১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

উদ্ভট সঙ্কটে বিভ্রান্ত নাগরিক ॥ পরিত্রাণ কোন্ পথে

প্রকাশিত : ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘রূপনারানের কূলে’ কবিতায় নিষঙ্গী পরিগ্রহে উচ্চারণ করেছেন ‘রূপনারানের কূলে জেগে উঠিলাম,/জানিলাম এ-জগত স্বপ্ন নয়।/রক্তের অক্ষরে দেখিলাম আপনার রূপ,/চিনিলাম আপনারে আঘাতে-আঘাতে বেদনায়-বেদনায়;/সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করেনা বঞ্চনা।’ প্রকৃতপক্ষে দেশে সংঘটিত কিছু বিষয় এমন সব দুঃসহ দৃশ্যপট তৈরি করছে, সচেতন যে কোন নাগরিদের এতে বিভ্রান্ত ও হতাশাগ্রস্ত হওয়া নিতান্ত স্বাভাবিক। একদিকে জাতি যেমন জাতির জনকের সুযোগ্য তনয়া প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বপরিমন্ডলে উন্নয়ন অভিযাত্রায় দেশের সুদৃঢ় অবস্থানকে অতিশয় পরিতুষ্ট হৃদয়ে অনুধাবন করছে, অন্যদিকে সত্য কিছু ঘটনাপ্রবাহ এক কঠিন বিক্রিয়ায় জনগণকে অধিকতর বিচলিত করে তুলছে।

দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবক মহামান্য রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনসহ অন্যান্য সরকারী কিছু অনুষ্ঠানে নির্দ্বিধায় নিগূঢ় কিছু অবাঞ্ছিত, অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত অঘটনের চিত্র উপস্থাপন করেছেন। প্রচ- অসহনীয় হলেও দেশবাসী এসব কঠিন সত্যের প্রকৃত উৎস, কারণ চিহ্নিতকরণ এবং পরিত্রাণের পন্থা অবলম্বনে রাষ্ট্রপতির দিকনির্দেশনার প্রতি তাকিয়ে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য বা শিক্ষকগণ এখনও জাতি-রাষ্ট্রের চোখে প্রচিত সম্মানের পাত্র। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, রাষ্ট্রপতির ভাষায় এসব উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য হচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের সর্বেসর্বা অভিভাবক। মেধা, প্রজ্ঞা, সততা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নৈতিকতায় যাদের অবস্থান হবে অনন্য উচ্চতায়। জ্ঞান বিতরণ ও আহরণের পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গবেষণা বা জ্ঞানুসন্ধানের মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতায় জ্ঞান সৃজন এবং সমৃদ্ধ মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করবেন।

রাষ্ট্রপতি তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে সম্ভবত প্রকৃতি ও পরিধি নির্ধারণে যে বিষয়টি ইঙ্গিত করেছে; তা হলো অনৈতিক ও অসাধু পন্থায় কথিত লবিং তথা অপসংস্কৃতির যথেচ্ছাচার। মিথ্যাচার, প্রতারণা, ছলচাতুরী, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পদ-পদবি গ্রহণের নিকৃষ্ট অবান্তর উপায়াশ্রিত ব্যক্তির মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা নিরূপণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগদানের পটভূমি তৈরি করেছে, তার নির্বিশঙ্ক মূল্যায়ন অতীব প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতির অসাধারণ উচ্চারণ ছিল উপাচার্য হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক লিডার। উল্লেখ্য, শিক্ষা নেতৃত্বের যথার্থ প্রগত গুণাগুণ, নৈর্ব্যক্তিক বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচার-বিশ্লেষণ কতটুকু নির্ণীত; একটি সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে দেশের সকল সরকারী-বেসরকারী মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে নিদেনপক্ষে বিগত দশ বছরে উপাচার্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের একটি তুলনামূলক সমীক্ষা করা যেতে পারে।

সৃজন ও মননশীল, শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রচেতা; নিখাঁদ দেশপ্রেমিক, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চেতনায় পরিপূর্ণ ঋদ্ধ জাতির বোধিদ্রুম প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বা শিক্ষা, উপশিক্ষামন্ত্রীর পক্ষে উল্লিখিত পদ-পদায়নে বিবিক্ষু অনুসন্ধান সম্ভব নয়। বিবর্ত এসব মনোনয়ন-পরিবর্তনে তৃণমূল পর্যায় থেকে উঁচু মার্গের দল, ছাত্র-যুব-শ্রমিক-কৃষক অঙ্গ সংগঠনের নেতানেত্রীর অনৈতিক তদ্বির-সুপারিশ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেনতেনভাবে বর্ণচোরা, অনুপ্রবেশকারী, স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশে ভূমি-মিল-কারখানা দখলদার-অবৈধ ব্যবসায়ী, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা-ষড়যন্ত্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কুশীলব, দলবদলে পারদর্শী উচ্চাভিলাষী সামরিক সরকার ও এদের সৃষ্ট দল-উপদলে নির্লজ্জ পদ-পদবিধারীদের বশংবদরা বর্তমানে বিভিন্ন প্রহরণ ও অপকৌশলে শিক্ষাসহ নানা প্রতিষ্ঠান যেন এসব নষ্ট-ভ্রষ্টদের দখলকৃত না হয়, সেদিকে সবার বিশেষ করে নীতিনির্ধারকদের অধিকতর মনোযোগী হওয়া আবশ্যক।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সরকার গঠন এবং চলমান ক্ষমতায়নে নিবিষ্ট ত্যাগী, সৎ, নৈতিক ও মেধাবীদের যোগ্যতা সাপেক্ষে অবমূল্যায়ন হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিবর্গ শুধু সমাকীর্ণ হতাশায় নিমজ্জিত হবেন না, এতে ক্ষোভ-যন্ত্রণাকাতর এবং নীরব বৈমুখ্যদের সংখ্যা দীর্ঘায়িত হবে। নয়নানন্দ অপ্রতিরোধ্য অদম্য অগ্রগতিতে উন্নয়ন পরিক্রমায় অবহেলিত-আড়ালকৃত যোগ্যদের যথাস্থানে প্রতিষ্ঠিত করা না হলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার দিগঙ্গনা টেকসই ভিত তৈরি বিপর্যস্ত হবে।

সাম্প্রতিককালে জাতি পরজীবী ক্ষুদ্রসংখ্যক গণমাধ্যম এবং গুটিকতক কথিত সাংবাদিক মুখোশধারী অপসাংবাদিকতায় লিপ্ত ব্যক্তি সমন্বিত সিন্ডিকেটেড গোষ্ঠী সরকারের অতুলনীয় এবং ঈর্ষনীয় সামগ্রিক উন্নয়ন উপস্থাপন করতে কেন জানি অনীহায় পরিকীর্ণ। তারা হয়ত স্মরণবিচ্যুত হয়েছেন যে, বাঙালী জাতি-রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে কখনও কোন পরাশ্রিত পরাভব মেনে নেয়নি। তাঁর কন্যার নেতৃত্বেও এই বাতাবরণ অবশ্যই অবিচল থাকবে। তাদের কেউ কেউ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের চরিত্রহনন, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নানাবিধ অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিহিংসা-বিদ্বেষমূলক-প্রতিশোধপরায়ণ হয়রানির নিকৃষ্ট পন্থায় ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে ব্যতিব্যস্ত। অর্থ-ক্ষমতা-প্রভাবলিপ্সু শূন্য মেধা-প্রজ্ঞা ও যোগ্যতায় প্রতনু অতিমাত্রায় পদ-পদক-পদবি আদায়ে নির্লজ্জ ছলচাতুরী-প্রতারণায় অভ্যস্ত ঘৃণ্য-নপুংসক দল এসব কথিত গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রণোদিত এবং প্রণমিত সহায়তাপ্রাপ্ত হয়ে পরাজিত অন্ধকারের রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির কৌশলপত্র বাস্তবায়নে পবিত্র সাংবাদিকতা-গণমাধ্যম জগতকে করছেন নিদারুণ অপবিত্র ও কলুুষিত।

শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, আইন-আদালত, সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থা, বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সকল পর্যায়ে যেন এক কঠিন অদৃশ্য বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা, মিথ্যাচার, সততা ও সত্যবাদী ব্যক্তিত্বদের চরিত্রহীনতার অরুচিকর মিডিয়াট্রায়াল, বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক কথিত মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে হয়রানি, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœœ, রূপকল্প বাস্তবায়নে বিয়োজিত বা অশুভ পরিকল্পনায় দেশবাসীকে ভড়কানো বা আতঙ্কগ্রস্ত করার হীন প্রচেষ্টা কিনা, তা খতিয়ে দেখার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। উচ্চ শিক্ষাসহ সর্বস্তরে শিক্ষার ব্যুৎপন্ন ভবিষ্যত নির্মাণে শিক্ষা ও শিক্ষা ও উপমন্ত্রীর এবং মন্ত্রণালয়ের উদ্ভাবনী দিগ¦লয় জাতিকে উৎসাহিত ও প্রাণিত করার উদ্যোগ সর্বত্রই সমাদৃত। সমন্বিত ভর্তি কার্যক্রম, নিয়োগ-টেন্ডার বাণিজ্য, বিশ্ববিদ্যলয়ের অধিকৃত ভূমি-সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের ব্যূহভেদ করে রাষ্ট্রের সম্পদ সুরক্ষা ইত্যাদি তদারকিতে মন্ত্রণালয়ের অধিকতর ব্রততী হওয়া অপরিহার্য। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সম্পদ সুরক্ষার পরিবর্তে সম্পদ লুন্ঠনে সহযোগিতা পরিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।

সর্বত্রই বিরূপচিত্রে রাষ্ট্রকে ক্ষত-বিক্ষত করা এবং উন্নয়ন সমৃদ্ধির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই কঠিন আইনের আওতায় নিয়ে আসা প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সূত্রমতে জাতি অবহিত হয়েছে যে, দেশব্যাপী নারী-শিশু ওপর নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ৫১ দশমিক ৬২ ভাগ ধর্ষণের চিত্র এবং প্রতিমাসেই এই সংখ্যা গড়ে ৫৯৯। ২০১৯ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের মামলা হয়েছে ১৭৯৯ টি। একই সময়ে গণধর্ষণের ঘটনা ১২৫টি, ছেলে শিশুর সংখ্যা ৩৮, কন্যাশিশু ৫৫৮। এর বিপরিতে সাজার হার মাত্র ১১ দশমিক ২৬। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সুশাসন ব্যবস্থা এবং প্রতিশ্রুত উদ্যোগ গ্রহণও একান্ত জরুরী। প্রতিমুখ অবজ্ঞায় খেলাপী ও লুণ্ঠন সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা কোনভাবেই যেন আলোকময় অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করতে না পারে, সেদিকে দৃঢ় মনোনিবেশের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ১০৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ৮২৩৮ ঋণ খেলাপী ব্যক্তি ও কোম্পানির নাম প্রকাশ করেছেন। নবেম্বর ২০১৯ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণ ও অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ৯৬৯৮৬ কোটি ৩৮ লাখ এবং ২৫৮৩৬ কোটি টাকা। সবচেয়ে উদ্বেগের যে বিষয় তাহলো, ব্যাংকের মালিক ও পরিচালকদেরই অপরিশোধিত ঋণের পরিমান প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১ শতাংশের বেশি। হাইকোর্টও এই বিষয়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা প্রকাশ করে টেকসই অর্থনীতি সচল রাখতে পরিচালনা পর্ষদসহ ব্যাংক পরিচালনাকারীদের অবশ্যই স্বচ্ছ ও জবাবদিহি করার নির্দেশনা দিয়েছেন। মাদক-সন্ত্রাস-দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভূমি দখল, ছিনতাই, হত্যা, আত্মহত্যা ইত্যাদির চিত্র এবং পরিসংখ্যান প্রায় দুঃসহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পদ-পদবি ধারণ করে অপকৌশল এবং সুসংঘটিত পরিকল্পনার জিঘাংসা বাস্তবায়নে জাতি-রাষ্ট্র এবং সরকারকে বিপন্ন করছে কিনা, নিরন্তর-নিয়মিত জবাবদিহি ও তদারকির পরিপূর্ণ আওতায় নিয়ে এসে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখার পুণ্যোদয় প্রত্যাশায় পুরো জাতি পবিত্রতম মুজিববর্ষ অবগাহনে পুরোমাত্রায় নিবেদিত।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত : ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০

১৮/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: