২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৮ ফাল্গুন ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

রূপ হারানো রূপালী পর্দা, নানা অভিঘাতে পর্যুদস্ত

প্রকাশিত : ১৭ অক্টোবর ২০১৯
রূপ হারানো রূপালী পর্দা, নানা অভিঘাতে পর্যুদস্ত
  • বাংলা সিনেমার করুণ ছবি স্পষ্ট করল রাজমনি

মোরসালিন মিজান ॥ নবাব সিরাজউদ্দৌলা চলচ্চিত্রের কাহিনী মনে পড়ে যাচ্ছে যেহেতু, বলি। অন্যদেরও মনে থাকার কথা। বাঙালী জাতীয়তাবাদের উজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এ সিনেমার প্রথমভাগে বিশাল রাজপ্রাসাদ। শান শওকত। সিংহাসনে জরির জামা পরে বসে থাকা নবাব। ভরাট কণ্ঠে একের পর এক আদেশ নির্দেশ। কিন্তু সিনেমার কাহিনী একটু গড়াতেই বিপরীত ছবি। শেষভাগে এসে করুণ সুর। নেপথ্য কণ্ঠে কিংবদন্তি শিল্পী গাইছেন, এ-কূল ভাঙ্গে ও-কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা/সকাল বেলা আমির যে ভাই ফকির সন্ধ্যা বেলা...। পর্দায় তখন ভেসে উঠছে ক্ষমতা হারানো নিঃস্ব নবাবের মুখ। আনোয়ার হোসেনের করুণ চেহারা দেখে কত দর্শক যে কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন! অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে আজ মনে হচ্ছে, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা যে ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন সে একই ট্র্যাজেডি বরণ করেছে বাংলা চলচ্চিত্র। চোখের সামনে পচে গলে নষ্ট হয়েছে সিনেমা। এত বড় ইন্ডাস্ট্রি! মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখন সিনেমা নেই। বাংলা চলচ্চিত্রের সুদিনে গড়ে ওঠা হলগুলো দুর্দিনের সাক্ষী হয়ে কোনরকমে দাঁড়িয়ে আছে।

জানা যায়, ৮০’র দশকের প্রথম কয়েক বছর দেশে পেক্ষাগৃহের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০। প্রতি বছর মুক্তি দেয়া হতো ২০টির মতো চলচ্চিত্র। পরবর্তী সময়টা আরও ভাল গেছে। কয়েক বছরের মধ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ও পেক্ষাগৃহের সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। শুধু বাড়া নয়, দ্রুত কয়েকগুণ হয়ে গিয়েছিল। জীবন ঘনিষ্ঠ সিনেমা নির্মাণ, বিপুল দর্শক চাহিদা, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাসহ আরও কিছু কারণে দেখতে দেখতে হলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪০০। সিনেমার সংখ্যা বেড়ে হয় ১২০টির মতো। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সময়টা বেশ গেছে। এ সময় বিনোদনের বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া হলেও, সিনেমার গল্প জীবন থেকে খুব একটা বিচ্যুত হয়নি। ১৯৯৬ সালে জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর পর একটা বড় ধাক্কা খায় বাংলা সিনেমা। ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা তখনও ছিল। কিন্তু অচিরেই শুরু হয়ে যায় অশ্লীল সিনেমা বানানোর প্রতিযোগিতা।

মেধাহীন নির্মাতাদের একটি দল কম খরচে অশ্লীল ছবি বানানোর কাজ শুরু করেন। হলগুলোতে দর্শক উপস্থিতিও কিছুটা বাড়ে। কিন্তু সাময়িক এই উত্তেজনা স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়। পরিবার পরিজন নিয়ে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসে বড় একটি অংশ। অশ্লীলতাও মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বিরূপ প্রভাব পড়ে ইন্ডাস্ট্রিতে। তখন থেকেই বন্ধ হতে থাকে হলগুলো। সারাদেশ থেকে নিয়মিতই আসতে থাকে হল বন্ধের খবর।

সর্বশেষ গত ১২ অক্টোবর বন্ধ করে দেয়া হয় ঢাকার বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহ রাজমনি। রাজধানী শহরে অবস্থিত পুরনো নামকরা একটি প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ করে দেয়ার ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে চলচ্চিত্রের দুর্দিন। তবে কি দিন ফুরলো বাংলা চলচ্চিত্রের? আর কি সেই সোনালি দিনে ফেরা হবে না? সারা বিশ্বে যখন সিনেমার জয়জয়কার তখন কেবল বাংলাদেশেই তলিয়ে যাবে সব? ‘নিজেকে হারিয়ে খুঁজি।’ খুঁজবে না আর কেউ নিজেকে?

