২৩ জানুয়ারী ২০২০, ১০ মাঘ ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বর্ণাঢ্য আয়োজনে খেলাঘরের জাতীয় সম্মেলন

প্রকাশিত : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
  • সংস্কৃতি সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সকাল থেকেই রাজধানীর শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণ শিশু-কিশোরদের কলকাকলীতে মুখরিত। ‘আমরা কারা শান্তির পায়রা’, ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ কর’, ‘শিশু নির্যাতন বন্ধ’ এসব স্লোগানে পুরো এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে এক উৎসবের আমেজ। এমন উৎসব মুখর পরিবেশে শিশু একাডেমির উন্মুক্ত মঞ্চে শুক্রবার সকালে শুরু হয় ‘কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর জাতীয় সম্মেলন ২০১৯’। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খেলাঘর সদস্যরা হাজির হয়েছে এ উৎসবে। শিশুদের নাচ, গান, আবৃত্তি আর অতিথিদের কথামালায় উদ্বোধনী আয়োজন ছিল বর্ণাঢ্য। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন খেলাঘর আসরের উপদেষ্টা জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। এ সময় তিনি বলেন, ইংরেজ শাসনকালে কোন কোন বাংলা দৈনিকের ছোটদের পাতা অবলম্বন করে শিশু কিশোর সংগঠন গড়ে উঠে। আনন্দবাজারের ছিল মনিমালা, কিশোরবাহিনী, দৈনিক আজাদে ছিল মুকুলের মহাফিল ইত্যাদি। গড়ে ওঠা ওইসব সংগঠনে ছোটদের মানষিক এবং শারীরিক বিকাশের নানা ব্যবস্থা থাকত যা পরবর্তী জীবনে তাদের খুব কাজে এসেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে এগুলো স্তিমিত হয়ে যায়। তখন আমাদের এখানে নতুন করে দেখা দেয় প্রথমে খেলাঘর তারপরে কচিকাচার মেলা। বাংলাদেশ হওয়ার পরে আমরা এখন দেখছি যে আগের মতো শিশু-কিশোর সংগঠনে ছেলেমেয়েরা যুক্ত হয় না। তারা পরীক্ষা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে এরসঙ্গে যুক্ত হওয়ার কোন অবকাশই তারা পায় না। আমি অভিভাবকদের বলব, এইসব সংগঠনে যোগ দিয়ে তাদের সন্তানরা যাতে শারীরিক ও মানষিক বিকাশের সুযোগ পায় এদিকে লক্ষ্য দিন। এটা তাদের পরীক্ষায় কয়েক নম্বর বেশি পাওয়ার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা তাদের শিশু-কিশোর সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করবেন। এর মধ্য দিয়ে তাদের শরীর ও মন সতেজ থাকবে। দেশকে ভালবাসবে, সমাজের প্রতি কর্তব্য পালন করবে। আমি আশাকরি খেলাঘর তার গৌরব অক্ষুণœ রাখবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এই সম্মেলন সার্থক হোক। খেলাঘরের প্রতিটি সদস্য যেন তাদের পরিপূর্ণতা খুঁজে পায় এই কামনা করি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। সম্মানিত অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিশু একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য নিরঞ্জন অধিকারী, ভারতের শিশু সংগঠক সব্যসাচী চৌধুরী ও পীযুস প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমন্ডলীর চেয়ারম্যান অধ্যাপক পান্না কায়সার।

জাতীয় সঙ্গীত ও পতাকা উত্তোলনের মধ্যদিয়ে শুরু হয় উদ্বোধনী পর্ব। পরে ‘আমরাত সৈনিক শান্তির সৈনিক অক্ষয় উজ্জ্বল সূর্য’ দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে সংগঠনের শিশুরা। এ সময় বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে উদ্বোধনী আবেশ সৃষ্টি করেন অতিথিরা। এরপর ‘জাগো সত্যের শুভ্র আলোয় গ্রাম থেকে জেগে ওঠো শহর থেকে জেগে ওঠো’ ও ‘শ্বেত কপত আঁকা শান্তি পতাকা’ গানের সঙ্গে পরিবেশিত হয় দলীয় নৃত্য।

অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন অনিকেত আচার্য এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের শিশু সদস্য সেমন্তী ও অক্লান্তী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেন, আমি ২২ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একেবারে শূন্যের কোঠা থেকে দেশটাকে তুলে নিয়ে আসেন। আমাদের দুর্ভাগ্য ৭৫ এর ১৫ আগস্ট তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বলা যেতে পারে বাংলাদেশের অগ্রগতির চাকাকে পেছনে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। একুশটি বছর এক অন্ধকার সময় আমরা অতিক্রম করেছি। এখন উনিশ সালে দাঁড়িয়ে একটু বুকটা ফুলিয়েই বলতে পারি আমরা দেশটা তৈরি করেছিলাম আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য। খেলাঘর স্বাধীনতার পূর্বকালে যে ভূমিকা পালন করেছিল, সেই ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্ম নিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক রূপরেখা নিয়ে আসছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের নতুন প্রজন্ম বিনির্মাণের একটি দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে খেলাঘরের জাতীয় সম্মেলন হচ্ছে। আমি সংগঠনটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটন বলেন, বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের সংগঠন খেলাঘর। আমার লেখালেখির প্রেরণা আমি খেলাঘর থেকে পেয়েছি। খেলাঘর শিখিয়েছে কিভাবে বন্ধু হওয়া যায়, দেশ প্রেমিক হওয়া যায়। আজকের শিশুদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সেই বার্তাটি পৌঁছে দেয়া জরুরী যে বার্তায় আমাদের এগিয়ে চলার সাহসের গল্প আছে। বঙ্গবন্ধু আমাদের একটি স্বাধীন দেশ দিয়েছেন, আর এই দেশকে গড়ার কারিগর আমরা শিশুদের মাঝে খুঁজে পাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুদের এগিয়ে নিতে যে রূপরেখা পরিকল্পনা করেছেন আমরা সেগুলো বাস্তাবায়নে কাজ করে যাচ্ছি।

অনুষ্ঠানে খেলাঘরের প্রাণ এবং প্রতিষ্ঠাতা শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার স্মৃতিপদক প্রদান করা হয় উদ্বোধক অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানকে।

এছাড়া সংবর্ধনা জানানো হয় বরগুনার আমতলীর শিশু মনিকাকে। তাকে ‘বিজয়িনী যোদ্ধা তুমি’ নামে অবিহিত করা হয়। এ সময় মনিকা বলেন, বরগুনার আমতলীতে আমার বাড়ি। আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি। আমার বাবা-মা গরিব। সেজন্য আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আমি বারণ করলেও শোনে না। তাই আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে থানায় যাই। মহিলা পুলিশ আমার বিয়ে বন্ধ করে। আমি পড়ালেখা করে বড় হতে চাই। আপনারা আমাকে সহযোগিতা করবেন। আমি ভাল মানুষ হতে চাই। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানাতে চাই তিনি যেন আমার মতো সব বাল্যবিয়ে বন্ধ করে।

এরপর শিশু-কিশোরদের এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। পরে শুরু হয় কেন্দ্রীয় কাউন্সিল পর্ব। সম্মেলনের তৃতীয় পর্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যায়। এ পর্বের শুরুতে শিশুদের কণ্ঠে ছিল সম্মেলক গান ‘ধন্যধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’। শিশুরা এক এক করে পরিবেশন করে দলীয় সঙ্গীত ‘আমরা মিলেছি আজ পূর্বে পশ্চিমে’, ‘এই দেশটা ভালবেসে এসো’, ‘এই তো আজ মোরা মিলেছি সব’সহ কয়েকটি গান। এছাড়া ছিল ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ আবৃত্তি পরিবেশনা।

সম্মেলনের দ্বিতীয় ও সমাপনী আয়োজন শুরু হবে আজ বিকেল ৫টায়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। বিশেষ অতিথি থাকবেন সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ সামাদ, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। সভাপতিত্ব করবেন খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিম-লীর চেয়ারম্যান অধ্যাপক পান্না কায়সার।

প্রকাশিত : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

২১/০৯/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: