ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই ৩ ডিসেম্বর আজ

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ 

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ০০:৪৭, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ 

ট্যাঙ্কসহ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে মিত্রবাহিনী। হাত উঁচিয়ে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে সাধারণ মানুষ। ১৯৭১ সালে বগুড়া অঞ্চল থেকে তোলা ছবি 

মুক্তিযুদ্ধের একেবারে গোড়াতেই বাংলাদেশের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। দেশটির জনগণ, সরকার, সর্বোপরি সেনাবাহিনী বাঙালির জনযুদ্ধে নানাভাবে সহায়তা করে আসছিল। তবে প্রকাশ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার প্রেক্ষাপটটি রচিত হয়েছিল আজকের দিনে, অর্থাৎ, ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। ওই দিন আকস্মিকভাবে ভারতে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। সঙ্গত কারণেই মারাত্মক ফুঁসে ওঠে ভারত। কাল বিলম্ব না করে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়।

তবে একা নয়, আক্রমণ তীব্র ও সফল করতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড গঠন করা হয়। তখন থেকেই প্রকাশ্যে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ শুরু করে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী। পূর্ব সীমান্তে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানের চূড়ান্ত পর্যায়ে শত্রুমুক্ত হয় বাংলাদেশ। মাসের মাঝামাঝি সময়ে ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়ায় বাঙালির প্রথম কোনো জাতিরাষ্ট্র। 
তার আগে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলে জন্ম নেয় পাকিস্তান। নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ, শোষণ-নির্যাতন শুরু করে। বাঙালি এসবের প্রতিবাদ করলে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। এক পর্যায়ে অনিবার্য হয়ে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রাম। জনযুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে অবিসংবাদিত এই নেতাকে আটক করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তারই যোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।

প্রথম থেকেই বন্ধুরাষ্ট্র ভারতকে পাশে পান তিনি। পাকিস্তানিরা গণহত্যা শুরু করলে এক কোটির মতো মানুষকে আশ্রয় দেন মানবিক আত্মার প্রতীক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। একই সময় অস্ত্র এবং ট্রেনিং দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। ট্রেনিং শেষে সংগোপনে দেশে ঢুকে পাকিস্তানিদের নাস্তানাবুদ করছিলেন বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। বিশ্লেষকদের মতে, এ অবস্থায় বিশ্ববাসীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে পাকিস্তান। তারা বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে বলার চেষ্টা করে, যুদ্ধ হচ্ছে ভারতের সঙ্গে। মূলত এই বার্তা দিতেই ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর একযোগে ভারতের ১১টি বিমানঘাঁটিতে বোমা হামলা চালায় তারা।  
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন কলকাতায়। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে জনসভা ছিল তার। হামলার খবরে তৎক্ষণাৎ রাজধানী দিল্লিতে ফিরে যান তিনি। গভীর রাতে বেতারে কণ্ঠ বেজে ওঠে তার। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ভারতে জরুরি অবস্থা জারির কথা জানান তিনি। ঘোষণা দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের যুদ্ধ এখন ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের আক্রমণ ঐক্যবদ্ধভাবেই প্রতিহত করতে হবে।  
‘ঐক্যবদ্ধভাবে’ বলায় বিশ্ববাসীর কাছেও পরিষ্কার হয়ে যায়, এখন থেকে বাংলাদেশ-ভারত একসঙ্গে লড়বে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এভাবে  ৩ ডিসেম্বরের ঘটনা মুক্তি ও মিত্রবাহিনীকে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার সর্বাত্মক লড়াই শুরু হয়ে যায় ওই দিন থেকেই। 
একাত্তরের যুদ্ধ নিয়ে ভারতীয় জেনারেলদের লেখা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানিদের হামলার ব্যাপারে আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন তারা। জানতেন, এমনটি হতে পারে। তাই পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি অনেকটাই সেরে রেখেছিলেন। ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় বাংলাদেশে ঢুকে পড়া সম্ভব হয়। প্রথমেই পাকিস্তানিদের অবস্থানগুলো ঘিরে ফেলার কাজ করেন তারা। সে অনুযায়ী, সাতটি অঞ্চল দিয়ে চালানো হয় আক্রমণ। রাতেই ঢাকা এবং আশপাশ এলাকার পাকিস্তানি ঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো হয় বিমান আক্রমণ। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে আঘাত হানে। চট্টগ্রামের পেট্রোল পাম্পও বিমান বাহিনীর আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থলপথেও দারুণ সক্রিয় ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। সেতু, কালভার্ট ইত্যাদি বোমা মেরে উড়িয়ে দিচ্ছিলেন তারা। 
এভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল পাকিস্তানি সেনারা। আটকা পড়ছিল যে যার জায়গায়। বরগুনায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে দিশেহারা হয়ে যায় পাকিস্তানিরা। আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। মুক্ত হয় বরগুনা জেলা। কুমিল্লার মিয়াবাজারে পাকসেনাদের ওপর হামলা চালায় মুক্তিবাহিনী। ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর সহযোগিতায় মিয়াবাজার দখল করে নেন তারা। আখাউড়ার আজমপুর স্টেশনে দিনভর যুদ্ধ হয়। সিলেটের ভানুগাছায় শেষ পর্যন্ত লড়ে শহীদ হন ১৭ বীর মুক্তিযোদ্ধা। নোয়াখালীতেও চলছিল সম্মুখযুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল সোনাইমুড়ী মুক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর তারা চৌমুহনীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যায়। আক্রমণ চালায় পাকবাহিনীর ওপর।

রংপুরের পলাশবাড়ীতে ১২ পাকসেনা আত্মসমর্পণ করে। সাতক্ষীরা থেকে পিছু হটে দৌলতপুরের দিকে যায় পাকবাহিনী। পাকিস্তান এয়ারলাইন্স পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে সব ফ্লাইট বাতিল করে। এভাবে দ্রুতই মোড় ঘুরে  যেতে থাকে যুদ্ধের। পিছু হটতে থাকে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী। মাত্র ১৩ দিনের মাথায় তারা লেজ গুটাতে বাধ্য হয়। এসব কারণে ৩ ডিসেম্বর অন্য অনেক দিন থেকে আলাদা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শুধু স্মরণীয় নয়, নতুন করে জেগে ওঠার অনুপ্রেরণা ৩ ডিসেম্বর।

×