ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

আশ্রয়কেন্দ্রে ২২ হাজার মানুষ ॥ বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট

সিলেটে নতুন এলাকা প্লাবিত

জনকণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩:৪২, ২০ জুন ২০২৪

সিলেটে নতুন এলাকা প্লাবিত

সিলেট নগরীতে বন্যায় ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে নৌকায় করে উঁচু জায়গার খোঁজে একটি পরিবার

সিলেটে বন্যার পানি কোথাও বাড়ছে, কোথাও কমছে। তবে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাবারের সংকট চলছে। বন্যার কবল থেকে মহানগরীকে রক্ষা করতে সুরমা নদী ড্রেজিং করা হবে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিকে, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যান্য নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। নীলফামারীর ডিমলায় বুড়িতিস্তার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।

এ এলাকায় তিস্তার ভাঙনের মুখে পড়েছে শতাধিক বসতঘর। কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরী উপজেলার আরও কিছু নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ জেলায় উব্দাখালি নদীর পানি বিপৎসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সোমেশ^রী, কংস, মগড়া ও ধনু নদীর পানি বৃদ্ধিও অব্যাহত আছে। খবর স্টাফ রিপোর্টার, নিজস্ব সংবাদদাতা ও সংবাদদাতার। সিলেটে বৃহস্পতিবার সকালে কিছুটা বৃষ্টি হলেও সারাদিন ছিল বৃষ্টিবিহীন। দুপুর দুটার পর আকাশে রোদের ঝিলিক দেখা যায়।

বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা কম থাকায় সিলেটের উত্তরাঞ্চলে বন্যার পানি অনেকটা কমেছে। জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সদর উত্তরের গ্রামগুলো থেকে পানি নামছে। এদিকে অসমে সৃষ্ট বন্যার পানি সুরমা, কুশিয়ারা ও লোভা নদী দিয়ে প্রবেশের কারণে অনেক স্থানে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত জকিগঞ্জ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপিরিবর্তিত থাকলেও কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি কম হলেও প্রধান নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। জেলা প্রশাসনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত জেলার ৬৯৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ হাজার ৭৮৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন। জেলায় বন্যায় আক্রান্ত হয়েছেন ৯ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৮ জন। এর মধ্যে ওসমানীনগরে ১ লাখ ৮৫ হাজার ও গোয়াইনঘাটে ১ লাখ ৪৫ হাজার ২০০ মানুষের অবস্থা বেশি খারাপ। জেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩০টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০২টি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। আর সিটি করপোরেশনের ২৩টি ওয়ার্ডে বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা ৫৫ হাজার।
বন্যাকবলিত অনেক এলাকায় উদ্ধার বা ত্রাণ সহায়তা যাচ্ছে না, এমন অভিযোগ রয়েছে অনেকের। তবে প্রাশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জন্য ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং ৬০০ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে। সিলেট আবহাওয়া অফিস জানায়, সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় ১১০ দশমিক ২ মিমি বৃষ্টি হয়েছে, আর বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ২০ মিমি বৃষ্টি হয়েছে। তবে আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, সিলেটের কোথাও পানি কমেছে, আবার কোথাও বেড়েছে। তবে কুশিয়ারা নদীর একটি পয়েন্ট ছাড়া অন্য নদ-নদীর পানি আগের তুলনায় নেমেছে। বন্যার্ত এলাকায় প্রশাসনের ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। জেলা প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় বেশিরভাগ এলাকায় রাস্তাঘাট ও বাসাবাড়িতে এখনো বন্যার পানি রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে রাস্তাঘাট।

ঘরবাড়িতে পানি থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন মানুষ। কানাইঘাটে সুরমা ও লোভা নদীর পানি কিছুটা কমলেও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখনো সুরমা নদীর ডাইকের ১৮টি ভাঙনকবলিত স্থান দিয়ে প্রবল স্রোতে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। প্রত্যন্ত এলাকায় কোথাও কোথাও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এবং নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার অধিকাংশ গ্রামীণ রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে রয়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। প্রত্যন্ত এলাকার লোকজন যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় নৌকা নিয়ে যাতায়াত করছেন।

বন্যাকবলিত এলাকার লোকজনে কাছে সরকারি ত্রাণসামগ্রী সার্বক্ষণিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৯টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি ২৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া ১১৬২ জন মানুষের মাঝে এক বেলা খাবার নিশ্চিত করার জন্য চাল, ডাল, আলু, তৈল, মসলা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শুকনা খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হচ্ছে। 
এদিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। বন্যায় উপজেলার ৫টি ইউনিয়নই আক্রান্ত হয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারের মধ্যবাজার ও পূর্ববাজার ডুবে আছে দুদিন ধরে। হাসপাতাল রোড ও আশপাশের কয়েকটি সরকারি দপ্তর, ফার্মেসি, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, জনস্বাস্থ্য উপ-প্রকৌশলীর অফিসেও পানি প্রবেশ করেছে। ফেঞ্চুগঞ্জ থানা রোড থেকে পূর্ববাজার হয়ে ১ নম্বর ইউনিয়নের অনেক গ্রাম বন্যা আক্রান্ত।

অন্যদিকে, উত্তর ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়নের মল্লিকপুরে পানি প্রবেশের কারণে মল্লিকপুর ইলাশপুর ভায়া সড়কটি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। এই সড়কটি তলিয়ে গেলে সিলেটের সঙ্গে বিস্তৃত অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
সুরমা নদী ড্রেজিং করা হবেÑ পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ॥ বৃহস্পতিবার সিলেটের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেন, সিলেট নগরীকে আগাম বন্যার কবল থেকে রক্ষা করতে সুরমা নদী ড্রেজিং করা হবে। নদীতে পলিমাটি থাকার ফলে এর আগেও ড্রেজিংকাজ ব্যাহত হয়েছিল। উজান থেকে আসা পানির সঙ্গে পলিমাটিও আসে, সে পলিমাটি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে।

প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলাপ করেছি, দ্রুত সুরমা নদী ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার নগরীর ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের টুকেরবাজার এলাকার শাদীখাল পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের ৯টি স্থানে ড্রেজিং স্টেশন তৈরি করা হচ্ছে। নদীভাঙন রোধ ও পলিমাটি অপসারণে নিয়মিত নদী খনন করা হবে। এ সময় সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, সিলেট জেলা প্রশাসন কর্মকর্তা, বিভিন্ন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
যুবলীগের ত্রাণ বিতরণ ॥ মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাবার বিতরণ করেছে সিলেট মহানগর যুবলীগ। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় নগরীর উপশহর এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ঘরে ঘরে পানিবন্দি মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এমপির নির্দেশে সিলেট মহানগর যুবলীগের সভাপতি আলম খান মুক্তি যুবলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার নিয়ে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

ত্রাণ বিতরণকালে সিলেট মহানগর যুবলীগের সভাপতি আলম খান মুক্তি বলেন, যুবলীগ সব সময় মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা সিলেট মহানগর যুবলীগ অতীতের ন্যায় পানিবন্দি মানুষের মাঝে শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানিসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছি। সিলেটে যে কোনো দুর্যোগময় সময়ে সিলেট মহানগর যুবলীগ মানুষের পাশে ছিল, আগামীতেও থাকবে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদ হোসেন ইমু, দপ্তর সম্পাদক সাকারিয়া হোসেন সাকির, সহ-সম্পাদক মুনসুর হাসান চৌধুরী সুমন, আমিনুল ইসলাম আমিন, সদস্য এমদাদুল হক উবেদ, মাহফুজুর রহমান প্রমুখ।
জেলা পুলিশের ত্রাণ তৎতপরতা ॥ জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে পানিবন্দি মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়াসহ বিভিন্ন ত্রাণ কার্যক্রম ও  মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সিলেট জেলার বানভাসি মানুষের ফ্রি চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশে কোম্পানীগঞ্জ থানা এলাকায় ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল ক্যাম্পের মাধ্যমে প্রায় ২০০ জন পানিবন্দি মানুষকে ফ্রি চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়।
সুনামগঞ্জ ॥ সুরমা নদীর পানি ষোলঘর পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার কমলেও দিরাই পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৬ সেমি। ফলে হাওড়ে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে এবং হাওড়পাড়ের গ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সুরমার পানি ষোলঘর পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৬ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছাতক পয়েন্টে ১২১ সেমি এবং দিরাই পয়েন্টে ৩২ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে বৃষ্টিপাত কম হলেও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টির কারণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানি বাড়ছে। ইতোমধ্যে পানিবন্দি হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ।
নতুন করে প্লাবিত হয়েছে হাওড়ের আশপাশের গ্রামগুলো। তবে নদীতীরবর্তী গ্রামের বাড়িঘর থেকে পানি কিছুটা কমেছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে বিশ্বম্ভরপুর, শান্তিগঞ্জ, জগন্নাথপুর, তাহিরপুর, শাল্লা, ধর্মপাশা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম। 
বন্যার্তদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজসহ বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো। সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার শহরতলীর বেশ কয়েকটি এলাকা। 
তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লা, ছাতক, দোয়ারাবাজারসহ নিম্নঞ্চলের বসতবাড়ি, দোকান, চলাচলের সড়ক, মসজিদ, মন্দির পানিতে ডুবে আছে। ভেসে গেছে সুনামগঞ্জের ২ হাজার পুকুরের মাছ।
বসতবাড়ি ও দোকানের মালামাল রক্ষায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় নদী ও হাওড়পাড়ের মানুষ। 
ইতোমধ্যে বন্যাকবলিত ১২ হাজার ৪৩৯ জনকে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন্যার্তদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। জেলার ৫১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রের সবটিতে সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা চালু রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় তিন লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। আরও ১৫ লাখ ট্যাবলেট মজুত রয়েছে।
ধর্মপাশা ॥ সুরমা ও সুমেশ^রী নদী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ধর্মপাশা ও নবগঠিত মধ্যনগর উপজেলার নি¤œঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। কাঁচা-পাকা সড়কগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওড়বেষ্টিত ভাটি এলাকার সব গ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। গ্রামগুলোতে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম নৌকার বিকল্প নেই।
বন্যাদুর্গতদের পাশে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ॥ সিলেট ও সুনামগঞ্জে বানভাসি মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা, তাদের খাদ্য সহায়তা নিশ্চিতসহ সার্বিক সহযোগিতায় নিরলসভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুনামগঞ্জ জেলা কমান্ড্যান্ট কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ ব্যারাক, ডাইনিং রুম ও হলরুমে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বাহিনীর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করা হচ্ছে। 
মৌলভীবাজার ॥ মৌলভীবাজার জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কমলগঞ্জে ধলাই নদীর তিনটি স্থানে বাঁধ ভেঙে নতুন করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কমলগঞ্জে ধলাই নদীর সদর ইউনিয়নের চৈতন্যগঞ্জ এলাকার এবং রহিমপুর ইউনিয়নের চৈত্রঘাট ও মুন্সিবাজার ইউনিয়নের খুশালপুর গ্রামে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করে নারায়ণপুর, চৈতন্যগঞ্জ, বাঁধে উবাহাটা, খুশালপুর ছয়কুট, বড়চেগ, জগন্নাথপুর, প্রতাপী, গোপীনগর, আধকানী, কাঁঠালকান্দিসহ প্রায় ৪০টি গ্রামে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি ও বাড়ি ঘরে পানি প্রবেশ করছে। 
মনু ও ধলাই নদীর বাঁধের ১৯টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। কয়েক দিনের টানা ভারি বর্ষণে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে ৭টি উপজেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে কুলাউড়া পৌরসভার ৩টি ওয়ার্ড। এ ছাড়াও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কুলাউড়া উপজেলা পরিষদ ও জুড়ী উপজেলা পরিষদে। বন্যাকবলিত এলাকার অধিকাংশ গ্রামীণ রাস্তা তলিয়ে গেছে। আঞ্চলিক সড়কের অনেক স্থানে পানি উঠেছে। বাড়ি ঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি রয়েছেন ৭ উপজেলার প্রায় ৩ লাখ মানুষ। জেলার ৪০ ইউনিয়নের ৪৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ৯৮টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। 
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল জানান, জেলার মনু, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে ধলাই নদীর পানি কিছুটা কমেছে। উজানে ভারত অংশে বৃষ্টি না হলে পানি কমতে শুরু করবে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো মনিটরিং রাখা হচ্ছে।    
এদিকে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের পশ্চিম শ্যামেরকোনা গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে হৃদয় আহমদ (১৬) ও সাদি মিয়া (৮) দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
নেত্রকোনা ॥ কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরী উপজেলার আরও কিছু নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উব্দাখালি নদীর পানি বিপৎসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সোমেশ^রী, কংস, মগড়া ও ধনু নদীর পানি বৃদ্ধিও অব্যাহত আছে। নেত্রকোনা-১ আসনের এমপি মোশতাক আহমেদ রুহী দাবি করেছেন, কলমাকান্দার বড়খাপন, পোগলা, সদর ইউনিয়ন সম্পূর্ণভাবে এবং খারনৈ ও রংছাতি ইউনিয়ন আংশিকভাবে বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। ডুবে গেছে বহু গ্রামীণ সড়ক। এসব ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী স্থাপনা, বাড়িঘর এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো চরম হুমকির মুখে রয়েছে বলেও জানান তিনি। 
কুড়িগ্রাম ॥ এ জেলায় তিস্তা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা নদীসহ ১৬টি নদীর পানি বেড়েই চলছে। এর মধ্যে ধরলা এবং তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিনটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কুড়িগ্রাম সদর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও রাজারহাট উপজেলার প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাউবো সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত ফুলবাড়ি উপজেলার তালুকশিমুল শেখ হাসিনা ২য় ধরলা সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি ১৬ সেন্টিমিটার ও কাউনিয়া রেল সেতু পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে নদনদীতে ব্যাপক ভাঙন। 
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরিফ বলেন, ধরলা ও তিস্তা নদীর দুটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে ফলে রাজারহাট, নাগেশ্বরী ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার নিচু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগ কবলিত মানুষের সংখ্যা তিন হাজার ৬৯১ জন। 
নীলফামারী ॥ ডিমলা উপজেলার বুড়িতিস্তা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলার সুন্দরখাতা এলাকায় দ্রুতগতিতে বুড়িতিস্তা নদীর পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। একপর্যায়ে সকাল ৯টার দিকে বুড়িতিস্তা নদীর মূল বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার অংশ ভেঙে দ্রুত আশপাশের ১০টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। এতে তলিয়ে যায় বেশ কিছু জমির ফসল ও আমন ধানের বীজতলা। 
অপরদিকে বৃহস্পতিবার নীলফামারীর ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানি সকাল ৬টায় বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি স্লুইচগেট খুলে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে তিস্তা নদীর পানি কমে সন্ধ্যা ৬টায় ২১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে রাতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর বিপৎসীমার ৫২.১৫ মিটার। এ দিন ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা অববাহিকার ডালিয়ায় ১১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বুধবারের চেয়ে ৫ সেন্টিমিটার বেশি। এই পয়েন্টে তিস্তার বিপৎসীমার ২৮.৭৫ মিটার। ভাঙনে গদাই ও পাঞ্জরভাঙা গ্রামে প্রায় একশত হেক্টর ফসলি জমি তিস্তা নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে অর্ধশতাধিক পরিবার বাড়ি ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙনের কাছাকাছি চলে এসেছে বসতবাড়ি। এলাকাবাসীর অভিযোগ পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নেওয়ায় গ্রামবাসী নিজেরাই বাঁশ ও বস্তায় বালি ফেলে ভাঙনরোধের চেষ্টা করছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদ্দৌলা বলেন, গজলডোবায় পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে তিস্তার পানি আজ শুক্রবার আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
লালমনিরহাট ॥ তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদী তীরবর্তী নি¤œ অঞ্চলের ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। 
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় কাউনিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ২৯ মিটার যা বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।  আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লালমনিরহাটের নি¤œাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড। ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও তিস্তা নদীতে পলি পড়ে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে আসায় অল্প পানিতে লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, কালমাটি, রাজপুর, গোকু-া ইউনিয়নের আরও কিছু নি¤œাঞ্চল, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, পলাশী, মহিষাশহর কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, শৈইলমারী, নোহালী ও চর বৈরাতি, হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া ও ডাউয়াবাড়ী এবং পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়নের তিস্তা তীরবর্তী নি¤œাঞ্চলের বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করেছে। এসব এলাকা ঘুরে দেখা গেছে নদীর পানি প্রবেশ করায় তলিয়ে গেছে ধান, বাদামসহ নানা ধরনের ফসলের খেত এবং গ্রামীণ রাস্তাঘাট। এতে চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। 
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার রায় জানান, উজান থেকে আরও ব্যাপকহারে তিস্তা নদীতে পানি প্রবেশ করলে আমাদের বাংলাদেশ অংশের তিস্তা নদীতীরবর্তী পুরো অঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। 
গাইবান্ধা ॥ এ জেলায় সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদ, ঘাঘট, তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি বেড়েছে। তবে এর মধ্যে শুধু তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিকেল ৩টায় তিস্তার পানি ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
গাইবান্ধা পাউবোর তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদের পানি জেলা শহরের নতুন সেতু পয়েন্টে ৩৭ সেন্টিমিটার ও করতোয়ার পানি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার চকরহিমাপুর পয়েন্টে ১৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে। সকালে তিস্তার পানি সুন্দরগঞ্জ উপজেলাসংলগ্ন কাউনিয়া পয়েন্টে ৩৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদের পানি ১৪৬ সেন্টিমিটার ও করতোয়া নদীর পানি ২৪৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। 
এদিকে তিস্তার পানি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর, হরিপুর ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। হাজারো মানুষ চরাঞ্চলে পানিবন্দি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি, ঘাগোয়া, ফুলছড়ি উপজেলার এরান্ডাবাড়ি, ফজলুপুরের নি¤œাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

×