ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়ছে বিদেশীদের

বঙ্গোপসাগর হতে যাচ্ছে শিপিং হাব

হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস

প্রকাশিত: ২২:৫৩, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩

বঙ্গোপসাগর হতে যাচ্ছে শিপিং হাব

বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়ছে বিদেশীদের

আঞ্চলিক ও ভূ-বাণিজ্যিক উপযোগিতায় ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে হতে যাচ্ছে শিপিং বাণিজ্যের হাব। ফলে বিদেশীদের আগ্রহ বাড়ছে দেশের সমুদ্র বন্দরগুলোর প্রতি, বৃদ্ধি পাচ্ছে বিনিয়োগের আগ্রহ। চট্টগ্রাম বন্দরে অবকাঠামো নির্মাণ ও টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহী কয়েকটি দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বন্দর-সংশ্লিষ্টরা। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সরকার।  বাংলাদেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম, যার মাধ্যমে ৯২ শতাংশ আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য হয়ে থাকে। সঙ্গত কারণেই এ বন্দরের প্রতি বিদেশীদের আগ্রহ বেশ আগে থেকেই।

কিন্তু পদ্মা সেতু চালু হয়ে যাওয়ার পর আকর্ষণ বেড়েছে মোংলা বন্দরেরও। ইতোমধ্যেই এ দুই বন্দর ব্যবহার করে বাণিজ্যিক কর্মকা- পরিচালনায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে ভারত। ফলে মোংলা বন্দরও এখন পছন্দের তালিকায়। বিশেষ করে ভারত এবং চীন উভয় দেশই মোংলায় বিনিয়োগে আগ্রহী। বিদেশীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ নিয়ে কিছু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির নিরিখে এটিকে দেখা হচ্ছে অপার সম্ভাবনার হাতছানি হিসেবে।  দেশের আমদানি রপ্তানির সিংহদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর, যা বছরে গড়ে ৩ মিলিয়ন কন্টেনার হ্যান্ডলিং করছে।

শিল্পায়নের ফলে আমদানি রপ্তানি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যেও সক্ষমতা দেখাতে সক্ষম হচ্ছে এই বন্দর। কিন্তু দক্ষতা আরও বাড়াতে বিশ^ব্যাংকসহ শিপিং সেক্টরের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সুপারিশ রয়েছে টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদেশী অপারেটর ও বিনিয়োগকারীদের সংযুক্ত করার। কেননা পৃথিবীর সকল উন্নত বন্দর চলে ‘ল্যান্ডলর্ড’ মডেলে। অর্থাৎ বন্দর থাকে শুধু নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। আর অপারেশনাল কর্মকা- পরিচালিত হয় বেসরকারি খাতে। এরফলে ব্যয় কমার পাশাপাশি বাড়ে দক্ষতা। 
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশীদের আগ্রহকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে সরকার। প্রক্রিয়া চলছে অন্তত তিনটি টার্মিনালে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের। বিদেশীদের দিয়ে পরিচালনার জন্য যে তিনটি টার্মিনাল তালিকাভুক্ত রয়েছে সেগুলো হচ্ছে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল (পিসিটি), নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং নির্মাণাধীন মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের টার্মিনাল। এছাড়া সাগরপাড়ের বে-টার্মিনালও গড়ে উঠবে বিদেশী অর্থায়নে। এ টার্মিনালেও নিয়োগ পাবে আন্তর্জাতিক অপারেটর। 
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি মাহবুবুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের লক্ষ্য ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। বন্দরে বিদেশীদের আগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ ভূ-বাণিজ্যিক বিবেচনায় বঙ্গোপসাগর ঘিরে অপার সম্ভাবনা। বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার গেটওয়ে। বিদেশী শিপিং সংস্থাগুলোর কাছে চট্টগ্রাম বন্দর দিন দিন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মোংলা ও পায়রা বন্দরের দিকেও পড়েছে সুদৃষ্টি।

আন্তর্জাতিক অপারেটর নিযুক্ত হলে বন্দরগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। তবে বিদেশীদের পাশাপাশি আমাদের দেশীয় অপারেটরদের প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকা প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী সমাজের এই নেতা। তিনি বলেন, আমরা চাই প্রতিযোগিতামূলকভাবে কম খরচে উন্নত সেবা। চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক অপারেটর দিয়ে বন্দরের প্রথম টার্মিনাল হতে যাচ্ছে পিসিটি। এতে নিয়োগ পেতে আগ্রহ দেখিয়েছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে, দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড ও ডেনমার্কের এপি মুলার। তবে এগিয়ে রয়েছে সৌদি প্রতিষ্ঠানটি। এ ব্যাপারে বোঝাপড়া অনেকটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতাধর তেলসমৃদ্ধ এ দেশটির কোনো প্রতিষ্ঠান এ দায়িত্ব পেলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও চলে যাবে অন্য উচ্চতায়। সুদূরপ্রসারী বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত রেড সি গেটওয়ে পিসিটির দায়িত্ব পেতে পারে। 
বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালটি নির্মিত হয় ২০০৭ সালে। বন্দরের অর্থে ৫৬৬ কোটি টাকায় নির্মিত হওয়ায় এ টার্মিনালটি অলস পড়েছিল। পরে এডহক ভিত্তিতে এর দুটি জেটির কাজ শুরু করে দেশীয় অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। ২০১৫ সালে টেন্ডারের মাধমে চারটি জেটি পরিচালনার দায়িত্ব পায় সাইফ পাওয়ারটেক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এখন এনসিটিতেও আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের আরেক মেগা প্রকল্প বে-টার্মিনাল। এটি নির্মাণের জন্য সমীক্ষা কাজ চালাচ্ছে দক্ষিণ কোরীয় দুই প্রতিষ্ঠান কুনহুয়া কনসাল্টিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডি ওয়াই ইঞ্জিনিয়ারিং। রিপোর্ট পাওয়ার পর সে ভিত্তিতে এর মূল কাজ শুরু হয়ে যাবে।

এ টার্মিনালের মোট তিনটি অংশ হবে। এর মধ্যে একটি  পরিচালনা করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ নিজেই। অপর দুটির মধ্যে একটি দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং আরেকটি সিঙ্গাপুরের পিএসএ পরিচালনা করবে। এ টার্মিনালের প্রায় পুরোটাই হবে বিদেশী বিনিয়োগে। বে-টার্মিনালের জন্য ব্রেকওয়াটার নির্মাণে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই সম্মতি দিয়েছে বিশ^ব্যাংক। ব্রেকওয়াটার নির্মাণ করবে জার্মানির প্রতিষ্ঠান শেল হর্ন হামবুর্গ। টার্মিনালটি আসলে হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন একটি বন্দর, যেখানে জাহাজ ভেড়াবার জন্য বিদ্যমান বন্দরের মত জোয়ার ভাটার ওপর নির্ভর করতে হবে না। 
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক জনকণ্ঠকে জানান, বে-টার্মিনালের সমীক্ষার কাজ শেষ পর্যায়ে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কোরীয় প্রতিষ্ঠান অল্প  কিছুদিনের মধ্যেই এর ডিজাইনের কাজ সম্পন্ন করবে। এরপর শুরু হয়ে যাবে মাঠ পর্যায়ের আসল কাজ। টার্মিনাল নির্মাণের জন্য যে ভূমি জটিলতা ছিল তা আর নেই। এ টার্মিনালটি নির্মিত হয়ে গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরও অনেক বেড়ে যাবে।  
প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বে টার্মিনালের জন্য ৫০০ একর খাস জমির ব্যবস্থা হয়ে গেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ নামমাত্র মূল্যে এই খাস জমি চেয়েছে। ভূমি পাওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো ঝামেলা নেই। তবে মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি এখন বাকি আছে। টার্মিনালের জন্য আরও ৩শ’ একর ভূমি নেওয়া হবে। তবে মামলাজনিত জটিলতা থাকায় এক্ষেত্রে কিছুটা দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। কিন্তু এই তিনশ’ একর ছাড়াই টার্মিনালের কাজ এগিয়ে নিতে সমস্যা নেই। কারণ ব্রেকওয়াটার, জেটিসহ মূল স্থাপনাগুলো হবে সাগর থেকে রি-ক্লেইম করা ভূমিতে। 
সম্ভাবনার আরেকটি প্রকল্প পতেঙ্গার লালদিয়ার চর কন্টেনার টার্মিনাল। সেখানে তিন বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ড্যানিশ শিপিং জায়ান্ট মার্কস লাইনের পক্ষ থেকে। ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রধানমন্ত্রীও আশ^াস দিয়েছেন। ডেনমার্কের এই প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।   শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশে ১০০টি ইকোনমিক জোন নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার, যার অনেকগুলোই এখন দৃশ্যমান।

×