ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

জামালপুর-২

আওয়ামী লীগের কোন্দলের সুযোগ নিতে চায় বিএনপি

আজিজুর রহমান ডল, জামালপুর

প্রকাশিত: ২৩:৪২, ৩০ মে ২০২৩

আওয়ামী লীগের কোন্দলের সুযোগ নিতে চায় বিএনপি

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জামালপুর-২ (ইসলামপুর) আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী রাজনীতি

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জামালপুর-২ (ইসলামপুর) আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী রাজনীতি। শুরু হয়েছে আগাম নির্বাচনী প্রচার। এ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির (জাপা) দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নানামুখী প্রচারে সরগরম হয়ে উঠেছে উপজেলার রাজনীতি। মনোনয়নপ্রত্যাশী সম্ভাব্য প্রার্থীরা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের পাশাপাশি সামাজিক সেবামূলক কর্মকা-ে অংশ নিয়ে নিজেদের ইমেজ তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। 
২০০৯ সাল থেকে এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে। আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলের কারণে বর্তমান এমপি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়ায় এই আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। 
জামালপুর-২ (ইসলামপুর) ইসলামপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এ আসনের মোট ভোটার দুই লাখ ৬২ হাজার ৮৩১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৩৩ হাজার ৫৯০ জন। আর নারী ভোটার রয়েছেন এক লাখ ২৯ হাজার ২৪১ জন। 
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বর্তমান আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান এবং সংরক্ষিত আসনের সাবেক মহিলা এমপি মাহজাবিন খালেদ বেবী মোশাররফের মধ্যে দুটি গ্রুপ সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খানের পাশাপাশি এবারই প্রথমবারের মতো মনোনয়নপ্রত্যাশী তরুণ শিল্পপতি এস এম শাহীনুজ্জামান শাহীনের এলাকায় আগমনে নতুন করে বিভক্ত হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও টানা তিনবারের পৌর মেয়র আব্দুল কাদের শেখের প্রতিও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একাংশের আস্থা রয়েছে।

উপজেলা থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি একাধিক শিবিরে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগ। দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে এমপি ফরিদুল হক খানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামী লীগ কর্মীরা বলছেন, সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা আবারও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের আগে যদি দলীয় কোন্দল নিরসন না হয়, তবে সুযোগ নেবে জাতীয় পার্টি না হয় বিএনপি। 
তবে এলাকায় রাজনৈতিক অবস্থানের দিক দিয়ে এগিয়ে আছেন ফরিদুল হক খান এমপি। ইসলামপুর আসন থেকে টানা ছয়বার নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত হাজি রাশেদ মোশাররফ। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির দখলে যায় আসনটি। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব খুবই শক্তিশালী অবস্থায় থাকলেও একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী মাঠে সরব থাকায় এবার কে পাচ্ছেন নৌকা প্রতীক? এ নিয়ে এলাকায় চলছে ব্যাপক গুঞ্জন। 
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান এমপি জনকণ্ঠকে বলেন, এই আসনের সাধারণ জনগণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। উপজেলা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে খুবই সুসংগঠিত। আমি এবারও দলীয় মনোনয়ন চাইব। আগামী নির্বাচনে দল যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই মনোনয়ন দেবে। নৌকা যেখানে আমরা সেখানেই ভোট দিব। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে নৌকা প্রতীকের বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই। নেতাকর্মীদের মাঝে কিছুটা মান- অভিমান থাকতে পারে। কিন্তু দলে কোনো বিভক্তি আছে বলে আমি মনে করি না।
তবে মনোনয়নের দৌড়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান এমপিকে টপকাতে নিয়মিতভাবেই বছর দুয়েক ধরে এলাকায় জনসংযোগ, উঠান বৈঠক ও সরকারের উন্নয়ন প্রচার চালিয়ে আসছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত ডাক্তার খোরশেদুজ্জামান মিস্ত্রি মিয়ার ছেলে এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বর্তমান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এম জামাল আব্দুন নাছের বাবুলের ছোট ভাই তরুণ শিল্পপতি এস এম শাহীনুজ্জামান শাহীন। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং ডাক্তার খোরশেদুজ্জামান মিস্ত্রি মিয়া কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকার মানুষের সেবা করে আসছেন। 
দলীয় কোন্দলের কারণে দলে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও মূলত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খানের হাত ধরে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীভাঙ্গা এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। ফলে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দৌড়ে এমপি ফরিদুল হক খান ও এস এম শাহীনুজ্জামান শাহীনের মধ্যেই তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী জামালপুর-শেরপুর সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি ও কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী হোসনে আরাও মাঠে সরব রয়েছেন। 
এ ছাড়াও এ আসনে সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের কন্যা সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি মাহজাবিন খালেদ বেবী, ঢাকা মহানগর বিমানবন্দর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী শাহজাহান আলী মন্ডল বিগত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন চেয়ে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় জনসংযোগ ও সেবা-সহায়তামূলক কাজের কারণে চরাঞ্চলের পাঁচটি ইউনিয়নসহ এই আসনের সবগুলো ইউনিয়নেই তাঁদের জনসমর্থন রয়েছে।  এবারও তাঁরা নৌকা প্রতীকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে লবিং করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। 
এদিকে, এই আসনটিতে আওয়ামী লীগের একমাত্র বিরোধী পক্ষ বিএনপি। ২০০১ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে সুলতান মাহমুদ বাবু এমপি নির্বাচিত হয়ে ভোটের মাঠে তার ব্যাপক পরিচিতি থাকলেও দলীয় কোন্দল ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে তিনি বা তাঁর দল এই আসনে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এস এম আবদুল হালিম একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন কিনেছিলেন। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন সাবেক এমপি সুলতান মাহমুদ বাবু। 
বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে গেলে বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে সেই নির্বাচনে সুলতান মাহমুদ বাবু এবারও এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। 
এই আসনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ ব্যাপক কোন্দলের কারণে গুঞ্জন উঠেছে আওয়ামী লীগের শরিক দল হিসেবে আসনটি এরশাদের জাতীয় পার্টিকেও ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। গতবারের নির্বাচনে এই আসনে জাতীয় পার্টির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শিল্পপতি মোস্তফা আল মাহমুদ। গত নির্বাচনের আগে দলীয় চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ইসলামপুরে মোস্তফা আল মাহমুদের নির্বাচনী জনসভায়ও এসেছিলেন। 
আওয়ামী লীগের জোটের হয়ে এই আসনে মোস্তফা আল মাহমুদের প্রার্থিতার বিষয়টি অনেকটা ‘টক অব দ্য টাউনে’ পরিণত হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জোটের জন্য এই আসন ছেড়ে না দেওয়ায় মোস্তফা আল মাহমুদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। আসছে নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী হিসেবে আগাম নির্বাচনী প্রচার ও জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। জাতীয় পার্টি জোটে নির্বাচনে গেলে সেক্ষেত্রে আসনটিতে ভাগ বসাতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগেও লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন এই নেতা। 
ঢাকা মহানগর বিমানবন্দর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী শাহজাহান আলী মন্ডল জনকণ্ঠকে বলেন, বিগত চারটি জাতীয় নির্বাচনেই আমি মনোনয়ন চেয়েছি এই আসনে। কিন্তু পাইনি। মনোনয়ন না পেলেও বঙ্গবন্ধুর অনুসারী এবং আওয়ামী লীগের সক্রিয় একজন কর্মী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এ আসনের নৌকার বিজয়ে আমি সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি। এলাকাবাসীর সুখে-দুঃখে আমি সবসময় তাদের পাশে থাকি। তৃণমূল আওয়ামী লীগে বিভক্তি থাকায় এ আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করে যোগ্য প্রার্থী না দেওয়া হলে নৌকার বিজয় ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আমি এবারও এ আসনে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন চাইব।

শিল্পপতি এস এম শাহীনুজ্জামান শাহীন জনকণ্ঠকে বলেন, আমি আওয়ামী পরিবারের সন্তান। আমার বাবা দীর্ঘদিন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এলাকা ও এলাকাবাসীর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। তবে বর্তমান এমপি মো. ফরিদুল হক খানের আত্মীয়করণ ও দলে অনৈক্য সৃষ্টির কারণে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ আসন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। দলীয় সভানেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার প্রতি সদয় হলে দলের সবাইকে নিয়ে তাকে নৌকার বিজয় উপহার দিতে পারব। 
সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি মাহজাবিন খালেদ বেবী মোশাররফ বলেন, এলাকার উন্নয়নে আমিও কাজ করতে চাই। আমি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। 
জামালপুর-শেরপুর সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি হোসনে আরা বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছি। নিশ্চয় দল কাজের মূল্যায়ন করবে। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচনে অংশ নেব। 
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য শিল্পপতি মোস্তফা আল মাহমুদ জনকণ্ঠকে বলেন, জাতীয় পার্টি থেকে এ আসনে ইতোমধ্যে আমাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আমরা নির্বাচনকে সামনে রেখে সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। যখন যেভাবেই হোক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। 
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি সুলতান মাহমুদ বাবু জনকণ্ঠকে বলেন, এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে প্রথমবারের মতো আমিই দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। সুতরাং আমার ওপর দলের যেমন আস্থা রয়েছে, তেমনি আমিও দলের ওপর আস্থা রেখেই এলাকাবাসীর ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। সামনে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে এ আসনে দল আমাকেই মনোনয়ন দিবে বলে আশাবাদী। 
তাঁর দাবি, এখানকার বিএনপি যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। আওয়ামী লীগের উন্নয়নের নামে লুটপাটের বিরুদ্ধে ৭০ শতাংশ ভোটার ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ করা হলে এ আসনে ধানের শীষ বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে।

×