ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

জলি রহমান

ঘুরে দাঁড়ানো এক নারী

প্রকাশিত: ০৬:৩২, ২৬ মে ২০১৭

ঘুরে দাঁড়ানো এক নারী

নারী শব্দটি যতটা গভীর ততটাই অবহেলিত। কখনও বাবার পরিচয় কখনও স্বামীর পরিচয় নিয়ে বাঁচতে হয়। নিজের পরিচয় গড়তে করতে হয় লড়াই। তেমন এক লড়াকু নারী নাহিদা শারমীন (ছদ্ম নাম)। বরিশালের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বেড়ে ওঠা শারমীন আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। যার পরিচয় দিতে পরিবারের লোকজন গর্ব বোধ করে। এমন এক পরিবারে সে বেড়ে উঠেছে যেখানে বাল্যবিয়ে প্রচলিত নিয়ম। তাই সপ্তম শ্রেণীতে ওঠা মাত্রই বাজারের পণ্যের মতো বিভিন্ন ছেলেপক্ষকে দেখানো শুরু হয়। পুতুল খেলার বয়সে নিজেই পুতুল হয়ে গিয়েছিল। ছেলেপক্ষ থেকে আসা নানা লোকজন নানা প্রশ্ন করবে এবং তার সঠিক উত্তর দিতে পারলেই মেয়ে পছন্দ হবে। প্রাচীনকাল থেকে এই রীতি প্রচলিত। শহরাঞ্চলে এখন আর এ রকম দেখা যায়না। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েরা এখনও এই নিয়মের স্বীকার। এমনই এক যাঁতাকলে পৃষ্ঠ হয়ে ১৯৯৫ সালে বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় শারমীনকে। নবম শ্রেণীতে ভর্তি হবার সুযোগটুকুও পায়নি। বিয়ের ছয় মাস পরই স্বামী বিদেশে চলে যায়। মাত্র পনেরো বছর বয়সে মা হয়। ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা তাকে বিধবা বানিয়ে দিল দেড় বছরের মাঝেই। স্বামী হিসেবে যে জীবনে এসেছিল সে দুর্ঘটনায় মারা যায়। নিজের সন্তানকেও দেখতে পায়নি। সে এক বিভীষিকাময় জীবন। মেয়ে হয়ে পৃথিবীতে জন্মানো যেন এক অভিশাপ আর বিধবা হয়ে বেঁচে থাকা সমাজের কাছে অগ্রহনযোগ্য। যেসময় দুরন্তপনায় স্কুলের করিডোরে ছোটাছুটি করবে তখন কোলে সন্তান নিয়ে ভাবতে শুরু করল কিভাবে তাকে ভালভাবে বড় করা যায়। আর এই চিন্তা থেকেই আবার পড়ালেখা শুরু করল। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়। অনাগ্রসর সমাজে বিয়ের পরে মেয়েদের বাবার ঘর পর হয়ে যায়। আর এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই সে তার অবলম্বন খুঁজে নিয়েছিল। তার জীবনে আসল এমন এক মানুষ যে তার জীবনকে ঘুরে দাঁড়াতে অনেক অবদান রেখেছে। তার এই সংসার জীবনে কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। সন্তানরা অনেক বড় হয়ে গেছে। প্রথম সন্তান ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। শারমীন এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত একজন নাগরিক। দশ বছর যাবত একটি বুটিকস হাউস ও বিউটি পার্লার পরিচালনা করছে। তার মাসিক আয় প্রায় দুই লাখ টাকা। ১৫ জন কর্মচারী তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। অনেক নারী তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে। সন্তানদের পড়ালেখাসহ অনেক ব্যয়ভার বহন করছে সে। কর্মক্ষেত্রে ও সংসারজীবনে একজন সফল নারী শারমীন। কোন বাধাই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তার জীবনে। অদম্য ইচ্ছা ও আগ্রহ তার জীবনের অমসৃণতা দূর করে দিয়েছে। চলার পথে বাধা আসবেই এই বাধাকে বরণ করলে তার পক্ষে আগানো সম্ভব নয় আর তাকে জয় করার মাঝেই আছে সফলতা। অধিকাংশ নারীকেই তার নিজের পরিচয় গড়তে করতে হয় নীরব লড়াই। আমাদের সমাজে এখনও কিছু ক্ষেত্রে মেয়েদের বোঝা মনে করা হয়। কিন্তু একটি মেয়ে কখনও বোঝা হয়ে জন্মায় না। তাকে সেভাবে তৈরি করা হয়। পড়ালেখা করিয়ে সুষ্ঠুভাবে বড় করা হলে একটি নারী-পুরুষের মতোই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক যে কোন কর্মক্ষেত্রেই অংশগ্রহণ করতে পারে।