২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শিল্পরূপ পেল না অপার সম্ভাবনার পর্যটন খাত


হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ অপার সম্ভাবনার পর্যটন খাত এখনও বাংলাদেশে শিল্প হিসেবে দাঁড়াতেই পারল না অথচ কর্মসংস্থানের জন্য পর্যটন হতে পারত পোশাক শিল্পের পর দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাত, যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হোটেল, মোটেল, পরিবহন, বিপণি কেন্দ্রসহ অনেক সেক্টর। পৃথিবীর দীর্ঘতম স্যান্ডিবিচ এই বাংলাদেশে। সেই হিসেবে দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভও হওয়ার কথা কক্সবাজার থেকে টেকনাফ। কিন্তু নেই তেমন প্রচার। নেটে সার্চ দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না সমুদ্রকন্যা কক্সবাজারকে। অনেকটা নীরবেই কেটেছে সরকার ঘোষিত পর্যটন বর্ষ। ২০১৬ অতিক্রান্ত হয়ে ২০১৭ সালও প্রায় শেষ। এর মধ্যে যা কিছু অর্জন, তার সবই বেসরকারী খাত এবং সোশ্যাল মিডিয়ায়। সরকারী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ ছিল কথামালাতেই সীমিত, যার বাস্তব প্রতিফলন নেই মাঠপর্যায়ে। ব্র্যান্ডিং করা যায়নি বাংলাদেশকে।

পর্যটন নিয়ে যারা ভাবেন তারা খুবই হতাশ এহেন বেহাল অবস্থায়। তাদের প্রশ্নÑ দীর্ঘতম বালুকাময় সৈকত এবং বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন যে এই বাংলাদেশে অবস্থিত তাও কি আমরা জানাতে পেরেছি বিশ্বের ভ্রমণপিয়াসীদের? অনেক দর্শনীয় পর্যটন স্পট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং পঞ্চগড়সহ জেলায় জেলায় অথচ নেই এসবের কোন ডকুমেন্টারি। তথ্য প্রযুক্তির এমন উৎকর্ষের যুগেও বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া যায় না সেভাবে। শত শত বছর আগে এদেশের সৌন্দর্য উপভোগে ছুটে এসেছিলেন বিশ্বখ্যাত পর্যটকরা। সেই বাংলাদেশের প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ না থাকা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এর জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে কতটুকু সমর্থ হয়েছে সে প্রশ্নটি এসে যায়।

বাংলাদেশের পর্যটনকে তুলে ধরতে ২০১৬ সালকে ঘোষণা করা হয়েছিল পর্যটন বর্ষ। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর কক্সবাজারে বিচ কার্নিভ্যালের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় পর্যটন বর্ষের যাত্রা। সেই বর্ষটি গত হয়ে দ্বিতীয় বর্ষও প্রায় শেষ পর্যায়ে। অবশ্য পর্যটন বর্ষের ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এর মেয়াদ থাকবে তিন বছর অর্থাৎ ২০১৮ সাল পর্যন্ত। সে হিসাবে দুই বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। বাকি আছে মাত্র একটি বছর। এই দুই বছরের অর্জনই বা কতটুকু তা যাচাই করতে গেলে হতাশ হতে হয় পর্যটনসংশ্লিষ্টদের। তারা যেমন আশা করেছিলেন তেমনটি দেখতে পাচ্ছেন না।

সরকারের লক্ষ্য ছিল তিন বছরে অন্তত দশ লাখ বিদেশী পর্যটককে আকর্ষণ করা। কিন্তু এ পর্যন্ত কত পর্যটক বাংলাদেশে এসেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়াও কষ্টসাধ্য। পর্যটক কমেছে না বেড়েছে তা জানাও সহজ নয়। এর জন্য নেই ট্যুরিস্ট স্যাটেলাইট আর্কাইভ (পিএসএ)। ট্যুরিজম বোর্ড এবং পর্যটন কর্পোরেশনের ওয়েব পেজে কিছু বাণী আর বিজ্ঞপ্তি ছাড়া সামগ্রিক ধারণা লাভ করা প্রায় অসম্ভব। যারা আসছেন তাদের মধ্যে কজন পর্যটক আর কজন ব্যবসায়ী তা আলাদা করাও দুরূহ।

বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করা হয় কক্সবাজারকে। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের প্রধান গন্তব্যও এই শহর। সেখানে রয়েছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল, রেস্ট হাউস বোর্ডিং। অনেকে কক্সবাজারকে হোটেলের নগরীও বলে থাকেন। দেশের মানুষের আয় বাড়ায় সেখানে বেড়াবার মানুষ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। এর বাইরে অর্জন তেমন উল্লেখ করার মতো নয়। কেননা, বিদেশী পর্যটক খুব কমই দেখা যায়। বাংলাদেশে অবস্থিত বিশ্বের দীর্ঘতম এ স্যান্ডিবিচ নেই ততটা প্রচারে। এর ফলে টপ টেন সীবিচ, টপ বিউটিফুল সীবিচ বা পৃথিবীর আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকতগুলোর তালিকা গুগলে সার্চ করলে কক্সবাজারের নামটিও সেভাবে পাওয়া যায় না। সঙ্গত কারণেই প্রশ্নÑসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ দায়িত্ব কতটা পালন করতে পেরেছে।

পর্যটনের জন্য প্রয়োজন অন্তত কোন দেশের একটি স্পটকে ব্র্যান্ডিং করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এভাবেই এগিয়েছে। নেটে খুঁজলে ভেসে ওঠে সেই দেশের আকর্ষণীয় স্থান। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমন আকর্ষণীয় কোন চেহারা ভেসে ওঠে না। পর্যটন বর্ষে বিশেষ এমন কী পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়েছে সে প্রশ্ন পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। টেকনাফের সাবরাংয়ে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন, বগুড়ার মহাস্থানগড়কে সার্ক কালচারাল রাজধানী ঘোষণা এবং এ ধরনের কিছু উদ্যোগ এবং পরিকল্পনার কথা জানা যায়। তবে সবকিছু যেন সেমিনার এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনাতেই সীমিত। তুলে ধরা যায়নি বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও সিলেটের সৌন্দর্য অথচ, প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটন সম্পর্কে জানতে নেটে সার্চ করে পাওয়া যায় অসংখ্য দর্শনীয় স্থানের ভিডিওচিত্র। ইলেকট্রনিক চ্যানেলগুলোতেও থাকে তাদের দেশের পর্যটনের বিজ্ঞাপন, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে ভ্রমণে।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুত ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য এমএ লতিফ এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারের অনেক উদ্যোগ রয়েছে পর্যটনকে শিল্পে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে। তবে এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, অগ্রগতি কিছুটা মন্থর। তিনি বলেন, আসলে পর্যটনের জন্য সরকারের খুব বেশি ব্যয় করতে হয় না। এর জন্য প্রধানত প্রয়োজন তিনটি বিষয়। এগুলো হচ্ছে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রচার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এগুলো নিশ্চিত করে প্রচারণায় আনা গেলে একটি স্পট ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন বেসরকারী খাতেই অনেক কিছুই হয়ে যায়। পর্যটনের জন্য কোন ফাইভ স্টার হোটেল কিংবা বিলাসী ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। কারণ, পর্যটকরা সীমিত ব্যয়ে আনন্দ উপভোগ করতে চায়। বাংলাদেশের যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্য রয়েছে তা পর্যটন শিল্পের জন্য খুবই অনুকূল। একদা যখন যোগাযোগ ব্যবস্থার এতটা উন্নতি ছিল না তখনও পর্যটকরা এদেশের টানে ছুটে এসেছেন। কিন্তু এখন এভাবে পিছিয়ে থাকা কাক্সিক্ষত নয়।

এদিকে, পর্যটনে অপার সম্ভাবনা থাকলেও এ খাতকে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা হয়নি বলেও অভিমত অনেকের। কেননা, পর্যটন মন্ত্রণালয় যুক্ত হয়ে আছে বেসামরিক বিমান চলাচলের সঙ্গে লেজুড় হয়ে। তারা মনে করছেন, যদি পর্যটনকে সত্যিই তুলে ধরতে হয় তাহলে এ মন্ত্রণালয়কে রেলের মতোই আলাদা করে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদেশী পর্যটক আকর্ষণের জন্য প্রথমেই ব্র্যান্ডিং করতে হবে সৈকত নগরী কক্সবাজারকে। তুলে ধরতে হবে একপাশে পাহাড় এবং অপর পাশে সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া নান্দনিক মেরিনড্রাইভ। পর্যটকরা প্রথমে একটি দেশ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তবেই ভ্রমণে আকৃষ্ট হন আর অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এ কাজটি করতে হবে সরকারকেই।