ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৯ জুন ২০২৩, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০

রোদ ও বারিধারায় নগর জীবনের সঙ্গী ছাতা

সমুদ্র হক

প্রকাশিত: ০০:৪০, ২৭ মে ২০২৩

রোদ ও বারিধারায় নগর জীবনের সঙ্গী ছাতা

বগুড়া নগরীর ছাতাপট্টিতে ছাতা মেরামত করছেন কারিগর

সামনেই ছাতার মৌসুম। ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ বৃষ্টি ঝরিয়ে ছাতার রিহার্সাল দিয়েছে। ছাতা যত আধুনিকায়ন হোক নগর জীবনে প্রতি ঘরে ছাতা আবশ্যিক। তবে এই ছাতা আবিষ্কার হয়েছে বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য নয়। বিশে^ প্রথম চীন ছাতা আবিষ্কার করে রোদ ও দাবদাহ থেকে রক্ষার জন্য। পরবর্তী সময়ে রোদ ও বৃষ্টি দুইই রক্ষা করে এই ছাতা। বগুড়া নগরীর কাঁঠালতলা এলাকায় ছাতার অনেক দোকান। ছাতাপট্টি হিসেবে পরিচিত। ছাতা মেরামতের কারিগররা বসে আশপাশে। এই সময়ে ছাতা মেরামতের হিড়িক পড়েছে। ছাতাপট্টি সরগরম হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্যের কাঠের হাতলের কালো কাপড়ের ছাতার সঙ্গে স্প্রিংয়ে সুইচ দেওয়া কত যে বাহারি রঙের ছাতা এসেছে। গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে নগর জীবনে ছাতার কদর বেড়ে যায়। ঘরে অনেকটা সময় অলস থাকা ছাতা সাফসুতেরা করতে গিয়ে দেখা যায় মেরামত করা দরকার। তখনই ডাক পড়ে কারিগরদের।
কারিগরদের একটি অংশ বগুড়া ছাতাপট্টির আশপাশে মেরামতের যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে। কেউ পাড়া ও মহল্লায় ঘুরে ঘরে হাঁক দেয় “আছে ছেঁড়া ফাটা কলপি বাঁকা স্প্রিং নষ্ট লাঠিভাঙ্গা ছাতা”। এই হাঁকডাক শুনে নগরীর বাসাবাড়ির লোকজন ছাতার কারিগরদের ডেকে ছাতা মেরামত করিয়ে নেন। এই কারিগরদের স্থানীয় কথায় বলা হয় ‘টাইকর’। দিনা কয়েক আগের দৃশ্য : আকাশে মেঘ। বৃষ্টির আভাস। পথে বের হয়েছেন। সঙ্গে ছাতা নিয়েছেন কি! হয়তো নিয়েছেন। বৃষ্টি ঝরা শুরু হলো। বাতাসও উঠলো। ছাতাটি মেলে ধরলেন। হঠাৎ বাতাসের ধাক্কায় ছাতা গেল উল্টে। স্প্রিং খসে পড়লো। কি না বিপাকে পড়তে হয় তখন। ভারি বৃষ্টিতে এমন অবস্থা অনেকেরই হয়েছে। এই ছাতা রক্ষণাবেক্ষণের সময় এসেছে এখন। 
প্রকৃতির মতিগতির ঠিক নেই। কখন কোন ঋতু আসছে যাচ্ছে টেরই পাওয়া যায় না। এখন জ্যৈষ্ঠ মাস। গ্রীষ্মকাল। বৈশাখে ঝড় ছিল না। তবে মহাসাগরের ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ থাবা দিয়েছিল কিছুটা। এই কিছুটা থাবাতেই গ্রীষ্মের রূপ পাল্টে আগাম বর্ষার আগমন ঘটে। বৃষ্টি শুরু হয়ে সহজে থামে না। মাঝেমধ্যেই ভারি ও মাঝারি বৃষ্টি। ঋতু বৈচিত্র্যের পালাবদল সব কিছুই এলোমেলো করে দিয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেলেই ভ্যাপসা গরম। এই গরমের ধকল সামলাতেও দরকার ছাতা। ছাতা বছরের অনেকটা সময় ঘরেই থাকে। কোথাও ঝুলিয়ে রাখা হয়। আধুনিক ছাতা ফোল্ড করে আলমারি অথবা ওয়াড্রোবেও রাখা হয়। অঝর ধারায় বৃষ্টিতে ছাতা বস্তুটি হাতে না নিলেই নয়। সমুখেই বারিধারার দিন। 
আকাশে কালো মেঘ দেখলেই বলাবলি হয় এই নামলো বলে। এই সময়ে ছাতা ঠিক না থাকেল কি চলে! নগরীতে সামান্য বৃষ্টিতেই রিক্সাচালকরা চড়া ভাড়া দাবি করে। এই অবস্থায় একমাত্র সাহায্যকারী বস্তুটির নাম ছাতা। বর্তমানে বাহারি ছাতা এসেছে। ছাতার হাতলের সঙ্গে সুইচ টিপলেই মেলে। ছাতা যত বড়ই হোক বহনের কত সুবিধা এখন। স্প্রিং ও স্টিল কর্ডে ছাতার টানির প্লাস্টিকের অংশকে নানা কায়দায় ছোট করে ছেলেরা প্যান্টের লুপের সঙ্গে রাখে। মেয়েরা ভ্যানিটি ব্যাগে বহন করতে পারে। ছাতার হাতলেও এসেছে কত পরিবর্তন। একটা সময় ছাতার হাতল বাংলা ‘ঢ’ বর্ণের মতো বাঁকানো থাকতো। এই বাঁকানোকে দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে। ছাতার কাপড়েও এসেছে পরিবর্তন। এখন কালো কাপড়ের ছাতার সঙ্গে নানা বর্ণের নানা ধরনের নক্সার কাপড় ব্যবহার হয়। নক্সি কাপড়ের ছাতা এখন বেশি। 
ছাতা যত দৃষ্টিনন্দনই হোক মেলতে না চাইলে কখনও উল্টোমুখি হলে কখনও ভেতরের কোনো পার্টসের জন্য বা সেলাই খুলে গেলে মেলতে অসুবিধা হলে কারিগর ছাড়া গতি নেই। নামে যাই থাক তাদের ব্যাগে ছাতা মেরামতের যন্ত্রপাতি একই। সুই সুতো ছোট্ট হাতুরি সাঁড়শির সঙ্গে টুকরো কাপড়, ছাতার ভেতরের রিং স্পোক কাঁটা গুনাসহ কত জিনিসই থাকে। একজন টাইকর বললেন, ছাতা মেরামত করার সময় কোনো জিনিস ফেলে দেওয়া হয় না। 
পাল্টে নেওয়ার পর ওই ভাঙ্গা টুকরো রেখে দেওয়া হয়। যাদের ছাতায় সামান্য খুঁত আছে সেখানে বসিয়ে দেওয়া হয়। এই ছাতা বছরের অনেকটা সময় ঘরে বন্দি থাকে। বাইরে ফুরফুরে আবহাওয়ায় কিছুদিনের জন্য ছাতার কদর প্রায় ফুড়িয়েই যায়। প্রকৃতিতে যেই বৃষ্টি ঝরার পালা শুরু অমনি খোঁজখবর কোথায় আছে বৃষ্টির বন্ধু ছাতা। গল্পে উপন্যাসে নাটক চলচ্চিত্রে মানুষের চরিত্র চিত্রনে ছাতাকে টেনে আনা হয়। নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দে পছন্দের তালিকায় ছাতা ওপরের দিকে থাকে। রোদেলা তাপ বৃষ্টির ধারা থেকে মুক্তির ছোট্ট একটি বস্তুর প্রয়োজনটা যে কত তা মৌসুমই বলে দেয়। 
নগরীর মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষ ছাতা হাতেই ঘর থেকে বের হয়। যাদের গাড়ি আছে ছাতা ব্যবহার না করলেও চলে। মোটরসাইকেল চালকদের রেইনকোট দরকার। তবে ছাতার কদরই আলাদা। আবার এই ছাতা হারায়ও বেশি। বৃষ্টির সময় ছাতা হাতে বের হওয়ার পর রোদ উঠলে ছাতা নেওয়ার কথা মনে থাকে না। ছাতা হারিয়ে যাক আর নাই যাক রোদ বৃষ্টিতে মানব জীবনে ছাতার আকর্ষণ থাকবেই ।