ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

যেখানে স্বচ্ছ জলে মুখ লুকায় আকাশ

প্রকাশিত: ০৩:৪৮, ২৯ মে ২০১৬

যেখানে স্বচ্ছ জলে মুখ লুকায় আকাশ

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ লেকের স্বচ্ছ জলে মুখ লুকিয়েছে নীল আকাশ। চার পাড়ের বনানী মেলেছে সবুজ ডানা। সবুজ আর নীলের মধ্যে লেকের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে ঝুলন্ত সেতু। অসাধারণ সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। পাখির কলরবে মুখরিত চারপাশ। এ যেন নতুন করে অরণ্যের মাঝে ফিরে আসা। কক্সবাজারের পাশে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেক। প্রাকৃতিক সবুজবেষ্টিত নাইক্ষ্যংছড়ির প্রাণকেন্দ্রে জেলা পরিষদ ডাক বাংলো ঘেঁষে প্রায় আধা কিলোমিটার দীর্ঘ কার্পেটিং সড়ক যুক্ত অপরূপ উপবন লেক । উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএসএম শাহেদুল ইসলামের উদ্যোগে এই লেক আরও বেশি সৌন্দর্য করে তুলতে পাহাড়ের চূড়ায় উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব কুঠির ও ঝুলন্ত সেতুকে সংস্কার করা হয়েছে। যাতে পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। সৌন্দর্যম-িত করে তুলতে দৃষ্টিনন্দন সারি সারি বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ পাতার গাছ লাগানো হয়েছে লেকের চারদিকে। এখানে রয়েছে পাহাড়কন্যা নাইক্ষ্যংছড়ির মনোরম ছায়ানিবিড় সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগ। যা ভ্রমণার্থীদের আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এ লেকে এখন শৌখিন মৎস্য শিকারিরা উপজেলা পরিষদ থেকে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে টিকেট সংগ্রহ করে মাছ ধরতে ভিড় করছে প্রতিদিন। শৌখিন মৎস্য শিকারিরা ধরছে বিশাল বিশাল মাছ। এ লেকে ৬৮ কেজি ওজনের মাছও রয়েছে বলে জানালেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহেদুল ইসলাম। এ উপজেলাতে উপবন লেক ছাড়াও বিনোদনের জন্য বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠা কুমির প্রজনন কেন্দ্র, উপজেলার হর্টিকালচার সেন্টার, দেশের বৃহৎ রাবার বাগান, আশারতলী গ্রামের চা-বাগান, সদর ইউনিয়নের জারুলিয়াছড়ির সোসং ও কোয়াসং ঝর্ণা। নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেকের চারপাশে বাঙালী ও পাহাড়ী অদিবাসীদের বসতি দেখে পর্যটকদের চোখ জুড়িয়ে যায়। সারি সারি কাঠের বাড়ি আর তাদের ভাষা-সংস্কৃতি আদি এ জনগোষ্ঠীর জীবন চিত্রের ভিন্নতা তুলে ধরেছে সকলের কাছে। ঝুলন্ত সেতুর পাশেই ছোট্ট উপজাতীয় রাখাইন পল্লী। পর্যটকদের আর্কষণের অন্যতম উপকরণ দীর্ঘ এ লেক। বাঁশের বেড়া-খড়ের ছাউনিযুক্ত ছোট ছোট পরিবেশবান্ধব বিশ্রাম ঘর, আর উঁচু-নিচু পিচঢালা পথ। বিশেষ করে লেকের পাশে উঁচু চূড়ায় উঠলে নাইক্ষ্যংছড়ির অপরূপ রূপ দেখা যায়। প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট ॥ ১৯৮৮ সালে প্রাণিসম্পদ নিয়ে গবেষণার জন্য নাইক্ষ্যংছড়ি সদর বিছামারা এলাকায় ১৬২ একর জমির ওপর স্থাপিত হয় প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট। বর্তমানে এ ইনস্টিটিউটে প্রাণী নিয়ে গবেষণার কাজে নিয়োজিত আছেন ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এখানে গয়াল, হরিণ, ভেড়া, ছাগল, বন্য ও দেশী মোরগ-মুরগি আছে প্রচুর। এসব পাহাড়ী পশু-প্রাণীকে সরাসরি দেখার জন্য পর্যটকরা নাইক্ষ্যংছড়িতে ছুটে আসেন। কুমির প্রজনন কেন্দ্র ॥ পার্বত্য এ উপজেলার দুর্গম ঘুমধুম ইউনিয়নের পাহাড়ে ২৫ একর ভূমিতে হচ্ছে কুমির চাষ। ২০১০ সালে মালয়েশিয়া থেকে অর্ধশতাধিক লোনা পানির কুমির দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা কুমির প্রজনন কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়। কুমিরের দৌড়ঝাঁপ দেখতে সেখানে প্রতিদিন ভিড় করছে পর্যটকরা। এই দুর্গম পাহাড়ের ওপর পানিতে কুমিরের দৌড়ঝাঁপ দেখে মনটা জুড়িয়ে যায় পর্যটকদের। সোসং ও কোয়াসং ঝর্ণা ॥ জারুলিয়াছড়িতে অবস্থিত সোসং ও কোয়াসং ঝর্ণা। ঝর্ণা দুটির মধ্যে একটির উচ্চতা প্রায় ১৫০ ফুট ও অপরটি ২০ ফুট। এসব ঝর্ণা দেখলে ভ্রমণ পিপাসুরা মুগ্ধ হয়। মনোমুগ্ধকর এ দুটি ঝর্ণা দেখতে অনেকে ছুটে আসে পাহাড় ঘেরা নাইক্ষ্যংছড়ির জারুলিয়াছড়িতে। উঁচু খাড়া পাহাড় হতে ঝর্ণার পানি শব্দ করে নিচে পড়ছে। রাবার বাগান ॥ বাণিজ্যিক রাবার চাষে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী বিখ্যাত। ১৯৮৭ সাল থেকে এখানে দেশের বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে তোলা রাবার বাগান ব্যবসায়িকভাবে লাভের মুখ দেখছে। বাইশারী এলাকা রাবার শিল্প সম্ভাবনাময় হওয়ায় স্থানীয়রা এখানকার উৎপাদিত রাবার ল্যাটেক্স’কে তরল ‘সাদা সোনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। উৎপাদিত রাবার দেশের রাবার শিল্পের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। বাইশারীতে রাবার চাষ করে ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়েছে চিত্রনায়ক সোহেল রানা ও রুবেল।