ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ত্রাণ নিয়ে ফেরা হলো না বাড়ি, নিহত সপরিবারে

নিজস্ব সংবাদদাতা, বোয়ালমারী, ফরিদপুর

প্রকাশিত: ১৬:৫২, ১৬ এপ্রিল ২০২৪

ত্রাণ নিয়ে ফেরা হলো না বাড়ি, নিহত সপরিবারে

স্বজনের আহাজারি। ছবি: জনকণ্ঠ

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ইউনিয়নের ছত্রকান্দা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা তারা মিয়ার সন্তান রাকিবুল ইসলাম মিলন (৪০) চাকরি করতেন ঢাকায় সচিবালয়ে লিফটম্যান হিসেবে।

সচিবালয়ে চাকরির সুবাদে পরিচিতদের মাধ্যমে সম্প্রতি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের জন্য তদবির করে ত্রাণ হিসেবে কয়েক বান্ডিল টিন সহায়তার বরাদ্দ আনেন। 

মঙ্গলবার(১৬ এপ্রিল) সকালে একটি পিকআপে করে নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আশেপাশের গ্রামের কয়েকজনকে নিয়ে সেই টিন আনতে যাচ্ছিলেন ফরিদপুরের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে। 

পথিমধ্যে বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে রাকিবুলের স্ত্রী সুমি বেগম (৩৩) ও দুই সন্তান আবু রায়হান (৬) আবু সিনান রুহান (৫) সহ ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মিলনের মা খুড়িয়া বেগম। এ দুর্ঘটনায় মর্জিনা বেগম (৭০) নামে মিলনের একজন নানী শাশুড়িরও মৃত্যু হয়েছে। মর্জিনা বেগম একই গ্রামের ওহাব মোল্লার স্ত্রী। 

এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার খবরে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের লাশ ঘরে নিয়ে আসা হলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। 

এদিকে বোয়ালমারীর ছত্রকান্দা গ্রামটি আলফাডাঙ্গা উপজেলার সীমান্ত ঘেষা। 

এ ব্যাপারে নিহত রাকিবুল ইসলাম মিলনের মামাতো ভাই নুরুজ্জামান খসরু বলেন, ঢাকা থেকে কয়েকটি দরিদ্র পরিবারের জন্য ত্রাণের টিনের ব্যবস্থা করে সোমবার বিকেলে বাড়িতে আসে মিলন। সকালে ফরিদপুর রওনা হয়। তার আগে গতরাতে সর্বশেষ কথা হয়েছিল তার সাথে। বলেছিলো, ত্রাণের টিনগুলো বুঝিয়ে দিয়ে ওই পথেই চলে যাবে ঢাকা। এটিই যে তার শেষ যাওয়া সেটি কি কেউ জানতো।

তিনি আরও বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা তারা মিয়ার তিন ছেলের মধ্যে রাকিবুল ইসলাম মিলন মেঝো ছিলেন। তার বড় ভাই ফরিদুল ইসলাম একজন স্কুল শিক্ষক। ছোট ভাই হাবিবুর রহমান মাস্টার্স পাশ করে আলফাডাঙ্গা সদরে ফোন ফ্লেক্সির ব্যবসা করেন। আট বছর আগে আলফাডাঙ্গার বানা ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামের রোকায়েশ মোল্লার মেয়ে সুমির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। 

নিহত রাকিবুলের আরেক ফুফাতো ভাই মকিবুল ইসলাম বাবলু বলেন, এভাবে পিকআপে যাত্রী চলাচলের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, এভাবে সকলের সামনে পিকআপে পনের বিশজন মানুষ যাত্রা করলো অথচ কেউ কিছু বললো না! সড়কপথে এভাবে যাত্রী চলাচল নিষিদ্ধ হলেও কেউ সে আইন মানে না। আবার যাদের দেখভাল করার কথা তারাও কিছু বলে না।

এ বিষয়ে বোয়ালমারীর শেখর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইস্রাফিল মোল্লা বলেন, রাকিবুল ইসলাম মিলন ঢাকায় সচিবালয়ে লিফটম্যান হিসেবে চাকরি করতেন। সচিবালয়ে চাকরির সুবাদে পরিচিতদের মাধ্যমে সম্প্রতি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের জন্য তদবির করে ত্রাণ হিসেবে কয়েক বান্ডিল টিন সহায়তার বরাদ্দ আনেন। 

সেই বরাদ্দের টিনগুলো গরীব মানুষদের মাঝে বুঝে দিয়ে ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী-পুত্র সহ নিহত হলেন সপরিবারে।

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম বলেন, যেই পিকআপটিতে করে তারা যাচ্ছিলেন হয়তো তার চালকের কোন লাইসেন্সই ছিলোনা। এজন্য যখন কেউ কোন পরিবহনে উঠবেন, নিজের দ্বায়িত্বশীলতা থেকেই জেনে নিবেন, গাড়িটি উপযোগী কিনা কিংবা চালকের বৈধতা আছে কিনা।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. কামরুল আহসান তালুকদার বলেন, ত্রাণ নিয়ে ঢাকা যাওয়ার বিষয়টি জানা নেই। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে তিন লাখ টাকা করে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার সকাল ৮ টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ফরিদপুরের কানাইপুরের দিগনগর এলাকায় বাস পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
 

 

এসআর

×