১১ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ভাষা আন্দোলন মাইলফলক ॥ স্বাধীনতা অর্জনে


দ্বিজাতিতত্ত্ব¡ ও ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট হাজার মাইল দূরত্বের ব্যবধানে পাকিস্তান নামের দেশ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা পাকিস্তানের পূর্বাংশে (যার পরিচিতি ছিল পূর্ব বাংলা পরে পূর্ব পাকিস্তান) শোষণ ও বৈষম্যের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় বাংলা ভাষাকে। পাকিস্তানী শাসকরা মনে করে বাংলা ভাষাকে স্তব্ধ করে দিতে পারলেই পূর্ব বাংলার সম্পদ লুট করা যাবে।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দেশ ভাগের সাত মাস পর ২৪ মার্চ প্রথমে ঢাকার রেসকোর্স মাঠের জনসভায় ও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিলেন উর্দুু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। ওই দিন কার্জন হলের পাঁচ ছাত্র সমস্বরে চিৎকার করে বলল নো নো নো...। এই নো শব্দ ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ‘বাংলা’ রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা থেকে দেশ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে সময় নেয় ২৩ বছর। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলা ভাষার লাল সবুজের বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে মর্যাদার আসন করে নেয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নবেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কো প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয়।

২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালী জাতির কাছে বাংলা ভাষা রক্ষার মাইলফলক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকায় বাংলা ভাষার দাবিতে শুরু আন্দোলনে পাকিস্তানী সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সর্বস্তরের বাঙালী মিছিল নিয়ে রাজপথে নামে। পুলিশ এই মিছিলে সরাসরি গুলি চালালে নিহত হন রফিক উদ্দিন আহমেদ, আবুল বরকত, শফিউর রহমান, আব্দুল জব্বার, অহিউল্লাহ ও আব্দুস সালাম। ভাষা শহীদদের এই রক্তদান বাঙালী জাতিকে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে দেয়।

কৃতজ্ঞ জাতি শহীদদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে পরের বছর থেকেই দিনটিকে হৃদয়ে লালন করে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করতে থাকে। ইট-কাদামটি দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজের হাতে নির্মাণ করে শহীদ মিনার। দিনটিকে চিরন্তন স্মরণীয় করে রাখতে এই দিন ভোর বেলা শিক্ষার্থীর সঙ্গে সাধারণ মানুষ খালি পায়ে প্রভাত ফেরি করে। সেখানেও বাধা দেয় পাকিস্তানী শাসক। পাকিস্তানী শাসকরা প্রতিবছর এই দিনে ছাত্র-জনতার ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ গুলিবর্ষণ করে আন্দোলন দমাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত বাঙালী জাতি বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে।

২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে হৃদয়ে লালন করে দেশের বরেণ্য সাহিত্যিক-সাংবাদিকগণও সে সময় আন্দোলনে অংশ নেয় নানাভাবে। বরেণ্য চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ষাটের দশকের মধ্যভাগে পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে সেলুলয়েডের ফিতা নিয়ে মাঠে নামেন। নির্মাণ করেন কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। যে ছবিতে তিনি প্রভাত ফেরির দৃশ্য ধারণ করেন ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে। এই দৃশ্য ধারণে শিল্পীরা প্রভাত ফেরিতে অংশ নেয়।

পাকিস্তানী শাসকরা কতটা স্বৈরাচার ছিল তা প্রতীকী অভিনয় সমৃদ্ধ করে ছবি নির্মাণ করেন জহির রায়হান। ‘জীবন থেকে নেয়া’ নামের এই ছবিটি আজও মাইলফলক হয়ে আছে। পাকিস্তানী শাসকরা এই ছবি মুক্তি দিতে চায়নি। চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) প্রধান ও সেন্সর বোর্ডের কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ার করে দেয়া হয় জীবন থেকে নেয়া ছবি যেন মুক্তি না পায়। ছবি মুক্তির দাবিতে ছাত্র-জনতা মিছিল শুরু করে। পাকিস্তানী শাসকদের বড় আপত্তিÑএই ছবিতে প্রভাত ফেরি ও একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কীয় দৃশ্য বাদ দিতে হবে। জহির রায়হানের এক কথা : তিনি কোন দৃশ্য ছাঁটবেন না। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানী আইয়ুব সরকার ছবিটি মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ছবিটি যখন মুক্তি পায় তখন দেশে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে। জীবন থেকে নেয়া ছবিটি উত্তপ্ত আন্দোলনের ওপর ঘি ঢেলে দেয়। এই গণআন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতে সময় নেয় মাত্র দু’বছর। তারপর নয় মাসের যুদ্ধে মুক্ত স্বাধীন দেশ বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা দিতে ১৯৪৮ সালের পর দেশজুড়ে প্রতিটি জেলায় গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। প্রচ- গতি পায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পর। এর আগে ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান বাঙালী হয়েও বাংলা বর্ণমালাকে আরবী করে বাংলাকে উদ্ভট ভাষায় রূপদানের চেষ্টা করেন। আবার কেউ বাংলা বর্ণমালাকে উর্দুু হরফে নেয়ার পরিকল্পনা করে। এই অবস্থার মধ্যে ভাষার দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো একত্রিত হতে থাকে। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের ফজলুল হক হলে কর্মীসভায় আন্দোলনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই মধ্যে দেশবরেণ্য সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে গান লেখেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি, কি ভুলিতে পারি...’ সুর দেন শহীদ আলতাফ মাহমুদ। এই গানটি চিরন্তন ও অমর হয়ে আছে। এই গান ছাড়া ফেব্রুয়ারি মাস শুরুই হয় না।

এই আন্দোলনে বগুড়ার গাজীউল হক বড় ধরনের ভূমিকা রাখেন। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পুলিশ ঘিরে ফেললে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আমতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ছাত্রসভায় সিদ্ধান্ত হয় দু’জন করে ভাগ হয়ে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে সমবেত হতে হবে। অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন গাজীউল হক (প্রকৃত নাম পীরজাদা ড. আবু নছর মুহাম্মদ গাজীউল হক)। এর আগে ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ভাষা আন্দোলনকে তীব্র করতে ছাত্র ধর্মঘট, একইদিন ঢাকা বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভা হয়। ১৯৫২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন সমর্থন করায় তদানীন্তন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকা নিষিদ্ধ করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে পরবর্তী এক মাসের জন্য ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এর পর বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলন সাগরের ঢেউ আর জলোচ্ছ্বাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। জেলায় জেলায় গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে