২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বাংলাদেশে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১০ বছর

প্রকাশিত : ২৪ মার্চ ২০২০
  • বিচারপতি ওবায়দুল হাসান

আজ ২৫ মার্চ। বাঙালী জাতি এ দিবসটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করবে। ১৯৭১-এর এদিনে ঢাকাসহ সারাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে অগণিত মানুষ গণহত্যার শিকার হন। সেদিনকার পাকিস্তানী বর্বরদের নির্মমতা সমগ্র বিশ্ব বিবেককে আলোড়িত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস চলে এই নৃশংস বর্বরতা। পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের ’৭১-এর গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচার কাজকে বেগবান করার জন্য ২০১২ সালের ২২ মার্চ প্রতিষ্ঠা লাভ করে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল। আমি ছিলাম দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। এ দুটি ট্রাইব্যুনালে আজ পর্যন্ত বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে ৪১টি মামলার। আপীল বিভাগ হতে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর ছয় জন সাজাপ্রাপ্তের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

আজ ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনালের ১০ বছর পূর্তিতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স¥রণ করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি ১৯৭১ সালে এ দেশে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্তদের বিচারের জন্য ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) এ্যাক্ট, ১৯৭৩ প্রণয়ন করে গিয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। যাঁর সাহসী ও ঐকান্তিক ইচ্ছায় ’৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধে স¤পৃক্ত অপরাধীদের বিচার কাজটি দশ বছর আগে শুরু হয়ে আজ একটি পর্যায়ে চলে এসেছে। শ্রদ্ধার সঙ্গে স¥রণ করছি সেই সকল বিচারপতিবৃন্দকে, যাঁদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়চেতায় শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বিচার কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।

আজকের এই দিনে বাংলাদেশের ভূখ-ে ১৯৭১-এ সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ও এর বিচার এবং ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে কিছু বলার উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখা :

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ভূখ-ে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যাসহ বিভিন্ন বর্বর ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ’ সংঘটিত হয়েছিল সে বিষয়ে কারো কোন সংশয় নেই। বরং গত শতকে বিশ্বে সংঘটিত এই প্রকৃতির অপরাধগুলোর মধ্যে নৃশংসতা ও ব্যাপকতার দিক দিয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত অপরাধের ব্যাপকতা ও মাত্রা রয়েছে প্রথম কয়েকটির মধ্যে। এই প্রকৃতির অপরাধ সংঘটনের কতদিনের মধ্যে তার বিচার শুরু করতে হবে এমন কোন সময়সীমা আন্তর্জাতিক আইনে নেই। কোন ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাতেই এটি নেই। সময়সীমা সংশ্লিষ্ট এমন কোন বিধিবদ্ধ অন্তরায় থাকলে তা ১৯৬৮ সালের কনভেনশনে পরিহারের কথা বলা হয়েছে, যদি অপরাধটি ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ বা ‘গণহত্যা’ বা ‘যুদ্ধাপরাধ’ এর মতো অপরাধ হয়ে থাকে। এমন অপরাধের বিচার শুরুর সময়সীমা নির্ধারণ করা নেই বলেই নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আজও চলছে, দ্বিতীয় বিশ্ব¦যুদ্ধের ৭০/৮০ বছর পরও।

নাৎসি যুদ্ধাপরাধী মরিস পাপনের বিচার শুরু হয় অক্টোবর ১৯৯৭ সালে। তখন তার বয়স ছিল ৮৭ বছর। বিচারের সম্মুখীন হওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে তিনি সরকারের উচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদসহ বাজেটমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার কৃত অপরাধের কথা বিশ্ব জানত না। জেনেছে তখনই যখন আকস্মিকভাবে মাইকেল বার্জেস নামে এক তরুণ ফরাসী ইতিহাসবিদ একটি আর্কাইভে কাজ করার সময় কিছু কাগজ ও দলিল পান যার কিছু ছিল পাপনের স্বাক্ষরিত। কার্যত এগুলোর ভিত্তিতেই মরিস পাপনকে বিচারের আওতায় আনা হয় অপরাধ সংঘটনের দীর্ঘ ৫৫ বছর পরে। ফ্রান্সের একটি আদালতে ছয় মাসের বিচার শেষে তার ১০ বছর সাজা হয়। প্রায় তিন বছর সাজা ভোগের পরে অসুস্থতার কারণে তিনি মুক্ত হন এবং ৯৭ বছর বয়সে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ এ তিনি মারা যান। [সূত্রঃ , গড়হফধু ১৯ ঋবনৎঁধৎু ২০০৭]

আরেক নাৎসি যুদ্ধাপরাধী জন ডেমজানজুকের বিচার শুরু হয় ২০০৯ সালে মিউনিখের একটি আদালতে। তখন তার বয়স ছিল ৮৯ বছর। ২০১১ -এর ১২ মে দেয়া রায়ে তাকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়। আপীল নিষ্পত্তি সাপেক্ষে তাকে মুক্ত রাখা হয়। অবশেষে ১৭ মার্চ ২০১২ তারিখে তিনি ৯২ বছর বয়সে মারা যান। [সূত্র : উবসলধহলঁশ ঘধুর ধিৎ পৎরসবং ঃৎরধষ বহফং রহ গঁহরপয: ইু ঝুনরষষব ঋঁপযং: ১৮ গধু ২০১১]

অপরাধ সংঘটনের দীর্ঘ ৬০ বছর পরে বিচার শেষে আরেক নাৎসি যুদ্ধাপরাধী ৮৮ বছর বয়স্ক হেইনরিক বোরে কে ২০১০-এর মার্চ মাসে জার্মানিতে বিচার শেষে সাজা দেয়া হয়। অনেকেই বিস্মিত হয়েছে যে, কেন দীর্ঘ ৬০ বছর পরে তার বিচার করা হচ্ছে যা করে কোন কার্যকর উদ্দেশ্য সফল হবে না, বিশেষ করে যেখানে সে নিজে গণহত্যাকারী ছিল না। কিন্তু কেসটির প্রতি খুব ঘনিষ্ঠভাবে লক্ষ্য করলে এটি দৃশ্যমান হবে যে, কেন তার বিচার অনুষ্ঠান ও সাজা প্রদান করা হয়। এই বিচার ও সাজা প্রদানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়া হয় যে, এতদিন পরেও নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যৌক্তিক। [সূত্র : : , ঋৎরফধু ২৬ গধৎপয ২০১০ ১০.০০ এগঞ ]

উদাহরণ থেকে যে বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত তা হলো (ক) আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত ’সিরিয়াস ক্রাইমস’ বিচারের কোন সময়সীমা নেই (খ) অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিক বয়স বিচার থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য কোন অজুহাত নয় (গ) ‘সিরিয়াস ক্রাইমস’-এর জন্য যিনি দায়ী তাকে অবশেষে বিচারের সম্মুখীন হতেই হবে, তা যখনই হোক না কেন (ঘ) এটি ঠিক নয় যে, কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই নুরেমবার্গ ট্রায়াল ও টোকিও ট্রায়ালের মাধ্যমে সকল নাৎসি যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা হয়েছিল, কোন বিলম্ব ছাড়াই।

যে বার্তা এই উদাহরণগুলো থেকে দিবালোকের মতো স্বচ্ছ সেটিই ‘আইনের শাসন’ এবং ‘বিচারহীনতার সং¯কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। তাই যদি হয়, তবে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বিশ্ব স্বীকৃত নির্মম মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যার বিচার কেন করা যাবে না ? কেন এই বিচার নিয়ে বিতর্ক, বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার ? এটি ঠিক যে, দীর্ঘ ৪০ বছর পরে আমাদের দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচার শুরু“ হয়েছে। এতদিন কেন হয়নি এমন প্রশ্ন অনেকে করেছেন। কিন্তু এতদিন পরে এখন কথিত অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে শুধু এ কারণেই এটি বলার সুযোগ নেই যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই বিচার। বিচারের আওতায় আনা অভিযুক্তদের পরবর্তীতে কার কি সামাজিক বা রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রিক অবস্থান ছিল তা একেবারেই গৌণ। এর সমর্থন পাই আমরা অন্যান্য দেশের উপরের উদাহরণগুলো থেকে।

বিচার কে চাইবে? কেন চাইবে? সহজ উত্তরÑ রাষ্ট্র চাইবে এই বিচার। এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র্রের। অপরাধের শিকার ব্যক্তির বা তার স্বজনের এই বিচার চাইবার ও পাওয়ার অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তাই কেবল বিলম্বের অজুহাতে রাষ্ট্র এই দায় এড়াতে পারে না এবং ৪০ বছর পরে হলেও এই বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কর্তৃত্ব শূন্য হবে না কোনভাবেই। কেউই যেন ভুলে না যাই, এ বিচার এখন জাতীয় দাবি। নবীন প্রজন্ম এখন এ বিচারের দাবিতে উচ্চকিত। কারণ, বিচারহীনতার গ্লানির কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হয়েছে আহত, ক্ষতবিক্ষত ।

অভিযুক্তরা রাষ্ট্রীয়ভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে নানা প্রক্রিয়া আর কৌশলের মাধ্যমে। সে কারণেই কি তিনি অপরাধের দায় থেকে মুক্ত হবেন ? না, অবশ্যই তা হবেন না। নাৎসি যুদ্ধাপরাধী মরিস পাপনও মুক্ত হতে পারেননি। আলোচ্য প্রকৃতির অপরাধের বিচার চাইবার ও বিচার করার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ, জাতীয় ঐক্য, অনুকূল রাজনৈতিক অবস্থা। দীর্ঘদিন এসব ছিল বন্দী । রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য সত্ত্বেও ‘মানবতা বিরোধী অপরাধের’ বিচার প্রশ্নেœ সকলের, দলমত নির্বিশেষে ঐকমত্য থাকাটা জরুরী ও প্রত্যাশিত। ১৯৭৫ পরবর্তী দেশে কি ধরনের রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসব বিষয় একটু বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে যে, কেন ও কিভাবে বিচারের সম্মুখীন অভিযুক্তরা রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে এ দেশে। আর একই সঙ্গে জাতি কিভাবে বিচারহীনতার গ্লানি বয়ে চলেছিল দীর্ঘ ৪০টি বছর।

আরেকটি বিষয়ে অনেকের মনে বিভ্রান্তি থাকতে পারে যে, মূল অপরাধ সংঘটনকারীকে বিচারের আওতায় না এনে ঐ অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা বা সহায়তা দানকারী হিসেবে কোন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে বিচার করা যাবে কি? এমন প্রশ্ন হয়ত অনেকের মনে থাকতে পারে। তার কারণ, প্রচলিত ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় মূল অপরাধ সংঘটনকারীকে শনাক্ত না করে বা তাকে বিচারের আওতায় না এনে কেবল ঐ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্ররোচনা দানকারী ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ নেই, এটি ঠিক। কিন্তু ১৯৭৩ সালের আইনটি কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধসহ সেখানে বর্ণিত কিছু ‘আন্তর্জাতিক অপরাধের’ বিচারের জন্যই প্রণীত। এই আইনের অধীনে বিচার কার্যক্রমে প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি ও সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য হবে না তা এই আইনেই বলা হয়েছে। এই আইনটি নুরেমবার্গ চার্টারের আদলে করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালের আইনে বর্ণিত ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ সহ আন্তর্জাতিক অপরাধগুলো প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে ভিন্ন। প্রকৃতি, ব্যাপকতা, প্রেক্ষাপট ইত্যাদি কারণেই এই ভিন্নতা।

‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ এর জন্য কাকে দায়ী করা যাবে বা কাকে বিচারের আওতায় আনা যাবে ? এ বিষয়ে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত আইন বিজ্ঞান হলো- কোন বেসামরিক ব্যক্তি বা সামরিক ব্যক্তি বা সরকারী ব্যক্তি সরাসরি এই অপরাধ সংঘটন করলে বা অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করলে বা তিনি যদি এমন কোন ‘সহায়তা’ বা ‘প্ররোচনা’ বা ‘উস্কানি’ বা ‘নৈতিক সমর্থন’ বা ‘আদেশ’ দিয়ে থাকেন বা কোন ‘ষড়যন্ত্র’ করেন যা ঐ মূল অপরাধ সংঘটনকে কার্যকরভাবে নিশ্চিত বা ত্বরান্বিত করেছে তবে ঐ ব্যক্তি ঐ ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ বা ‘গণহত্যা’ বা ‘যুদ্ধাপরাধের’ দায়ে অভিযুক্ত হবেন। অর্থাৎ, মূল অপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের লক্ষ্যে ‘প্ররোচনা’ বা ‘সহায়তা’ বা ’উস্কানি’ বা ‘নৈতিক সমর্থন’ দেয়া বা ‘ষড়যন্ত্র’ করাটাও অপরাধ যা বিচারের আওতায় আনা যাবে। এই কাজগুলোর বা এগুলোর কোন একটির কারণে যদি নিরস্ত্র ‘বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে’ লক্ষ্য করে অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে তবে সেটিও ‘ মানবতা বিরোধী অপরাধ’ সংঘটিত করেছে বলে গণ্য হবে।

উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখতে পাই যে, সিয়েরা লিয়নের বিশেষ আদালতে লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরকে ক’বছর আগে মূল তথা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে কেবল ‘প্ররোচনা’ ও ‘সহায়তা’ প্রদানের অভিযোগে বিচার শেষে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেয়া হয়েছে। তিনি অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ অংশ নিয়েছেন এমন কোন অভিযোগ ছিল না। মূল অপরাধ সংঘটনকারী ও তার একত্রে তার বিচার হয়নি। এককভাবেই তার বিচার হয়েছে। এ থেকে এটি স্পষ্ট যে, মূল অপরাধ সংঘটনকারী যিনি অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ অংশ নেন তাকে বাদ দিয়েও কেবল ঐ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্ররোচনা বা উস্কানি বা আদেশ দেয়া বা ষড়যন্ত্র করা বা শুধু নৈতিক সমর্থন দেয়ার অভিযোগেও একক কোন সামরিক বা সরকারী বা বেসামরিক ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনা আন্তর্জাতিক আইন বিজ্ঞান অনুসারে স্বীকৃত ও আইনসিদ্ধ ।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (উভয় ট্রাইব্যুনাল) একাধিক মামলায় এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ১৯৫ কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল তাদের বিচারও এই ট্রাইব্যুনালে চলতে পারে। তবে ১৯৫ জনের মধ্যে যে সকল সেনা কর্মকর্তা ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে তাদের বিচার করা স¤ভব হবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বা সচেতন নাগরিক গোষ্ঠী ও বিশেষজ্ঞগণ বিষয়টি নিয়ে এখনও ভাবতে পারেন।

১৯৯৩ সালে সাবেক ইয়োগাস্লাভিয়া, ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার এ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং ১৯৯৮ সালে রোম সংবিধি (ঝঃধঃঁঃব) গ্রহণের পর থেকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের ইতিহাস ও এর ভবিষ্যত নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নুরেমবার্গ চার্টারের অধীনেই বিচার হয়েছিল। এর পর বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের আইনটিই প্রথম আইন যার অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যার বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১০ সালের ২৫ মার্চে এই আইনের অধীনে প্রথম ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। পরে ২০১২ এর ২২ মার্চে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল সৃষ্টির পর থেকেই দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংস্থা বলার চেষ্টা করে আসছে যে, ১৯৭৩ সালের আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি বা এখানে এই অপরাধ সংঘটনের উপাদান অনুপস্থিত। এই ত্রুটি দূর করা প্রয়োজন। তা না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষিত হবে না। মজার বিষয়, সবাই কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বার্থ নিয়েই উদ্বিগ্ন, উচ্চকিত। কিন্তু তাদের কখনও বলতে শোনা যায় না যে, ১৯৭১ সালে সংঘটিত এসব বর্বর নির্মমতার শিকার ব্যক্তিদের বা তাদের স্বজনদের বিচার চাওয়া ও পাওয়ার অধিকার কিভাবে নিশ্চিত করা যায়।

১৯৭৩ সালের আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে যে, এই ধারার (২)(এ) উপধারায় বর্ণিত কোন কাজ (এ্যাক্টস) ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারাধীন অপরাধ বলে গণ্য হবে। (২) (এ) উপধারায় ‘এ্যাক্টস’ হিসেবে হত্যা, আটক, নির্যাতন, ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো কোন ’বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে’ ( সিভিলিয়ান পপুলেশন) লক্ষ্য করে সংঘটিত হলে তা ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ বলে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ এরূপ অপরাধের লক্ষ্যই হতে হবে ‘সিভিলিয়ান পপুলেশন’। ‘সিভিলিয়ান পপুলেশন’Ñ এই শব্দ দুটিই স্পষ্ট করেছে যে, প্রচলিত আইনে বিচার্য কোন বিচ্ছিন্ন হত্যা বা কোন অপরাধ ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলে বিবেচিত হবে না, যদি অপরাধের লক্ষ্য ‘সিভিলিয়ান পপুলেশন’ বা এর কোন সদস্য না হয়ে থাকে। ‘সিভিলিয়ান পপুলেশন ’ কখন আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে এসব অপরাধের শিকার হয় সেটিও বুঝতে হবে।

‘মানবতা বিরোধী অপরাধের’ সংজ্ঞার কথা বলতে গিয়ে অনেকে বিশেষ করে আইসিসির সংবিধি অনুসরণ করার কথা বলেন। আবার এটিও বলা হয় যে, এ বিষয়ে আইসিটি ওয়াই বা আইসিটি আর-এর সংবিধিতে বর্ণিত সংজ্ঞা গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, আমাদের ১৯৭৩ সালের আইনে ’মানবতা বিরোধী অপরাধ’ যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তা আদৌ অস্পষ্ট নয় এবং তা অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনে কোন বাধার সৃষ্টি করে না। দ্বিতীয়ত, বর্ণিত কোন সংবিধি অনুসরণে আমাদের ট্রাইব্যুনাল বাধ্য নয়। যদিও প্রয়োজনে ঐসব অ্যাডহক ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত প্রসূত ধারণাগুলো ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিবেচনায় নিতে কোন বাধা নেই, যদি আমাদের ট্রাইব্যুনাল এটি যথাযথ ও প্রয়োজন বলে বিবেচনা করেন। তৃতীয়ত, আইসিটি ওয়াই সংবিধি, আইসিটি আর সংবিধি এবং রোম সংবিধি পাশাপাশি লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে, প্রতিটি সংবিধিতে ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ এর সংজ্ঞায় ভিন্নতা রয়েছে।

‘বেসামরিক জনগোষ্ঠী’ কখন, কি প্রেক্ষাপটে ১৯৭৩ সালের আইনের ৩(২)(এ) ধারায় বর্ণিত অপরাধের শিকার হয়েছিল? কেন হয়েছিল? কারা তাদেরকে ‘আক্রমণের’ লক্ষ্যে পরিণত করেছিল? এরূপ ’আক্রমণ’ করতে গিয়ে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ‘গোষ্ঠী ’ বা নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী কি কি ‘কাজ’ (এ্যাক্টস) করেছিল এবং কি ‘প্রেক্ষাপটে’ এসব কাজ (এ্যাক্টস) সংঘটিত হয়েছিল ? ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বা কোন গোষ্ঠীর এসব কাজ বা ‘এ্যাক্টস’-এর ফলশ্রুতিতেই কি ৩(২)(এ) ধারায় বর্ণিত অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল? সুসংগঠিত বা সাংগঠনিক নীতি বা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে’ আক্রমণের লক্ষ্য করা হয়েছিল কি ? প্রাসঙ্গিক এসব প্রশ্নেœর উত্তর পাওয়া গেলে ১৯৭১ সালে কি প্রকৃতির ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ সংঘটিত হয়েছিল এবং এই অপরাধের দায়ভার কার বা কোন ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর বা গোষ্ঠীর সদস্যের তা চিহ্নিত করা সহজ হয়ে যাবে। আর এ কাজটি বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্ভব। অর্থাৎ, ১৯৭৩ সালের আইনের ৩(২)(এ) ধারায় বর্ণিত ‘সিভিলিয়ান পপুলেশন’ এই শব্দগুচ্ছের মধ্যেই নিহিত রয়েছে অপরাধ সংঘটনের প্রেক্ষাপট। এই সহজ ব্যাখ্যা ও অভিমতের সঙ্গে কারও কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়। আর এই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই এটি বলা সম্ভব যে, এসব অপরাধ কি কোন ‘বিচ্ছিন্ন অপরাধ’ নাকি ১৯৭৩ সালের আইনে বর্ণিত ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ ছিল। কাজেই এ বিষয়ে কোন বিভ্রান্তি থাকার সুযোগ নেই যে, ১৯৭৩ সালের আইনে ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। সর্বোপরি, এ বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার কেবল ট্রাইব্যুনালের। এখানে কেবলমাত্র কিছু প্রেক্ষাপট ও তথ্যের ভিত্তিতে নিজ ধারণা প্রসূত ভাবনার আলোকে নিতান্ত একটি সংক্ষিপ্ত এ্যাকাডেমিক আলোচনার অবতারণা করা হয়েছে মাত্র।

আজ জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে বলতে চাই- ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকার যে আইন করে গেছেন এদেশের জন্মের বিরোধিতাকারী মানবতাবিরোধী অপরাধে স¤পৃক্তদের বিচার করার জন্যে, সে আইন যথাযথ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দেশ অনেকটাই বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। আমরা বঙ্গবন্ধুর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি । মহান আল্লাহ যেন তাঁকে সর্বোত্তম প্রতিদান প্রদান করেন।

লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২

প্রকাশিত : ২৪ মার্চ ২০২০

২৪/০৩/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: