১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের উত্থান স্বদেশ থেকে বহির্বিশ্বে


শেখ হাসিনার জন্ম (১৯৪৭ সাল) রাজনৈতিক পরিবারে। তিনি জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ সন্তান। পড়াশোনা করেছেন আজিমপুর গার্লস স্কুল, ইডেন মহিলা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি গ্র্যাজুয়েট। তাই সক্রিয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব গ্রহণের সকল যোগ্যতাই তাঁর ছিল। তারপরেও ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি না ঘটলে সম্ভবত তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে আসা, নেতৃত্ব গ্রহণ কোনটিই হতো না। তিনি আজ জননেত্রী, তৃতীয়বার সরকারের প্রধানমন্ত্রী।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘটিত হয় এক নির্র্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকা-। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত দেশী-বিদেশী শক্তির গভীর ষড়যন্ত্রের ধারায় তাদের এ দেশীয় দোসরদের দ্বারা সংঘটিত এ হত্যাকা-ে প্রাণ হারান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের উপস্থিত সকল সদস্য। এর ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের পরিপন্থী পাকিস্তানী সাম্প্রদায়িক-প্রতিক্রিয়াশীল ধারার প্রত্যাবর্তন ঘটে। স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিদেশে থাকায় শেখ হাসিনা ও তাঁর আপন বলতে একমাত্র ছোট বোন শেখ রেহানা সেদিন প্রাণে বেঁচে যান। অন্যথায়, মা-বাবা, ১০ বছরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা রাসেল ও তিন সহোদর ভাইসহ পরিবারের অন্য সবার মতো খুনীদের হাতে নিশ্চিতভাবে তাঁদের দুবোনকেও ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর ভাগ্যবরণ করতে হতো। তবে এ হত্যাকা-ের পর তাঁকে (শেখ হাসিনা) দীর্ঘ ৬ বছর বিদেশে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে হয়েছে।

১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ১৭ মে তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। এদিন তিনি মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছিলেন কেবল একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে জীবন-যাপনের উদ্দেশ্যে নয়, জাতীয় রাজনীতির হাল ধরতে, সেনাশাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে। এর আগে বিদেশে অবস্থানকালে তিনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। দেশের মাটিতে পা রাখার দিন থেকেই শুরু হয় তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামী জীবন, তিন দশকের অধিক সময় ধরে যা বিস্তৃত।

রাজনৈতিক পরিবেশে শেখ হাসিনা বেড়ে উঠেছেন। জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে অনেক কিছুই তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। কখনও-কখনও সক্রিয় ভূমিকাও রেখেছেন। ১৯৫৪ ও ১৯৫৬-৫৭ সালে পিতার স্বল্পকালীন মন্ত্রিত্বের সময় মিন্টু রোডের বাসায় থেকেছেন। আবার পাকিস্তানের ২৪ বছরের ১২ বছর বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনকালীন নানা দুরবস্থা ও তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীনও হয়েছেন। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে প্রথমে আজিমপুর গার্লস স্কুল, এরপর ইডেন মহিলা কলেজ, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালে তিনি সক্রিয় ছাত্র-রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করেন। তিনি ছিলেন ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভিপি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ’৬৬-র ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৮-র আগরতলা মামলা-বিরোধী ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি রাজপথের মিছিলে শামিল হয়েছেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়, বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে আলোচনার নামে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়ার কালক্ষেপণ ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ, বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ২ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ (১৯৭১) পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ পালন ও স্বাধীনতার স্পৃহায় বাঙালী জাতিসত্তার উত্থান, ২৬ মার্চ পাক হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা, পরিশেষে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে কিভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে, এ সবই তিনি অতি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনে সক্ষম হয়। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তাঁর নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের সরকার গঠিত হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি তৃতীয় দফায় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আজ বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে সমাদৃত। এখানে পৌঁছতে তাঁকে অনেক চ্যালেঞ্জ আর বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন, কারাগারে থেকেছেন। ২০০৭-২০০৮ সালে প্রায় বছরকাল সাবজেলে তাঁর নিঃসঙ্গ বন্দী জীবন কেটেছে। একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে। প্রহসনমূলক বিচারের আয়োজন হয়েছে। রাজনীতি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা দেশের বাইরে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টাও হয়েছে। ২৩/২৪ বার তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, যাতে নারীনেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন ঘটনাস্থলে প্রাণ হারিয়েছেন, কয়েকশ’ লোক আহত হয়েছেন, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ঘাতকদের মূল লক্ষ্য ছিলেন শেখ হাসিনা। তবে অলৌকিকভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

১৯৮১ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত আমাদের জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যা-কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন, তার সিংহভাগের কৃতিত্ব শেখ হাসিনার নেতৃত্বের। তিনি আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করেছেন। ভিন্ন অবস্থায় দলের বহুধা বিভক্তির সমূহ সম্ভাবনা ছিল। সেনাশাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার স্থলে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন ও একে শক্তিশালীকরণ তাঁর নেতৃত্বেরই ফল। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি (১৯৯৭) সম্পাদনের মাধ্যমে সেখানে দুদশক ধরে বিদ্যমান পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র বিদ্রোহ থেকে উদ্ভূত চরম সহিংস ও অস্থিতিশীল অবস্থার অবসান ঘটিয়ে তিনিই শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর সরকারের আমলেই সর্বজনস্বীকৃত ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ (২০১০) প্রণীত ও গৃহীত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ ও উগ্র ধর্মীয় জঙ্গীগোষ্ঠীর দমন ও উত্থান রোধে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী ও জাতির জনকের আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিচারের সম্মুখীন এবং বিচারের রায় কার্যকর করা তাঁর দৃঢ় ও সাহসী নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে। সমাজ, সরকার, রাষ্ট্র, রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনৈতিক কর্মকা-Ñ সর্বক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের কারিগর শেখ হাসিনা স্বয়ং। নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণ তাঁরই সাহসী প্রত্যয়। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বের কারণে খাদ্যঘাটতির দেশ আজ খাদ্য-উদ্বৃত্ত। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন ও তা প্রতিহত করার নামে বিএনপি-জামায়াত জোট সৃষ্ট দেশব্যাপী হত্যা-সন্ত্রাস-নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে সেনাশাসন একমাত্র বিকল্প হিসেবে দেখা দিলে একমাত্র শেখ হাসিনার দৃঢ় ও বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণেই সম্ভাব্য সেনা হস্তক্ষেপ থেকে গণতন্ত্র রক্ষা পেয়েছে। রাষ্ট্রনায়কোচিত বিচক্ষণতা দিয়ে তিনি জাতির সম্মুখে ভিশন-২০২১ বা উন্নয়নের অগ্রবর্তী রূপকল্প তুলে ধরে সর্বত্র পরিবর্তনের এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছেন। উন্নয়নের প্রায় সকল সূচক, যেমন বার্ষিক উৎপাদন হার, মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, সাক্ষরতার হার, সামাজিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য-হ্রাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রযাত্রা সবার দৃষ্টি কেড়েছে। আর এসব অর্জন বা সাফল্যের মূলে রয়েছে শেখ হাসিনার সময়োপযোগী নেতৃত্ব।

তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নকামী দেশের রাজনীতিতে সৎ, সাহসী, দুর্নীতিমুক্ত, জনগণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আত্মপ্রত্যয়ী ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড়ই অভাব। সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনা ব্যতিক্রম এবং তিনি নেতৃত্বের এসব গুণের অধিকারী।

সামগ্রিকভাবে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিক ও আদর্শিক ছায়াতলে বেড়ে উঠে শেখ হাসিনা নিজগুণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে তাঁর নেতৃত্বের একটি বিশেষ মর্যাদার স্থান অর্জন করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু বাংলাদেশেই বলি কেন? বিশ্বরাজনীতির পরিম-লেও তিনি ইতোমধ্যে নেতৃত্বের আসনে আসীন। বিশ্বশান্তি রক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং মানুষ-প্রকৃতি-পরিবেশ ও উন্নয়ন ধারার ওপর জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব এবং তার কার্যকর মোকাবেলা বা এ থেকে উত্তরণ-সংশ্লিষ্ট যে-কোনো আন্তর্জাতিক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক, সভা, সম্মেলনে তিনি এখন মধ্যমণি। সম্প্রতি তিনি জাতিসংঘের পরিবেশ-বিষয়ক সর্বোচ্চ পদক ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ ও আইটিইউ-র ‘আইসিটি ফর সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ এ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় তিনি কো-চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পালন করেন। অতিসম্প্রতি আমেরিকা থেকে প্রকাশিত বহুল প্রচারিত ও পঠিত ফরেন এ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিন মানব জাতির উন্নয়ন ও কল্যাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মৌলিক চিন্তা, গবেষণা, উদ্ভাবন, সৃষ্টি ও দৃষ্টি আকর্ষণমূলক কার্যের জন্য সারা বিশ^ থেকে ১০০ জন শীর্ষ ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করে, যার মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্থান অগ্রভাগে (১৩তম)। এসব তাঁর বিশ্বনেতৃত্বের আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করার প্রমাণ। এ ধরনের অর্জন তাঁর নিজের জন্য যেমনি, তেমনি দেশের জন্যও বিরল সম্মান ও স্বীকৃতিস্বরূপ।

লেখক : উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়