ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০

নওগাঁ জেলা

নৌকার মাঝিরা মাঠে, অন্য প্রার্থীদের তৎপরতা নেই

বিশ্বজিৎ মনি, নওগাঁ

প্রকাশিত: ০০:০৬, ২৯ নভেম্বর ২০২৩

নৌকার মাঝিরা মাঠে, অন্য প্রার্থীদের তৎপরতা নেই

নওগাঁর ছয়টি আসনে নৌকার মাঝি হতে ৪৫ নেতা মনোনয়ন চেয়েছিলেন

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নওগাঁর ছয়টি আসনে নৌকার মাঝি হতে ৪৫ নেতা মনোনয়ন চেয়েছিলেন। এত মনোনয়ন প্রত্যাশীর মধ্যে কোন ছয়জন হচ্ছেন নৌকার মাঝি তা নিয়ে শুরু হয়েছিল জল্পনা-কল্পনা। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান হয়েছে। মনোনয়নের দৌঁড়ে চারটি আসনে বর্তমান এমপি বহাল থাকলেও দুজনের কপাল পুড়েছে। নওগাঁ-৩ আসনে নতুন মুখ সাবেক সিনিয়র সচিব, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তী সৌরেন। নওগাঁ-৪ আসনে নৌকার মাঝি মান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাহিদ মোর্শেদ বাবু। আসনটিতে বাবা-ছেলে মনোনয়ন চেয়েও পাননি।মনোনয়ন পাওয়ায় নৌকার মাঝিরা ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছেন। তবে অন্য দলের প্রার্থীদের তৎপরতা তেমন একটা চোখে পড়ছে না।

নওগাঁ-১ ॥ ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা সংসদীয় আসন নওগাঁ-১। নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনের ভোটার চার লাখ ৪৮ হাজার ৯০১ জন। এবার ভোটকেন্দ্র বাড়ছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। এই আসনে পরপর তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। এবার একাধিক প্রার্থী নৌকার মনোনয়নের আশায় মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
নওগাঁ-১ আসন থেকে ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী ছালেক চৌধুরীকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাধন চন্দ্র মজুমদার। আর ২০১৪ সালে এমপি হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন সাধন চন্দ্র। এরপর থেকেই স্থানীয় নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করে এবং এলাকায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেন।
এমপি হয়ে এলাকার উন্নয়নে মনোযোগ দেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। এলাকার চাহিদা মোতাবেক প্রায় সব ধরনের উন্নয়ন করেছেন তিনি। এলাকায় সাধন চন্দ্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বললেই চলে। এদিকে নওগাঁ-১ আসনে সাধন চন্দ্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে থাকবেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মো. আকবর আলী। 
নওগাঁ-২ ॥ এক সময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি ছিল নওগাঁ-২ (ধামইরহাট-পত্নীতলা)। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে শাসন করছে আওয়ামী লীগ। বর্তমান সংসদ সদস্য ও সংসদের আইন, বিচার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি শহীদুজ্জামান সরকার (বাবলু) ১৯৯১ সালে বিএনপির আব্দুর রউফ মান্নানকে হারিয়ে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর কাছে হেরে যান তিনি। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মো. সামসুজ্জোহা খানকে পরাজিত করে নৌকা প্রতীকে বিজয়ী হন। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও বিজয়ী হন তিনি।

দীর্ঘ ১৫ বছর একনাগাড়ে ক্ষমতায় থাকার কারণে তিনি ধামইরহাট ও পত্নীতলা এলাকায় একটি নির্দিষ্ট বলয় তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। সরকারের উন্নয়নের পাশাপাশি দলের একসময়ের বলিষ্ঠ ও ত্যাগী নেতাদের কৌশলে কমিটি থেকে বাদ দিয়ে তাদের কোণঠাসা করে রাখার অভিযোগ ছিল এমপি শহীদুজ্জামানের বিরুদ্ধে। আর এ কারণে ওই সব নেতাকর্মীর মনে বিরাজ করছিল চাপা ক্ষোভ। এ কারণে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার আশায় আরও পাঁচজন নৌকা প্রতীক চেয়েছিলেন। অবশেষে তিনিই বহাল থাকলেন।

আসনটিতে জাপা মো. তোফাজ্জল হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছে। লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
নওগাঁ-৩ ॥ বর্তমান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দীন তরফদার সেলিম নিজের আসন পাকাপোক্ত করার জন্য দলের দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের কৌশলে দূরে রেখে স্বজনপ্রীতি ও বিএনপি-জামায়াত সদস্যদের দলীয় পদ দিয়ে অনুগতদের নিয়ে পকেট কমিটি গঠন করেছেন বলে অভিযোগ কয়েকজন সিনিয়র নেতাকর্মীর। এ কারণে দলের সিনিয়র নেতাকর্মীদের সঙ্গে বর্তমান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দীন তরফদারের দূরত্ব বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন থাকলেও নেতাদের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকা-ে বিভেদ সৃষ্টি ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।
এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন তোলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দীন তরফদার সেলিম ও তার ছেলে সাকলাইন মাহমুদ রকি। এছাড়াও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী সৌরেনসহ চারজন। এমপি ছলিম নাও পেতে পারেন এমন ধারণা থেকে তার ছেলেকে দিয়েও মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। তারপরও আসনটির নৌকার হাল ধরে রাখতে পারলেন না বাবা-ছেলে কেউই।
দলীয় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কাছে সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তী ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হিসেবে পরিচিত লাভ করেছেন। তিনি কর্মজীবন থেকেই বদলগাছী ও মহাদেবপুর উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন।
দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় কেমন লাগছে জানতে চাইলে সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তী বলেন, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা আমাকে যে আশা নিয়ে নৌকার মনোনয়ন দিয়েছেন, আমি জনগণের ভোটে জয়লাভ করে সেই আসনটি অবশ্যই তাকে উপহার দিতে পারব। কারণ আমার সঙ্গে জনগণের ভালোবাসা আছে। অন্যদিকে এই আসনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন মাসুদ রানা।
নওগাঁ-৪ ॥ জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা মান্দা ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এটি নওগাঁ-৪ এবং জাতীয় সংসদের ৪৯ নম্বর নির্বাচনী এলাকা। এই আসন থেকে ছয়বার নির্বাচিত হয়েছেন বর্তমান এমপি এবং সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক (৮৪)। বয়সের কারণে ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিকের পক্ষে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া খুব সহজ হবে না বলে মনে করছিলেন দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। যার কারণে এই আসনে বাবা-ছেলেসহ দলের ১২ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন।

ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক ও তার ছেলে শাফায়াত জামিল (সৌরভ) মনোনয়নপত্র তুলেছিলেন। স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, নিজেদের মধ্যে দলীয় মনোনয়ন ধরে রাখার কৌশল হিসেবে বাবা-ছেলে মনোনয়নপত্র নেন। বাবা-ছেলেও ধরে রাখতে পারলেন না নৌকার হাল। আসনটিতে মান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাহিদ মোর্শেদকে (বাবু) নৌকার মাঝি করা হয়। এই আসনে জাপার মনোনয়ন পেয়েছেন মো. আলতাফ হোসেন।

নওগাঁ-৫ ॥ আসনটি থেকে (সদর আসন) আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন অর্ধডজন নেতা। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচন বিএনপির প্রার্থী জাহিদুল ইসলামকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুল জলিলের ছেলে নিজাম উদ্দিন জলিল জন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আধিপত্য নিয়ে দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। এই আসনে দলের মধ্যে সংসদ সদস্য বিরোধী একটি শক্তিশালী বলয় দাঁড়িয়েছিল। তারপরও মনোনয়ন যুদ্ধে নিজাম উদ্দিন জলিল জন বহাল থাকলেন। শেষ সময়ে প্রতিটি এলাকায় গিয়ে সভা-সমাবেশ, দলকে সুসংগঠিত করা এবং উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য শেখ হাসিনা আবারও তাকে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এদিকে মো. ইফতারুল ইসলাম বকুলকে মনোনয়ন দিয়েছে জাপা।
নওগাঁ-৬ ॥ রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলা নিয়ে নওগাঁ-৬। ২০০৬-০৭ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষের দিকে আলমগীর কবির এলডিপিতে গেলে অভিভাবকহীন বিএনপির হাল ধরেন আলমগীর কবিরের আপন ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন বুলু। দল থেকে মনোনয়ন পান বুলু। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন তৎকালীন ঢাকা মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসরাফিল আলম। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও আসনটি দখলে রাখেন ইসরাফিল আলম।

ইসরাফিল আলম ২০২০ সালের ২৭ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর উপনির্বাচনে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হেলালকে নৌকার মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচিত হন। হেলাল জয়ী হওয়ার পর সাংগঠনিকভাবে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য তিনি আবারও পেয়েছেন বলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করছেন। এদিকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন আবু বেলাল হোসেন।

×