২৩ জানুয়ারী ২০২০, ১০ মাঘ ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

উন্নয়নশীল দেশ হতে বাংলাদেশকে পাশে চায় নেপাল

প্রকাশিত : ১৪ নভেম্বর ২০১৯
  • রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা

বিডিনিউজ ॥ বাংলাদেশের উন্নয়নের পথরেখা ধরে এগোতে চায় প্রতিবেশী দেশ নেপাল; সেজন্য চাইছে বাংলাদেশের সহযোগিতা।

বুধবার রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাতে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে তারা বাংলাদেশের সহযোগিতা চাচ্ছেন। নেপাল সফররত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে হোটেলে এসে দেখা করেন কে পি শর্মা অলি। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে তাদের বৈঠক চলে।

রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মোঃ জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘নেপালের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করে বলেছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হচ্ছে। এজন্য তিনি বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান।

‘নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করতে নেপাল সকল ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই লক্ষ্যে নেপাল বাংলাদেশের

সঙ্গে কাজ করতে চায়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায়।’

প্রেস সচিব বলেন, ‘নেপালের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘সমৃদ্ধ নেপাল, সুখী নেপালী’ কর্মসূচীতে বাংলাদেশ সার্বিক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।’

বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহের কথা জানান নেপালের প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এবং নেপাল বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ। ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে।

জল বিদ্যুত খাতে নেপালে বাংলাদেশের বিনিয়োগকে প্রত্যাশা করে কে পি শর্মা বলেন, এ খাতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ করতে পারে, এতে দু’দেশই উপকৃত হবে।

বাংলাদেশে অধ্যয়নরত নেপালী শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার সিদ্ধান্তের জন্য তিনি বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান।

নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। তা কমাতে অলি বাংলাদেশের সহযোগিতা চান।

এর পরিপ্রেক্ষিতে আবদুল হামিদ বলেন, ‘বাণিজ্য বৈষম্য দূরীকরণে শুল্ক ও কোটাসহ অন্য যেসব বাধা আছে তা দূর করা সম্ভব। বাংলাদেশ একটি বড় বাজার। নেপালের উৎপাদনকারীরা তাদের পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করলে বাণিজ্য বৈষম্য কমে আসবে।’

বাংলাদেশের মংলা ও পায়রা বন্দর ব্যবহার করে নেপাল তাদের বাণিজ্য বাড়াতে পারে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন বাংলাদেশ এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করবে।

রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের সঙ্গে বৈঠকে নেপালের বিরোধীদলীয় নেতা ও নেপালী কংগ্রেস পার্টির প্রেসিডেন্ট শের বাহাদুর দেউবা

বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল (বিবিআইএন) সড়ক যোগাযোগের বিষয় তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল তাদের মধ্যে কানেক্টিভিটি বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশ নেপাল থেকে জল বিদ্যুত নিতে আগ্রহী উল্লেখ করে এলক্ষ্যে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেন আবদুল হামিদ।

তিনি এ সময় আরও বলেন, দু’দেশের কানেক্টিভিটি বাড়াতে উভয় দেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করলে দু’দেশই উপকৃত হবে।

রাষ্ট্রপতি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রতি নৈতিক সমর্থনের জন্য নেপালের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বহুপাক্ষিক ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

নেপালের লুম্বিনিতে গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থানে নেপালের মাস্টারপ্ল্যানে বাংলাদেশের জন্য একটি প্লট বরাদ্দ রাখার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আবদুল হামিদ বলেন, এর ফলে দু’দেশের বৌদ্ধ ধর্মীয় মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনে নেপালের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল যোগ দেবে বলে আশা করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, মানবিক কারণে বাংলাদেশ ১১ লাখেরও বেশি মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নাগরিকদের আশ্রয় দিয়েছে। তারা সময়মতো ফেরত যেতে না পারলে শুধু বাংলাদেশ নয় এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে। তিনি এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানে নেপালের জোরালো সমর্থন আশা করেন।

এ প্রেক্ষাপটে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী একটি বড় সমস্যা। এর আশু সমাধানে তার দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নেপাল ‘সিরিজ ডায়ালোগ’ আয়োজন করবে জানিয়ে কে পি শর্মা এ বিষয়ে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আশা করেন।

পরে নেপালের ভাইস প্রেসিডেন্ট নন্দ বাহাদুর পুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সাক্ষাতের সময় তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেল দুর্ঘটনায় হতাহাতের ঘটনায় দুঃখ ও সমবেদনা প্রকাশ করেন তিনি।

এর আগে নেপালের বিরোধীদলীয় নেতা ও নেপালী কংগ্রেস পার্টির প্রেসিডেন্ট শের বাহাদুর দেউবা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সাক্ষাতের সময় তারা দু’দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সফর বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সাক্ষাতের সময় সংসদের হুইপ আতিউর রহমান আতিক, সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব সম্পদ বড়ুয়া, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এসএম শামীম উজ জামান উপস্থিত ছিলেন।

শুধু নেপালী শিক্ষার্থীদের জন্যই

মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা

এদিকে অপর এক খবরে বাসস জানায়, রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ বলেছেন, শুধুমাত্র নেপালী শিক্ষার্থীদেরকে চার বছর অথবা কোর্সের সময়কালের জন্য দীর্ঘমেয়াদী মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা প্রদানের সুবিধা দিয়ে থাকে বাংলাদেশ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির সহ-সভাপতি পুষ্প কামাল দাহাল (প্রচ-) বুধবার দুপুরে মেরিয়ট হোটেলে সঙ্গে সাক্ষাত করতে এলে রাষ্ট্রপতি তাকে এ কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতির বরাত দিয়ে তার প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন বলেন- ‘নেপাল সরকারের অনুরোধ বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ ২০১৯ সালের জুন থেকেই নেপালী শিক্ষার্থীদেরকে দীর্ঘ চার বছর বা কোর্সের সময়কালের জন্য দীর্ঘমেয়াদী মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা প্রদান করছে।’

ঐতিহাসিক ও অনেক অভিন্ন বিষয়ের যোগসূত্রের ভিত্তিতে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্ববহন করে বিষয়টি উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি হামিদ বলেন, যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রূপান্তরিত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

এর আগে, নেপালের জাতীয় পরিষদের (আপার হাউস) চেয়ারম্যান গণেশ প্রসাদ টিমিলসিনা রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে এখানে এসে সাক্ষাত করেন। রাষ্ট্রপতি তার সঙ্গে আলাপকালে ও দু’দেশের ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আবদুল হামিদ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করে বলেন, উভয় দেশকে বঙ্গোপসাগর বিষয়ক উদ্যোগের জন্য আগ্রহ সহকারে বিমসটেকের পাশাপাশি সার্কের প্ল্যাটফর্মের আওতাধীন ক্ষেত্রগুলোতে নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করা দরকার।

পরে বিরোধীদলীয় নেতা এবং নেপালী কংগ্রেস দলের সভাপতি শের বাহাদুর দেউবাও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত করেন।

সব দলের নেপালী নেতৃবৃন্দ তার (রাষ্ট্রপতি) সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সুখ এবং বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষের জন্য, অব্যাহত শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার কামনা করেছেন।

বৈঠকগুলোতে হুইপ আতিউর রহমান আতিক, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি, পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহিদুল হক, রাষ্ট্রপতির সচিব সম্পদ বাড়ুয়া, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল শামীম-উজ-জামান ও প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নেপালের প্রেসিডেন্টের বৈঠক ॥ এদিকে বাসস জানায়, বাংলাদেশ ও নেপাল জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে একযোগে কাজ করবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভা-ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নেপালের রাষ্ট্রপতির বাসভবন শীতল নিবাসে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে একই অভিমত ব্যক্ত করেন। উভয় দেশের রাষ্ট্রপতি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক বজায় রাখায় একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা এবং কাঠমা-ু দুই দেশের মধ্যে সড়ক, রেল, নৌ ও বিমান যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উভয় দেশ গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নেপালের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার। তবে বাংলাদেশ ও এর জনগণ সব সময় আমাদের হৃদয়ে।’

নেপালের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সৈয়দপুর থেকে নেপালের ভদ্রপুর, বিরাটনগর অথবা ভৈরবা বিমান যোগাযোগের অনুরোধ জানালে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগে নিজেই এ প্রস্তাব দিয়েছেন। উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট বলেন, দুই দেশই এ যোগাযোগ স্থাপনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। বৈঠকে দেবী ভা-ারি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতির ভূয়সী প্রশংসা করেন।

প্রকাশিত : ১৪ নভেম্বর ২০১৯

১৪/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: