ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

এশিয়ার তৃতীয় সর্বোচ্চ মিনার ॥ ভিড় থাকে বারো মাস

পড়ন্ত বিকেলে ফুটে ওঠে সৌন্দর্য, মুগ্ধ দর্শনার্থী

খোকন আহম্মেদ হীরা

প্রকাশিত: ০০:১৪, ১৬ মে ২০২৪

পড়ন্ত বিকেলে ফুটে ওঠে সৌন্দর্য, মুগ্ধ দর্শনার্থী

বরিশালে নয়নাভিরাম বায়তুল আমান জামে মসজিদ কমপ্লেক্স

ভৌগোলিক দিক থেকে চন্দ্রদ্বীপ, বাকলা পরবর্তীতে বরিশালে পরিণত হওয়া ৫০ হাজার বছর বয়সের এই জনপদের নবপরিচয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মাত্র ১৭ বছর বয়সের অনিন্দ্য সুন্দর স্থাপনা। বছরের প্রায় বারো মাসই দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসুরা বরিশালে ছুটে আসেন এই স্থাপনার গোধূলি আর সন্ধ্যা পরবর্তী সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

আগত দর্শনার্থীরা এখানে এসে প্রকৃতি ও নয়নাভিরাম এই স্থাপনার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন। তবে প্রতি বছর যেকোনো বড় উৎসবে এখানে হাজার হাজার দর্শনার্থীর ভিড় থাকে।
তারই ধারাবাহিকতায় বিগত ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখের টানা ছুটিতে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাজার-হাজার দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে অবস্থিত সৌন্দর্যে ঘেরা বায়তুল আমান জামে মসজিদ কমপ্লেক্স এলাকা।

গুঠিয়া ইউনিয়নে স্থাপিত হওয়ায় এটি গুঠিয়া মসজিদ নামে সবার কাছে ব্যাপক পরিচিত। বরিশাল শহর থেকে নয়নাভিরাম এই মসজিদের দূরত্ব মাত্র ২১ কিলোমিটার।
চাংগুরিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী এস সরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করা হয়। সান্টুর ভাতিজা সরদার মো. সোহেল জনকণ্ঠকে জানান, প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪ একর জমির ওপরে মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হয়েছে ২০০৬ সালে।

নির্মাণকাজে ২ লাখ ১০ হাজার নির্মাণশ্রমিক কাজ করেছেন। মসজিদ এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় ১৩টি গম্বুজ। মসজিদের মূল মিনারের উচ্চতা ১৯৩ ফুট। বিবেচনা করা হয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ মিনার। বায়তুল আমান জামে মসজিদের মূল ভবনে একসঙ্গে জামাতে প্রায় দেড় হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। আর ঈদগাহ ময়দানে একসঙ্গে ২০ হাজারেরও বেশি মুসল্লি অংশগ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে।
প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশপথের বামে নির্মিত হয়েছে একটি স্তম্ভ। মসজিদের স্তম্ভটি বিশ্বের ২১টি পবিত্র স্থানের মাটি ও জমজমের পানি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। মাটি সংগ্রহ করা স্থানগুলো হলো-পবিত্র কাবা শরিফ, আরাফার ময়দান, মুজদালিফা, ময়দানে মিনা, জাবালে নূর, জাবালে সূর, জাবালে রহমত, হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জন্মস্থান, হযরত হাওয়ার (আ.) কবরস্থান, মসজিদে রহমত, মসজিদে কু’বা, অহুদের যুদ্ধের ময়দান, হযরত হামজা (রা.) মাজার, মসজিদে আল কিবলাতাইন, মসজিদে হজরত আবু বকর (রা.), জান্নাতুল বাকি, মসজিদে নববী, জুলহুলাইফা-মিকাত, বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ) হাতের লেখা তাবিজ ও মাজারে পাওয়া দুটি পয়সা এবং হজরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ) এর মাজারের মাটি।
প্রধান ফটক থেকে মসজিদের ভেতর সবখানেই সুদৃশ্য ক্যালিওগ্রাফি, বর্ণিল কাচ, দামি মার্বেল ও গ্রানাইট পাথরে মোঘল আর আধুনিক স্থাপত্যকলার সমন্বয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইসলামিক নির্মাণশৈলী। মসজিদের মূল কাঠামোতে নয়টি গম্বুজ। এরমধ্যে কেন্দ্রীয় গম্বুজের ভেতরের চারদিকে বৃত্তাকারের ক্যালিওগ্রাফিতে লেখা হয়েছে সুরা আর রহমান।

অন্য আটটি মিনারের নিচে মদিনা থেকে নিয়ে আসা ঝাড়বাতি বসানো হয়েছে। মসজিদের সামনে নীল ও ফিরোজা রঙের টাইলসে নির্মিত দুটি ফোয়ারা নান্দনিকতার অপূর্ব চিত্রায়ন। মসজিদে প্রবেশের দোয়া অঙ্কিত প্রধান খিলান, সুদৃশ্য কারুকাজ খচিত কাঠের ছয়টি দরজা, মূল্যবান ঝাড়বাতি, সিরামিক্স, গ্লাস, মার্বেল ও গ্রানাইট পাথরে সজ্জিত ভেতরকার আবহ বিমোহিত করছে আগত দর্শনার্থীদের।
মসজিদের চিত্তাকর্ষক সৌন্দর্য ফুটে ওঠে পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের সোনালি আলোয় আর সন্ধ্যার পরে পুরো কমপ্লেক্সজুড়ে বৈদ্যুতিক আলোকচ্ছটায়। কখনো লোহিত, কখনো গোলাপী, সাদা আর হলুদ রঙের মসজিদ যেন আলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে রঙ বদলায়। মসজিদ ভবনের পূর্বে বিশাল দিঘি, শান বাঁধানো প্রশস্ত ঘাটলা, কম্পাউন্ডের চারদিকে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল-ফলদ বৃক্ষশোভায় হৃদয় জুড়িয়ে যায় দর্শনার্থীদের।

এখানে নারী ও পুরুষের জন্য রয়েছে আলাদা নামাজের স্থান। রয়েছে কবরস্থান। যেখানে সম্বলহীনদের মরদেহ বিনামূল্যে দাফন করা হয়। এছাড়াও এতিমখানা, ডাকবাংলো, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, লেক ও হ্যালিপ্যাড বাড়তি সুবিধা যুক্ত করেছে।
মসজিদের ইমাম হাফেজ মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মসজিদটি দেখভালের জন্য ১৯ জন স্টাফ রয়েছেন। স্টাফ ছাড়াও এস সরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টুর মায়ের নামে এতিমখানা ও হাফেজি মাদ্রাসা আছে। মসজিদের দক্ষিণ পাশে রাস্তার পাশে রয়েছে একটি ফিলিং স্টেশন। ওই ফিলিং স্টেশন থেকে যা আয় হয় তা দিয়েই মসজিদের স্টাফ ও এতিমখানা পরিচালিত হয়।

তিনি আরও বলেন, বায়তুল আমান জামে মসজিদটি শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে প্রিয় তেমন নয়, প্রতিদিন শত শত অন্যান্য ধর্মাবলম্বী দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। মুসলিমরা সাধারণত নামাজ আদায় করার জন্য আসেন। অন্যরা এসে মসজিদের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন।

×