১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কম, নেই সম্পদ রক্ষার পদক্ষেপ

প্রকাশিত : ১৫ নভেম্বর ২০১৯
  • দেশের উপকূল দুর্যোগপ্রবণ তাই আঘাত আসছে বারবার

শাহীন রহমান ॥ ২০০৭ সালে দেশের উপকূলে আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর। এর এক বছরের পরই ২০০৯ সালে আবার আইলার আঘাত। সিডর এতই প্রলয়ঙ্করী ছিল যে এর আঘাতে ৫ থেকে ৭ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আর আইলায় প্রাণ যায় প্রায় ২শ’ জনের। এই সিডর আইলা বাদ দিলে গত ১০ বছরের যত ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে সব ক্ষেত্রে দক্ষ সিগন্যালিং এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সামর্থ্যরে কারণে প্রাণহানি হয়েছে সামান্যই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন দক্ষ ব্যবস্থাপনায় ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কমলেও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত যথাযথ পদক্ষেপ নেই। ফলে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে আগের মতোই।

গত ৯ নবেম্বর মধ্যরাতে উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। এই ঘূর্ণিঝড়েও মারা গেছে ২৩ তাজা প্রাণ। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ফসলের। তবে শক্তির বিচারের এই ঘূর্ণিঝড় আইলায় চেয়ে কোন অংশেই কম ছিল না। গত এপ্রিলের শেষদিকে আঘাত হানা ‘ফণী’র শক্তি ছিল সিডরের প্রায় কাছাকাছি। বিশ্লেষণ করে দেখলে দেখা যাবে দুটি ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেয়ার ক্ষেত্রে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছে আবহাওয়া অফিস। আর তাদের সতর্কতায় এটি মোকাবেলায় সক্ষম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পেরে প্রশাসন।

আবহাওয়া অফিস সূত্র মতে ‘বুলবুল’ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়ার আগেই এর গতিবিধির ওপর তীক্ষè পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। যে স্থানে এই ঘুর্ণিঝড়ের জন্ম, সেখান থেকে গতিপথ কোনদিকে যাবে তাও বোঝা মুশকিল ছিল। ক্ষণে ক্ষণে এই ঘূর্ণিঝড় গতিপথ বদল করছিল। যে কারণে নি¤œচাপ থেকে গভীর নি¤œচাপে রূপ নেয়ার আগেই উপকূলে বা সমুদ্র বন্দরসমূহে কোন সতর্কতা দেয়া হয়নি। কিন্তু গভীর নি¤œচাপের রূপ নেয়ার পরপরই তারা সতর্কতা সঙ্কেত দেয়। তখন তারা জানান এর গতিপথ বাংলাদেশের দিকেই। যদিও তারা প্রথম জানাতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশের ঠিক কোন উপকূলে এটি আঘাত হানবে।

জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়ার পরপরই বাংলাদেশের উপকূল ঝুঁকির মধ্যে বলে গণ্য করা হয়েছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়টির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বারবার বদলানোর এটি কোথায় আঘাত হানতে পারে তা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত একদিন আগে তারা নিশ্চিত হন যে এটি সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হানবে। এ কারণে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত মোকাবেলায় সর্বোচ্চ ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি করা হয়। আবহাওয়া অফিসের এই ১০ নম্বর সংকেতের অর্থ হলো দেশের সমুদ্র বন্দর এবং উপকূলসমূহ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের কবলে নিপতিত। ঝড়ে বাতাসের একটানা গতিবেগ ধরা হয় ঘন্টায় ৮৯ কিলোমিটার। যদিও ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের বাতাসের গতিবেগ আরও অনেক বেশি ছিল। প্রথমে বাতাসের গতিবেগ ছিল একটানা ১৫০ কিলোমিটার। পরে তা কমে ৯০ থেকে ১১০ কিমির বেগে আছড়ে পড়ে সুন্দরবনের ওপর।

তবে আবহাওয়া অফিস জানায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করায় ঘূর্ণিঝড়ের সঠিক গতিপথ ও বাতাসের গতিপথ নিরূপন করা সম্ভব হচ্ছিল। আবহাওয়া অফিসের এই পূর্বাভাসের কারণেই দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উপকূলীয় জেলাগুলোয় লোকজনকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে যওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়, করা হয় মাইকিং। ঝড় আসার আগেই ২১ লাখ লোক আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যায়। ফলে এই ঝড়ে ব্যাপক সম্পদ বা ফসলহানি ঘটলেও প্রাণহানি অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ের মধ্যে থাকে।

শুধু ‘বুলবুল’, ‘ফণী’ নয়, সিডর আইলার পর গত ১০ বছরে দেশের উপকূলে নার্গিস, মহানসেন, কোমেন, রোয়ানু ও মোরা’র মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এসব ঘূর্ণিঝড়ে সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও আবহাওয়া অফিসের সময়মতো সঠিক পূর্বাসে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন উপকূলে টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে ঝড়পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে। দুর্যোগ সম্পর্কে উপকূলীয় লোকজনকে আরও সচেতনতার পাশাপাশি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় আরও দক্ষ করে তুলতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রতিবছরই দেশের ওপর দিয়ে এক থেকে দুটি কোন বছর এর বেশি ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। কিন্তু আগে থেকে সিগন্যাল দেয়া হলেও অনেকে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। ফলে নিজ বাড়িতে ঘরবাড়ি ও গাছপালা চাপা পড়ে বেশি মানুষ মৃত্যু হয়। বুলবুলের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আবহাওয়া বার্তা পেয়েই উপকূলের ১৩ জেলার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্ত বরাবরের মতো অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর চাপাচাপি আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়।

এাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডাঃ এনামুর রহমান বলেছেন, দেশে ৫ হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ লাখ লোককে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল। ঝড়ের বার্তা পেয়েও অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। তাদের বাধ্য করা হয়েছিল আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে। ফলে এবারের ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি অনেক কম হয়েছে।

আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন কর্মকর্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ক্ষণে ক্ষণে আবহাওয়ার আপডেট হয়েছে। সারারাত জেগে আবহাওয়া অফিস ঝড়ের গতি পর্যবেক্ষণ করে প্রশাসন ও মিডিয়ার কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। এর আগে ঘূর্ণিঝড় ফণী সতর্কতা দেয়ার ক্ষেত্রেও তারা একই দক্ষতা দেখাতে পেরেছিল। ফণে ফণীর আঘাতেও প্রাণহানির সংখ্যা অনেক কম ছিল। তিনি বলেন, আগামীতে পূর্বাভাস দেয়ার ক্ষেত্রে যেসব ঘাটতি আছে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হবে।

প্রকাশিত : ১৫ নভেম্বর ২০১৯

১৫/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: