ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ঢাকা-১

সালমান এফ রহমান শক্ত অবস্থানে পুনরুদ্ধারে মাঠে বিএনপি, জাপা

সুজন খান, দোহার

প্রকাশিত: ০০:১৪, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩

সালমান এফ রহমান শক্ত অবস্থানে পুনরুদ্ধারে মাঠে বিএনপি, জাপা

দক্ষিণ দোহার ও নবাবগঞ্জ  এই দুটি উপজেলা মিলে ঢাকা-১ আসন গঠিত

দক্ষিণ দোহার ও নবাবগঞ্জ  এই দুটি উপজেলা মিলে ঢাকা-১ আসন গঠিত। বিগত দিনে এই দুটি উপজেলা ঢাকা-১ ও ঢাকা-২ আসনে বিভক্ত ছিল। আর সে সময় এই দুই আসনই ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ঘাঁটি। তবে সময়ের ব্যবধানে পাল্টে গেছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ঢাকা-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরই বদলে গেছে সম্পূর্ণ দৃশ্যপট।
এক সময়ের বিএনপির দুর্গ বর্তমানে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। আগামী নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী সালমান এফ রহমান। তার নেতৃত্বে দোহার-নবাবগঞ্জ উপজেলার আওয়ামী লীগ একাট্টা, আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। অন্যদিকে বিএনপিও বসে নেই। দলটি চায় আসনটি পুনরুদ্ধার করতে। বড় দুই দলের একক প্রার্থীর বিপরীতে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক শক্তি কমতি নেই। দু’দলের ভোটের হিসাবের অঙ্কে ভাগ বসাতে চায় জাতীয় পার্টি।
বিগত ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে দোহার উপজেলা নিয়ে ছিল ঢাকা-১ আসন। নির্বাচনে বিএনপি থেকে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ও আওয়ামী লীগ থেকে মাহবুবুর রহমান লড়াই করেন। নির্বাচনে নাজমুল হুদা ভোট পান ৫৫ হাজার ১৫২ ভোট। অপরদিকে মাহবুবুর রহমান পান ৩১ হাজার ২৪৫ ভোট। ফলে ২৩ হাজার ৯০৭ ভোটের ব্যবধানে নাজমুল হুদা বিজয়ী হন। বিএনপি সরকার গঠন করলে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত নাজমুল হুদা বিএনপি সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন।
২০১২ সালের ৬ জুন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন। ২০১২ সালের ১০ আগস্ট নাজমুল হুদা ও আবুল কালাম মিলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনএফ) নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। কিন্তু কয়েক মাস পর আবুল কালাম বিএনএফ থেকে নাজমুল হুদাকে বহিষ্কার করেন। ২০১৪ সালের ৭ মে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় জোট নামে একটি জোট গঠন করেন এবং ২১ নভেম্বর তিনি ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার পার্টি’ গঠন করেন। ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর নাজমুল হুদা তৃণমূল বিএনপি নামে আরও একটি নতুন দল গঠন করেন।

অপরদিকে, নবাবগঞ্জ উপজেলা ছিল ঢাকা-২ আসন। এ আসন থেকে আব্দুল মান্নান বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১৯৯১- ২০০১ সাল পর্যন্ত পর পর চারবার এমপি নির্বাচিত হন। তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, ঢাকা জেলা বিএনপি সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক এমডিও ছিলেন। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই থেকেই দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলা ছিল বিএনপির দখলে।
পরবর্তীতে ওয়ান ইলেভেনের পর ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার দুটি আসনকে একটি আসনে রূপান্তর করা হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল মান্নানকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের আব্দুল মান্নান খান ৩৪ হাজার ৪২৩ ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করে প্রথমবারের মতো আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে নেন। এ সময় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করায় আব্দুল মান্নান খান গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। 
ফলে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকলেও ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইসুতে বিএনপি দল অংশ গ্রহণ না করায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুল মান্নান খানকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির সালমা ইসলাম।
এর পর সবশেষ ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে সালমান এফ রহমান ঢাকা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করেন। এ সময় জাতীয় পার্টির সালমা ইসলামও প্রার্থী হন। কিন্তু ওই দিন দুপুরেই নির্বাচন থেকে সালমা ইসলাম সরে দাঁড়ালে সালমান এফ রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। এর পর থেকেই বদলে গেছে এই আসনের সম্পূর্ণ দৃশ্যপট। 
এর আগে সালমান এফ রহমান নব্বইয়ের দশকে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আন্দোলন’ নামে একটি দল গঠন করেন। ১৯৯৬ সালে এ দলের হয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশও নিয়েছিলেন, কিন্তু জিততে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচন করে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার কাছে পরাজিত হন। এই আসন থেকে সালমান এফ রহমান এমপি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বড় বড় প্রকল্পের অনুমোদন, পদ্মা বাঁধ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, স্কুল কলেজের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুব কাছের ও আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব হওয়ায় দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। 
অন্যদিকে, বিএনপিও মনে করছে বিগত দিনের তুলনায় বর্তমানে আরও বেশি সমর্থক সৃষ্টি হয়েছে তাদের। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক চাপ ও হামলা-মামলার কারণে বেশিরভাগ সমর্থক রয়েছেন নিরব ভূমিকায়। পাশাপশি জাতীয় পার্টিও ইতোমধ্যে এই আসনটিতে নিজেদের মতো গুছিয়ে নিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী সংসদ নির্বাচন আসন রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে লড়বে আওয়ামী লীগ। বিএনপি চেষ্টা করবে তাদের হারিয়ে যাওয়া আসন পুনরুদ্ধার করতে। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির লড়াইয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবে জাতীয় পার্টি।
আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সালমান এফ রহমানই আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী। অন্যদিকে, বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক ও ঢাকা জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সালমা ইসলাম। বড় এই তিন দলে বিকল্প বা বিদ্রোহী প্রার্থী নেই।
দোহার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সালমান এফ রহমানের বিকল্প কোনো প্রার্থী নেই এই আসনে। ইতোমধ্যেই সালমান এফ রহমান ঢাকা-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচনের জন্য মনোনীতও হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এমপি হওয়ার পর থেকেই এই আসনটিতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। দু’টি উপজেলায় আমরা সফলভাবে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে সক্ষম হয়েছি। সাংগঠনিকভাবেও আমরা শতভাগ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রয়েছি। আগামী নির্বাচনে তিনি আবারও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন। কারণ তিনি জনগণের জন্য কাজ করেছেন।
অপরদিকে, ঢাকা-১ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক। তিনি দীর্ঘদিন নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে মাঠে রয়েছেন। খন্দকার আবু আশফাক ছাড়া বর্তমানে এই আসনটিতে বিএনপি থেকে বিকল্প বা মনোনয়ন প্রত্যাশী কোনো প্রার্থীই নেই।
আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক জানান, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নেবে না। যদি এ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করে তাহলে বিএনপিকেই ভোট দেবে জনগণ। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মানুষের জীবনে চরম দুর্বিষহ ও দুর্বিপাক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। জনগণ এর থেকে মুক্তি চায় ও মুক্তি পাওয়ার জন্যই বিএনপিকেই ভোট দেবে।
দোহার উপজেলা বিএনপির সভাপতি এসএম নজরুল ইসলাম মেছের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য বিগত ১৫ বছর যাবৎ আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি কখনই নির্বাচনে অংশ নেবে না। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দোহার ও নবাবগঞ্জ ঢাকা-১ এই আসনে আমাদের যথেষ্ট ভালো প্রস্তুতি রয়েছে। ইতোমধ্যেই দোহার ও নবাবগঞ্জ এই দু’টি উপজেলায় তৃর্ণমূল পর্যায়ে আমরা সফলভাবে আমাদের কমিটি গঠন করেছি। ফলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত।

অন্যদিকে, আগামী সংসদ নির্বাচনে সুবিধা নিতে চাইবে জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী হিসেবে ঢাকা জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি এ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম। যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। আর বিরোধী দল হিসেবে যখন জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহন করবে সেক্ষেত্রে একক প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১ আসনে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম তার মনোনয়ন নিয়ে লড়বেন এই আসনে।
নবাবগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মো. জুয়েল আহমেদ বলেন, এই আসনে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম একক প্রার্থী। তিনি ছাড়া এই আসনে কোনো বিকল্প বা বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে একশ’ ভাগ প্রস্তুত রয়েছে জাতীয় পার্টি। ইতোমধ্যেই দোহার ও নবাবগঞ্জ এই দু’টি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আমরা সফলভাবে আমাদের কমিটি গঠন করেছি।
ঢাকা-১ আসনের মধ্যে দোহার উপজেলায় রয়েছে একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়ন। এ উপজেলায় মোট ভোটার এক লাখ ৫১ হাজার ৭৭০ ভোট। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭৩ হাজার ১২০ এবং মহিলা ভোটার ৭৮ হাজার ৬৫০ জন। আর নবাবগঞ্জ উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন রয়েছে। এ উপজেলায় মোট ভোটার দুই লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৪৩ হাজার ৬৮৫ এবং মহিলা ভোটার এক লাখ ৪৪ হাজার ৯৫২ জন।

×