ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১

সাড়ে ৫ কিমি নদীর সাড়ে চার কিমি শুকিয়ে গেছে

শীর্ণ পদ্মায় চলছে ঘোড়ার গাড়ি

কৃষ্ণ ভৌমিক, পাবনা

প্রকাশিত: ০০:২০, ২৪ মার্চ ২০২৩

শীর্ণ পদ্মায় চলছে ঘোড়ার গাড়ি

সাতবাড়িয়া-হাবাসপুর এলাকায় পদ্মা শুকিয়ে মাঝ নদীতে চলছে ঘোড়ার গাড়ি

পদ্মা শুকিয়ে যাওয়ায় সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া-হাবাসপুর নৌ-যোগাযোগ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দু’পাড়ের ঘাটে দাঁড়ালে চোখে পড়বে শুধুই বালু আর বালুচর। সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার প্রশস্ত পদ্মার সাড়ে চার কিলোমিটারই শুকিয়ে গেছে। মাঝ নদীতে চলছে ঘোড়ার গাড়ি। এক কিলোমিটার শীর্ণ পদ্মায় নানা দুর্ভোগের মধ্যে প্রতিদিন পাঁচটি খেয়া নৌকায়  দু’পাড়ের মধ্যে নৌ-যোগাযোগ চালু রাখা হয়েছে।

নদী শুকিয়ে যাওয়ায় দু’পাড়ের জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নদীর তীরবর্তী  ফসলের মাঠে যেমন সেচ দেওয়া যাচ্ছে না, তেমনি টিউবওয়েলে পানি না ওঠায় খাবার পানিরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
পাবনা সদর ও সুজানগর উপজেলার জনসাধারণের জন্য সাতবাড়িয়া ঘাটটি দীর্ঘকাল থেকে খুবই গুরুত্ব বহন করছে। এপারের সঙ্গে ও পারের সেনগ্রাম, পাংশা, খানখানাপুর, কুমারখালী রাজবাড়ী, ফরিদপুর মধ্যে আত্মীয়তার সূত্রে দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রয়োজন হয়। শুধু তাই নয়, এ এলাকার অধিকাংশ সাধারণ মানুষ স্বল্প সময়ে কম খরচে মাগুরা, মাদারীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী যাতায়াতে এ ঘাটই ব্যবহার করেন।

তা ছাড়াও এ পারের তাঁতপ্রধান নিশ্চিন্তপুর, কুড়িপাড়ার তাঁতিদের ব্যবসার প্রয়োজনে এ ঘাট পার হয়ে নিয়মিত কুমারখালী হাটে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কিন্তু নদী শুকিয়ে যাওয়ার এ ঘাট দিয়ে পারাপারকারী যাত্রীদের এখন অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বুধবার সাতবাড়িয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রমত্ত পদ্মায় পানির কোনো চিহ্ন নেই। যতদূর চোখ যায় বালি আর বালি। ঘাটের শূন্যরেখা থেকে বালুচরের মাঝ দিয়ে পায়ের চাপে যেন রাস্তা হয়েছে। এ রাস্তার আধা কিলোমিটার হেটে খেয়া নৌকার কাছে যেতে হচ্ছে।

খেয়া নৌকায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর চরের মধ্যে নৌকা থেকে নামতে হচ্ছে। সেখান থেকে বালির চরের রাস্তায় ঘোড়ার গাড়িতে সাড়ে চার কিলোমিটার গিয়ে হাবাসপুর ঘাটে উঠতে হচ্ছে। এখানে সময় যেমন বেশি লাগছে তেমনি যাত্রীপ্রতি ভাড়াও বেশি গুনতে হচ্ছে। খেয়া নৌকায় ৫০ টাকার সঙ্গে ঘোড়ার গাড়িতে ভাড়া ৪০ টাকা মিলিয়ে ৯০ টাকা দিয়ে হাবাসপুর ঘাট পার হতে হচ্ছে। অথচ বর্ষা মৌসুমে লাগে ৫০ টাকা।
 সাতবাড়িয়াঘাটের নিকটবর্তী বাসিন্দা সাতবাড়িয়া কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক কার্তিক কুমার মালাকার জানান শ্রাবণ, ভাদ্র আশি^ন পর্যন্ত নদীতে পানি থাকে। পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র  বৈশাখে নদী একেবারেই শুকিয়ে যায়। গত সাত-আট বছর ধরে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে চর জেগে ওঠায়  নদীটি শীর্ণ হতে হতে এখন যেন ক্যানেলে পরিণত হচ্ছে। একই গ্রামের যুবক সেলিম রেজা জানান, যেভাবে প্রতিবছর পদ্মা শুকিয়ে ছোট হচ্ছে, তাতে আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠছে।
হাইড্রোলজি পাবনা বিভাগীয় কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জানান, এ বছর ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ অনেক কম থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার শুরু থেকেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি প্রায় ৩০ হাজার কিউসেক কম প্রবাহিত হচ্ছে।  পদ্মায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এ বছর শুরু থেকেই নদীর বেশ কয়েকটি অংশ শুকিয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, পদ্মা আন্তর্জাতিক নদীর অংশ তাই পানির উৎস আমাদের হাতে নেই।

প্রাকৃতিক কারণে পদ্মার যে বিপর্যয় হয়েছে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অপরিকল্পিত কাজকর্মে। বেশ কয়েকটি স্থানে বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি অংশে অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ হওয়ায় নদীর ক্ষতি হয়েছে। নদীর চর থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তুলে নদীকে বিপর্যস্ত করা হচ্ছে। পদ্মাকে বাঁচাতে সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ড্রেজিং করে নদীকে প্রবাহমান করতে হবে বলে তিনি জানান।

×