উত্তর খুঁজতে বুধবার ঢুঁ মারা হয় রাজমনি সিনেমা হলে। তার আগে হলের ইতিহাসটি স্মরণ করিয়ে দেয়া যাক। ৮০’র দশকে ২৪ একর জমির ওপর এই প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করা হয়। ১৯৮৩ সালের ৩ মার্চ থেকে শুরু হয় প্রদর্শনী। প্রথম দিন প্রদর্শিত হয় কামাল আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘লালু-ভুলু।’ ৯০১ আসন বিশিষ্ট সিনেমা হল। প্রথম দিনেই হাউসফুল। কানায় কানায় পূর্ণ। যতদূর তথ্য, ৮০ ও ৯০-এর দশকে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করে এই পেক্ষাগৃহ। এর পর ধীরে ধীরে কমতে থাকে দর্শক। গত ৫ থেকে ৭ বছর ধরে চলছিল দর্শক খরা। ক্ষতি পোষাতে না পেরেই হল বন্ধের সিদ্ধান্ত।

হলের মালিক আহ্সান উল্লাহ মনি স্মৃতিচারণ করে মনি বলছিলেন, আমার স্ত্রীর নাম রাজিয়া। তার নামের প্রথম অংশ আর আমার নামের শেষাংশ নিয়ে হলটির রাজমনি নামকরণ করা হয়েছিল। কাকরাইলের মতো ব্যস্ত এলাকায় চার রাস্তার মোড়ে সিনেমা হল। সব দিক থেকেই দর্শক আসতেন। শুধু ঢাকা নয়, আশপাশের এলাকার লোক বই দেখতে আসতেন এখানে। টিকেটের চাহিদা এত ছিল যে, লম্বা সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে ব্যর্থ হতেন। টিকেট না পেয়ে হলে ভাংচুরের ঘটনাও ঘটানো হয়েছে। চাহিদা বেশি হওয়ায় প্রচুর টিকেট কালবাজারিদের হাতে চলে যেত। পরে হলের বাইরে চড়া দামে বিক্রি হত। তাও দর্শক টিকেটের পেছনে ছুটতেন।

আর শেষ দিনগুলোতে রাজমনিতে দর্শক হতো ১০ থেকে ১৫ জন। ৮৮০ থেকে ৮৮৫ আসন ফাঁকা পড়ে থাকত। এ দৃশ্য নিজের চোখে দেখা যায় না। এ কারণে গত পাঁচ বছর একই ভবনে অফিস করেও, হলে ঢোকেননি বলে জানান তিনি। মনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সারা দেশের সিনেমা হলের একই অবস্থা। এ অবস্থার কারণ জানতে চাইলে তিনি বার বারই বলছিলেন, ভাল বই হয় না। বই আর হবেও না। এখন নাটকের লোকদের দিয়ে বই বানানো হচ্ছে। এসব লম্বা নাটক হলে দেখবে না দর্শক। ডিজিটাল চলচ্চিত্রও মূল ধারার ক্ষতি করেছে বলে অভিমত তার। তিনি যোগ করেন, এখন ইন্টারনেটের যুগ। ঘরে বসেই সব পাওয়া যাচ্ছে। স্যাাটেলাইট এসেছে। এ অবস্থায় বাধ্য হয়েই হল বন্ধ করেছেন বলে জানান তিনি। যে হলের আয় দিয় এতকিছু গড়েছেন, সেটি বন্ধ করতে গিয়ে মন খারাপ হচ্ছে না? এমন প্রশ্নে অবাক করা উত্তর দেন তিনি। খারাপের কিছু নেই। এখানে ২০তলা কমার্শিয়াল ভবন হবে। ভাল না?

অবশ্য ম্যানেজার জিয়াউল আলমের মন বিষণœ বলেই মনে হলো। তিনি বলছিলেন, আনুমানিক সাড়ে নয় শ’ ছবি প্রদর্শিত হয়েছে এখানে। কী যে উৎসব আনন্দ লেগে থাকতো! হলের ভেতরে থাকত ১০০ জন দর্শক, তো বাইরে অপেক্ষা করতো আড়াই শ’। অথচ গত কয়েক বছর ধরে সব খা খা করছিল। এর চেয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ভাল বলে নিজেকে প্রবোধ দেন তিনি।

টিকেট কাউন্টারে কাজ করেন কফিল উদ্দীন। গত প্রায় ৩৫ বছর ধরে এ কাজ করছেন। আগামী শুক্রবার থেকে আর করবেন না। মন তাই ভীষণ খারাপ। বললেন, ‘মালিক হয়ত অন্য কাজ দিব আমারে। কিন্তু হল তো আর থাকবো না ভাবলে খারাপ লাগে। কিন্তু কী আর করা?’

হ্যাঁ, সাধারণের দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হতেই পারে, কিছু করার নেই। আসলেই নেই?

প্রকাশিত : ১৭ অক্টোবর ২০১৯

১৭/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: