ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

সৌদি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

আশার বাতিঘর ॥ পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩:৩৬, ৬ ডিসেম্বর ২০২৩

আশার বাতিঘর ॥ পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নবনির্মিত ‘পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল’কে আশার বাতিঘর হিসেবে মন্তব্য করে বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল প্রকল্পটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশার বাতিঘর। স্বয়ংসম্পূর্ণ এই আধুনিক টার্মিনালটি আমাদের বন্দরের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করবে এবং নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য সহজতর করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পথও সুগম করবে। 
বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নবনির্মিত ‘পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল’ পরিচালনার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) ও রেডসি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসডিটিআই) এর মধ্যে কনসেশন চুক্তি সই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন,  এটি বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করবে এবং আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের নতুন সুযোগ উন্মুক্ত করবে। আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের অপেক্ষায় আছি যেখানে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির একটি চালিকা শক্তি হয়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) এবং সৌদি আরবের কোম্পানি রেডসি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) এর মধ্যে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘কনসেশন চুক্তি’ বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ বাড়াতে আরও সহায়ক হবে। এই ‘কনসেশন চুক্তি’ আমাদের দুই দেশের যৌথ স্বপ্নের এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সমৃদ্ধির প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের প্রমাণ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সৌদি বিনিয়োগ মন্ত্রী খালিদ আল ফালিহের উপস্থিতিতে সিপিএ চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল এবং ‘আরএসজিটি’-র সিইও জিন্স ও ফোলি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর আগে সৌদি মন্ত্রী সকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, সৌদি বিনিয়োগ মন্ত্রী খালিদ আল ফালিহ এবং আরএসজিটি চেয়ারম্যান আমের এ. আলী রেজা বক্তব্য রাখেন। উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। এ সময়ে বাংলাদেশে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত এসা বিন ইউসুফ আল দুহাইলান ছাড়াও সৌদি ও বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু আমরা এই ‘কনসেশন  চুক্তি’ স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করছি, তাই আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের অপেক্ষায় আছি যেখানে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, আরএসজিটি আগামী ২২ বছরের জন্য পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনা করবে। এটি বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করবে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য একটি আশার আলো। স্বনির্ভর এই আধুনিক টার্মিনাল বন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে, নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য সহজ করবে এবং কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি করবে। এটি বিশ্ব বাণিজ্যের একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করবে। আমাদের ব্যবসার জন্য বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, টার্মিনালটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করবে। কারণ, ভারত, ভুটান এবং নেপালও এই টার্মিনাল ব্যবহার করতে পারবে। আর পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালে সৌদি আরবের বিনিয়োগ বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবকে বন্ধুপ্রতিম দেশ এবং বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, সৌদি আরবের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা রয়েছে। আমরা সব সময়ই সৌদি আরবকে আমাদের হৃদয়ের কাছাকাছি পেয়েছি।
শেখ হাসিনা বলেন, আরএসজিটি সৌদি সরকার কর্তৃক মনোনীত একটি স্বনামধন্য গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটর। তিনি পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের কারণে সৌদি সরকারকে তার  আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার স্বীকৃতি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আশা করি জেদ্দা বন্দর এবং অন্যান্য টার্মিনাল পরিচালনার জন্য খ্যাতি অর্জনকারী আরএসজিটি পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালও তার দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সঙ্গে পরিচালনা করবে। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আরও দক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণ হবে বলেও উল্লেখ করেন সরকার প্রধান। তিনি বলেন, এর ফলে, আমাদের অর্থনীতি আমদানি-রপ্তানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হ্রাস থেকে উপকৃত হবে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি আস্থা ও সহযোগিতার জন্য বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃঢ় সমর্থনের জন্য সৌদি বিনিয়োগ মন্ত্রী ও তার প্রতিনিধিদলকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আপনার প্রতিশ্রুতি গভীরভাবে প্রশংসিত।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, আরএসজিটিআই যে সুনামের সঙ্গে জেদ্দা পোর্ট টার্মিনালসহ অন্যান্য টার্মিনাল পরিচালনা করছে, সেই দক্ষতা ও প্রযুক্তিজ্ঞান কাজে লাগিয়ে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালটি পরিচালনা করবে বলে আমি আশা করি। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হবে। 
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) সৌদি আরবের কোম্পানি রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) এর সঙ্গে পিপিপি-জিটুজি ভিত্তিতে পরবর্তী ২২ বছরের জন্য নবনির্মিত পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনায় এই ‘কনসেশন এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নবনির্মিত ‘পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল’ সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বে (জি২জি) ভিত্তিতে পরিচালনা করবে রেড সী গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই)।

রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) সৌদি সরকার মনোনীত একটি স্বনামধন্য গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটর। জেদ্দা পোর্ট টার্মিনালসহ বিশ্বের বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনা করছে আরএসজিটিআই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আরএসজিটিআই আগামী ২২ বছরের জন্য পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালটি পরিচালনা করবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হবে। দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি লাভবান হবে।
দু’দেশের সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ ॥ বাংলাদেশ ও সৌদি আরব দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সৌদি বিনিয়োগমন্ত্রী খালিদ এ আল-ফালিহের মধ্যে বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ আনন্দানুভূতি ব্যক্ত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বৈঠকের পরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। সৌদি মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়ন বিশেষ করে নারী উন্নয়নের প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধিরও প্রশংসা করেন।
পায়রা বন্দর এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গত বছর আকওয়া পাওয়ার এবং বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে সৌদি আরবের বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে আকওয়া পাওয়ার এর আগে ১০০০ মেগাওয়াট সৌর ফটোভোলটাইক শক্তি উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ২শ’ মেগাওয়াট প্রকল্পের জন্য পায়রা বন্দরে ৬শ’ একর জমি বরাদ্দ করেছে, আকওয়া পাওয়ার এ বিষয়ে কাজ করছে।
এ সময় দুই নেতা ফিলিস্তিন ইস্যু এবং গাজায় মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনে সহায়তা পাঠিয়েছে।
সৌদি বিনিয়োগমন্ত্রী খালিদ এ আল-ফালিহ প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ এবং ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের শুভেচ্ছা জানান।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান রহমান, অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ মো. জিয়াউদ্দিন এবং নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল পরিদর্শনে সৌদি প্রতিনিধি দল ॥ চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনায় সৌদি রেড সি গেটওয়ের চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রতিনিধি দল দুপুরে একটি বিশেষ বিমান ও দুটি হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রামে পৌঁছেন। চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে তাদেরকে সরাসরি নেওয়া হয় নবনির্মিত পিসিটিতে। সংক্ষিপ্ত সফরে এসে তারা টার্মিনাল পরিদর্শন করেন। 
এ সময় সৌদি বিনিয়োগ বিষয়কমন্ত্রী খালিদ এ আল ফালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের এগিয়ে চলার প্রক্রিয়ার ভূয়সী প্রশংসা করেন। বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর তাদের আস্থার কথা। 
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সাবেক বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি মন্ত্রীর বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়া আরও বেশকিছু খাতে সৌদি সরকারের বিনিয়োগের বিষয় নিয়ে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হয়েছে।
পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে সৌদি বিনিয়োগ বিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল দুপুরের মধ্যেই বিশেষ বিমানে হংকংয়ের উদ্দেশে চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন।

×