানা গেছে, গত ২ দিনে পদ্মার ভাঙ্গনে চরজানাজাত ইউনিয়নের ৩, ৫, ৬ ও ৮ নং ওয়ার্ড ও কাঠালবাড়ির শতাধিক ঘর বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এনিয়ে গত ৩ দিনে ভাঙ্গনে এ দুই ইউনিয়নেই ২ শতাধিক ঘর বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। এ ছাড়া গত ২ সপ্তাহে একটি মাদ্রাসা, একটি মসজিদ, একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ ৫শতাধিক ঘর-বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরো বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙ্গনের মুখে থাকায় শিক্ষার্থীদের লেখা-পড়া চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যেকোন মুহুর্তে ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কায় স্কুলগুলোর ঘরের টিন, বেঞ্চসহ মালামাল সরিয়ে নেয়া শুরু হয়েছে। নদী ভাঙ্গন কবলিত মানুষ ঘর-বাড়ি হারিয়ে পরিবার নিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়াচ্ছেন। ভাঙ্গন কবলিত এলাকার মানুষ এখন অনাহারে-অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সরকারী কোন সাহায্য-সহযোগিতা এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। দূর থেকে কাউকে আসতে দেখলেই ভাঙ্গন কবলিতরা ভাবে এ বুঝি কেউ তাদের জন্য সাহায্য নিয়ে আসছে। কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের কাউলিপাড়া গ্রামের নদীগর্ভে বিলীন হওয়া ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের আনোয়ার চৌকিদার বলেন, ‘সরকার আমাদের এ পর্যন্ত কোন সাহায্যই দেয়নি। আমার সাজানো ভিটে বাড়ি ও ৬ বিঘা ফসলী জমি আড়িয়াল খাঁ গ্রাস করেছে। আমার পরিবার পরিজন এখন সর্বশান্ত। সরকারী সাহায্য সহযোগিতা তো দূরের কথা, এ পর্যন্ত কোন জনপ্রতিনিধি আমাদের দেখতেও আসেনি।’ শুধু আনোয়ার নয়, এ রকম শত শত ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার সরকারী সাহায্য সহানুভূতির প্রতিক্ষায় বসে আছে। কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড মেম্বার মাহবুব ফকির বলেন, ‘পদ্মার ভাঙ্গনে ১নং ওয়ার্ড বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্থরা উঁচুস্থানে আশ্রয় নিয়েছে। কাউলিপাড়া দারুল উলুম কওমী মাদ্রাসা ও মাদানী কমপ্লেক্স-এর অধ্যক্ষ আব্দুর রকিব বলেন, ‘পদ্মা নদী এখন মাদ্রাসাটির খুব নিকটে এসে পড়েছে। যে কোন সময় মাদ্রাসাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যেই মহিলা মাদ্রাসাটি ভেঙ্গে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কওমী মাদ্রাসাটিও ভেঙ্গে অন্যত্র সরানো হবে। এতে শিক্ষার্থীদের লেখা-পড়া চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’ এদিকে শুক্রবার শিবচর উপজেলা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে নদী ভাঙ্গন ও বন্যা কবলিতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। এদিন আড়িয়াল খাঁ নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ দক্ষিণ বহেরাতলা ও নিলখী ইউনিয়নের শতাধিক পরিবারের মাঝে চাউল, আলু, লবন, তেল ও ডাল বিতরণ করা হয়। উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সামসুদ্দিন খান, সহসভাপতি সাবেক পৌর মেয়র আঃ লতিফ মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক ডাঃ সেলিম, নিলখী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ওয়াসিম মাদবর, আওয়ামীলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর ভূইয়া, সাধারণ সম্পাদক বাচ্চু মাস্টার, পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সৌরভ রায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া পদ্মা নদী বেষ্ঠিত চরাঞ্চল চরজানাজাত, কাঁঠালবাড়ি, বন্দরখোলা, মাদবরচর ও আড়িয়াল খা নদী বেষ্ঠিত সন্ন্যাসীরচর, দক্ষিণ বহেরাতলা, নিলখী ও শিরুয়াইল ইউনিয়নে নদী ভাঙ্গন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে প্রতিদিনই সরকারি ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আহমেদ বলেন, ‘গত ২-৩ দিনে শিবচরের ২ ইউনিয়নে প্রচন্ড ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, কমিউনিটি ক্লিনিক, আশ্রায়ন প্রকল্প, হাট-বাজার ভাঙ্গন ঝূঁকিতে রয়েছে। সরকারীভাবে ও উপজেলা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ভাঙ্গন কবলিতদের পুনর্বাসনে ব্যবস্থা নেয়া হবে। শনিবার সকালে বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণকালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ পার্লামেন্টারী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও মাদারীপুর-১ শিবচর আসনের সংসদ সদস্য নূর-ই-আলম চৌধুরী বলেন, ‘শিবচরে নদী ভাঙ্গন ও বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতে লেখাপড়ায় ব্যাঘাত না ঘটে এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের জন্য কিছু যায়গা বরাদ্দ রেখেছি। পদ্মার ভাঙ্গনে বিদ্যালয়টি ভেঙ্গে গেলে সেখানে প্রতিস্থাপন করে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চালিয়ে রাখা হবে।’