ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯

১২০ টাকায় চা শ্রমিকদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়

নিজস্ব সংবাদদাতা, হবিগঞ্জ

প্রকাশিত: ১২:৪৪, ১৪ আগস্ট ২০২২

১২০ টাকায় চা শ্রমিকদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়

চা বাগান থেকে পাতা উত্তোলন করছে এক নারী শ্রমিক

হবিগঞ্জ জেলায় ছোট ও বড় মিলে চা বাগানের সংখ্যা প্রায় ৪১টি। এসব বাগানের বাসিন্দা প্রায় দেড় লাখ। এরমধ্যে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে প্রায় ৩২ হাজার শ্রমিক চা পাতা উত্তোলনে জড়িত। বাগানে কাজ না পেয়ে বাকীদের জীবিকার জন্য বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে হচ্ছে।   চা বাগানে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১০২ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা। এ মজুরিতেও সংসার চলছে না ওদের। কারণ, প্রতিদিনই নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ছে। শ্রমিকদের দাবি, দৈনিক মজুরি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করতে হবে। মজুরির স্বল্পতায় শ্রমিকদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। এ নিয়ে কর্মবিরতি ও ধর্মঘটে যাচ্ছে তারা।

অন্যদিকে হবিগঞ্জের চা-বাগানের বিভিন্ন স্থান থেকে গোপনে বালু উত্তোলনে সক্রিয় একটি চক্র। প্রায়ই বাগান থেকেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তাতে করে অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে বাগানগুলো। আর এই দুই সমস্যার মাঝে পড়ে চা-পাতা উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এদিকে কর্তৃপক্ষের নজরধারী নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরিবেশ প্রেমিকরা বলছেন, বাগান থাকলে পর্যায়ক্রমে শ্রমিকদের বেতন আরো বৃদ্ধি পাবে। তাই হবিগঞ্জ জেলার পাহাড়ি এলাকাখ্যাত চুনারুঘাট, মাধবপুর, বাহুবল, নবীগঞ্জ উপজেলায় ছোট বড় বাগানগুলো রক্ষা হলে চা-শ্রমিকদের সুদিন ফিরবে। শ্রমিকরা আর এসব আশারবাণী মানতে চাচ্ছে না। তারা চায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন।

চা-বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা-সংসদ ও বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে মজুরি (বেতন) বাড়ানো বিষয়ক দ্বিপক্ষীয় নতুন চুক্তিতে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো হয়। আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ২১ মাস ১৫ দিন পর বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ২০২০ সালে চুক্তি সম্পাদন হয়েছিল। 

জেলার চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর চা-বাগানের বাসিন্দা বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল জানান, প্রতি দুই বছর অন্তর চা শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যা নিয়ে চা বাগান মালিক পক্ষের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদ ও বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করে নতুন করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার বিধান রয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশ চা বোর্ড ও চা-শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবমিলিয়ে ২৫৬ টি চা-বাগান আছে। এতে নিবন্ধিত শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজারের উপরে। অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৩০ হাজার। দেশে মোট চা শ্রমিক পরিবারের বাসিন্দা প্রায় ৮ লাখ। এরমধ্যে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার। বাগানে কাজ না পেয়ে হাজার হাজার শ্রমিক বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।  

তিনি আরও জানান, চা-শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি কাঠামো বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় এখনও চা-শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছে না। প্রতিদিন একজন শ্রমিককে অবশ্যই ২৩ কেজি চা-পাতা উত্তোলন করতে হয়। তবেই সে পাবে ১২০ টাকা। মজুরি ও রেশন মিলিয়ে একজন শ্রমিক প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৮০ টাকা পায়। যেখানে একজন খেতমজুরের বর্তমান আয় প্রতিদিন ৫০০ টাকা। একজন রিক্সা চালকের প্রতিদিনের আয় প্রায় ৬০০ টাকা।

চা-বাগানগুলো ঘুরে দেখলে পাওয়া যায়- প্রায় শ্রমিক ও তাদের সন্তানদের রুগ্ন দেহ, ভগ্ন স্বাস্থ্য এবং তারা অপুষ্টির শিকার। পুষ্টিকর খাবার দূরের কথা তারা দু-বেলা পেটভরে খাবার পায় না। চা-শ্রমিকরা নৈমিত্তিক ছুটি পায় না। চা-শ্রমিকদের বাসস্থানের তেমন উন্নতি হয়নি। এটা বাগান মালিকদের দায়িত্ব। ছোট্ট কুঠুরিতে গাদাগাদি করে মা-বাবা, পুত্র, কন্যা, পুত্রবধূ নিয়ে তারা বাস করে।

চান্দপুর বাগানের শ্রমিক শিলা উড়াং, রুমা উড়াং, সাগরী রায়, সন্ধ্যা মহালী, বিনা সাঁওতাল, দেউন্দি বাগানের শ্রমিক বাবুলাল মাল, শ্রীমতি বাগতি, অঞ্জনা মহালী, বজেন্দ্র গোয়ালা, বীরেন্দ্র বাগতি বলেন- দৈনিক বেতন ১২০ টাকা। এখানে নুন আনতে যেনো পান্তা ফুরায়। তাই খেয়ে না খেয়ে কাজে যোগদান করতে হচ্ছে। আমরা উন্নত জীবন থেকে বঞ্চিত। এভাবেই একদিন এ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হবে। শ্রমিকরা ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে দিনে মজুরি পেতেন ১ টাকা। এখন হয়েছে ১২০ টাকা। রেশন আগের মতই আছে। রেশনের আটা ও চালের মান ভালো না। চা-বাগান শ্রমিকদের টানাপোড়েনের জীবন শেষ বুঝি হবে না।  

চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে নাটক ও গানের মাধ্যমে দাবি জানিয়ে আসা জেলার চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি প্রতীক থিয়েটারের সভাপতি সুনীল বিশ্বাস বলেন, চা-পাতা উৎপাদনে পুরুষের পাশাপাশি নারীও কঠোর শ্রম দিচ্ছে। একজন শ্রমিক ৬০ বছর পর্যন্ত বাগানে কর্মরত থাকেন। পরে অবসরে যান। 

তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের মূল্য দিন দিন বাড়ছে। এখানে শ্রমিকদের এ বেতনে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। অচিরেই জনপ্রতি শ্রমিকের বেতন ৩০০ টাকা করা হোক। এছাড়াও শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন- লস্করপুর, সিলেট, জুড়ী, লংলা, মনু-ধলাই, বালিশিরা ও চট্রগ্রামসহ ৭টি ভ্যালীর মাধ্যমে দেশের প্রায় ২৫৬ টি বাগান পরিচালিত হয়ে আসছে। 


 

টিএস