ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ব্যাপক লোডশেডিংয়ের শঙ্কা

পায়রায় কয়লার তীব্র সংকট ॥ উৎপাদন বন্ধ রামপালে

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ০০:০৯, ১২ মে ২০২৩

পায়রায় কয়লার তীব্র সংকট ॥ উৎপাদন বন্ধ রামপালে

মাত্র তিন সপ্তাহের মজুত কয়লা নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পায়রা

মাত্র তিন সপ্তাহের মজুত কয়লা নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পায়রা। ১৩২০ মেগাওয়াটের দুই ইউনিটের এই কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন ১২শ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে। বলা যায় দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী কেন্দ্র এটি। কিন্তু তীব্র কয়লা সংকটে পড়তে যাচ্ছে এই কেন্দ্রটিও। 
কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বলছে, সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ দিন মজুত কয়লা দিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালানো যাবে। সরকারের পক্ষ থেকে এর মধ্যে বকেয়া বিল পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এর পর উৎপাদন চালানো যাবে না বলেও মত তাদের। কয়লা সংকটে ইতোমধ্যে বন্ধ রয়েছে অপর দুই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র রামপাল এবং বড়পুকুরিয়ায়ও। এরপর যদি পায়রায়ও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সারা দেশ অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কবলে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ডিসেম্বরে একটি ইউনিট উৎপাদনে আসার পর এ পর্যন্ত কয়েক দফায় বন্ধ হয়েছে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ মালিকানায় নির্মিত বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। গত ১৫ এপ্রিল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর চারদিন পর এটি আবার চালু হয়। কিন্তু কয়লার অভাবে ২৪ এপ্রিল থেকে এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। নতুন করে আমদানি করা কয়লার জাহাজ গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে পৌঁছালেও এটি থেকে উৎপাদন আবার কবে শুরু হবে বলতে পারছেন না খোদ কেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা। 
বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া পার্টনারশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আনোয়ারুল আজম জনকণ্ঠকে বলেন, প্রথমে একবার ডলার সংকট পরে টারবাইন ব্লাস্টের কারণে এই কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। মেরামত শেষে আবারও উৎপাদন শুরু হলেও কয়েকদিন আগে কয়লা সংকটে আবারও উৎপাদন বন্ধ থাকে। কয়লা আসলেও কবে নাগাদ এটি থেকে আবারও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে তা এখনি বলা যাচ্ছে না। তিনি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে দিনে পাঁচ হাজার টন কয়লা প্রয়োজন। এক জাহাজ কয়লা এনে এক সপ্তাহের মতো বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন সচল রাখা যায়। এমন অবস্থায় ডলার ছাড়ের ধারাবাহিকতা না থাকলে উৎপাদন এভাবে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকছেই। 
তবে ডলার সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে যাচ্ছে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, ডলার সংকটের কারণে কয়লার বিল বাবদ গত ৯ মাসে কেন্দ্রটির বকেয়া জমেছে প্রায় ২৯৮ মিলিয়ন ডলার বা তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা। বকেয়া পরিশোধ না করায় চীনের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কয়লা আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনকে (সিএমসি)। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে বর্তমানে যে পরিমাণ কয়লা মজুত রয়েছে তা দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ দিন চলবে। যদি এর মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করে কয়লা আমদানি করতে না পারে, তাহলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুটি ইউনিটই বন্ধ হয়ে যাবে। 
এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার  কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ এম খোরশেদুল আলমও। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বকেয়া জমার কারণে দুই-তিন দিন আগে তারা (চীনের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) আমাদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছে বকেয়া বিল পরিশোধ না করা পর্যন্ত তারা আর কয়লা দেবে না। আমরা বিষয়টি জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছি। বর্তমানে যে কয়লা মজুত রয়েছে তা দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ দিন কেন্দ্রটি চালু রাখা যাবে। এর মধ্যে যদি বকেয়া পরিশোধ করে কয়লা আমদানি করা না যায়, তাহলে কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি জানান, কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট চালু রাখতে দৈনিক ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার মেট্রিক টন কয়লা প্রয়োজন হচ্ছে। কয়লা আমদানি করা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া থেকে।
কিন্তু সম্প্রতি রামপালের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ ছিল বড়পুকুরিয়ার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনও। যার ফলে দেশজুড়ে তৈরি হয় তীব্র লোডশেডিং। রাজধানীতে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও পল্লি অঞ্চলের মানুষজনকে পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এর তথ্য মতে, গত মঙ্গলবার দেশে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। এর প্রেক্ষিতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৭৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। পিডিবিকে লোডশেডিং করতে হয় এক হাজার ৪৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের।

×