ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

গোপালগঞ্জের নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী

পঁচাত্তরের পর এবারই সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০০:১৯, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

পঁচাত্তরের পর এবারই সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন

১৯৭৫ সালের পর গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি মনে করি বাংলাদেশে সেই ’৭৫ সালের পর থেকে যত নির্বাচন হয়েছে সেখানে সব থেকে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন এবারেরটি। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় কথা হলো জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছে এবং ভোট দিয়েছে। জনগণ তাদের ভোটের অধিকার যে ফিরে পেয়েছে সেটা এবার তারা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছে। 
বুধবার তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতো বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের হাতে তৈরি দল বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও ও নৈরাজ্যের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে অনেক চক্রান্ত ছিল, ষড়যন্ত্র ছিল। তারা (বিএনপি) মানুষ পুড়িয়ে মারা, রেলের ফিশপ্লেট খুলে ফেলে রেলের বগি ফেলে দেওয়া, রেলে আগুন দেওয়াসহ নানা অপকর্ম করেও নির্বাচন ঠেকাতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি।
টানা চতুর্থবারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ জানুয়ারি আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেছে। নির্বাচনের সময় সভা করেছি। নির্বাচনের পরও টুঙ্গিপাড়ায় গিয়েছিলাম, আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। এর পর আমি মনে করলাম আপনারা ভোট দিয়ে আমাকে কোথায় পাঠালেন সেই জায়গাটা তো আপনাদের একটু দেখতে হবে। সেজন্যই আজকে আমার এখানে আপনাদের দাওয়াত, সেজন্যই আপনারা এখানে এসেছেন।

তিনি গণভবন সবাইকে ঘুরে দেখারও আমন্ত্রণ জানান, কারণ এটা তাদেরই ঘর।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আজকে কিন্তু আপনাদের এখানে কোনো রাজনীতি করতে ডাকিনি।  আমি মনে করি আপনারা আজকে টুঙ্গিপাড়া থেকে এখানে উপস্থিত হয়েছেন, এই গণভবনের মাটি আজকে ধন্য হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আমরা সরকার গঠন করেছি। সেটাও আমি মনে করি আপনাদেরই অবদান। কারণ আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া সেটা কখনো সম্ভব ছিল না। সেজন্য আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এটুকুই চাই টুঙ্গিপাড়া এবং কোটালীপাড়ায় আমি বারবার প্রার্থী হয়েছি, আপনারা আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, আপনারা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আমি জানি ’৭৫ এর পর এই সমস্ত অঞ্চলের মানুষ অত্যন্ত কষ্ট ভোগ করেছেন। যাহোক আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর থেকে আমরা ব্যাপকভাবে উন্নয়ন করেছি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছি।

তাঁর সরকারের ভূমিহীন-গৃহহীনকে ঘর করে দেওয়াসহ জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার পদক্ষেপের উল্লেখ করে নিজেদের এলাকায় ভূমিহীন-গৃহহীন থাকলে খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তিনি। কেননা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাংলায় একটি মানুষও আর ঠিকানাবিহীন থাকবে না।
শেখ হাসিনা বলেন, এটা বাস্তব যে এই ১৫ বছরে বাংলাদেশকে আমরা বদলে দিতে পেরেছি। সব থেকে বড় কথা আজকে পদ্মা সেতু হয়ে গিয়েছে বলেই সকলে খুব সহজেই আপনারা  (গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণবঙ্গ থেকে) চলে আসতে পারছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব ব্যাংক ভুয়া দুর্নীতির অভিযোগ দিয়েছিল। সেটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে প্রমাণ করেছেন যে এখানে কোনো দুর্নীতি হয়নি এবং নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করে বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে আমরাও পারি।
তিনি বলেন, সামনে আমাদের যাত্রাপথ এত সহজ নয়। আমাদের অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়। অনেক চক্রান্তই বাংলাদেশটাকে ঘিরে আছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং প্রশিক্ষনের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সার তৈরি করায় সরকারের সাফল্য তুলে ধরেন, যাতে ঘরে বসেই দেশ-বিদেশে কাজ করে অর্থ উপার্জন করা যায় এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে তাঁর সরকারের পদক্ষেপ ও বিনা জামানতে ঋণ সুবিধা প্রদানসহ সরকার প্রদেয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার উল্লেখ করেন।
কোনো রকম পরীক্ষায় একটা পাস করে চাকরির পেছনে না ছুটে যুব সমাজকে নিজের বস (প্রধান) নিজে হওয়ার মাধ্যমে আরও ১০ জনের কর্মসংস্থানে এগিয়ে আসার জন্য আত্মবিশ^াস নিয়ে এগিয়ে যাবারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ বিশ^ব্যাপী যুদ্ধাবস্থার জন্য খাদ্য ক্রয়মূল্য এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির কারণে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষদের অসুবিধা হওয়ার কথা উল্লেখ করে সারাদেশের প্রতি ইঞ্চি জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনার মাধ্যমে সার্বিক উৎপাদন বাড়ানোয় তাঁর আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধনমন্ত্রী বলেন, টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়ার জনগণও পিছিয়ে থাকবে না। এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাসের পাশপাশি বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যারা নির্বাচিত চেয়ারম্যান মেম্বর আছেন তাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, আমরা অনেক প্রকল্প নিই এবং কাজ করি সেই কাজগুলো যাতে যথাযথভাবে হয়।

মানুষ যেন এই কাজের সুফল পেতে পারে এবং এর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই স্থানীয় সরকারের যে কাজগুলো সেগুলো আপনারা করবেন। কাজের মানটা যেন ঠিক থাকে এবং কাজগুলো যেন যথাযথভাবে হয়। যেভাবে কাজ করলে পরে দেশের মানুষের কল্যাণ হবে, দেশের মানুষের উন্নতি হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর আকাক্সক্ষার কথা তুলে ধরে বলেন, আমার একটাই আকাক্সক্ষা শেষ জীবনে আমি টুঙ্গিপাড়ায় থাকব। যেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ঘুমিয়ে আছেন। তিনি বলেন, আজকে সংসদের অধিবেশন রয়েছে। যেখানে তাঁর প্রশ্নোত্তর পর্ব রয়েছে, যেটা তিনিই চালু করেছিলেন। কারণ তিনি মনে করেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নিজেরও একটা জবাবদিহিতা থাকা দরকার। তিনি পর্যায়ক্রমিকভাবে তাঁর এলাকার জনগণকে ভাগ ভাগ করে সংসদ অধিবেশন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দেবেন বলেও উল্লেখ করেন।

বঙ্গবন্ধু কন্যা এ সময় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি এবং ছোট বোন শেখ রেহানা বাড়িটিকে দান করে দিয়েছেন। যেটি একটি জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছে।  যেখানে দেশ-বিদেশের মানুষ আসেন সেটা দেখার জন্য। আমি মনে করি আমাদের এলাকার লোকজনেরও এটা দেখার দরকার।

কারণ আপনারা এমন একটা জায়গা থেকে এসেছেন যেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেখানেই ঘুমিয়ে আছেন। কাজেই তাঁর জীবন যাপন, ’৭৫ এর মর্মান্তিক হত্যাকা-, যেখান থেকেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন-এসব অনেক কিছুই জানতে পারবেন আপনারা সেই বাড়িতে গেলে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন কাজেই আমার একটাই দায়িত্ব এই দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো আর মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা। আর সেই কাজটা আমি যে নিশ্চিন্তে করতে পারছি, সেটা করতে পারছি কেবল আপনাদের জন্য। কারণ আপনারা আমাকে সেই সুযোগটা করে দিয়েছেন। কারণ আমার সব দায়িত্ব তো আপনারাই নিয়েছেন।

আমার কোনো কষ্ট নেই। আমার মনে হয় এই দায়িত্বটা যদি আপনারা না নিতেন বাবা মা ভাই হারিয়েছি। আমার জন্য আমার হয়ে বলার কে আছে? কিন্তু আজকে আপনারা আমাকে সেই সাহস দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন। যার জন্য আমি নিশ্চিন্ত মনে দেশের কাজ করতে পারছি। দেশের মানুষের কাজ করতে পারছি । 
তিনি বলেন, আমার এলাকায় নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমিটি করা থেকে শুরু করে যেভাবে আপনারা কাজ করেছেন এটা সারা বাংলাদেশের  সমস্ত প্রার্থীর জন্য একটা দৃষ্টান্ত হয়ে গেছে এবং আমাদের অনেক প্রার্থীও তা অনুসরণ করেছেন।

×