২৪ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বুকে তাঁর কবিতার জখম


খোন্দকার আশরাফ হোসেনের জন্ম ১৯৫০ সালের ৪ জানুয়ারি বহু প্রাচীন নদীবর্তী জামালপুর জেলায়। শিক্ষা জীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮১ সালে আশরাফ হোসেন যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেন। চাকরি জীবনে আশরাফ হোসেন ছিলেন বিদগ্ধ শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ‘একবিংশ’ সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সাহিত্যের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ ও বিপুল উৎসাহ; যেমন মৌমাছির আগ্রহ ও উৎসাহ থাকে মধুর প্রতি। একটু আড়ালে থেকেছেন অথবা প্রবীণ ও তাঁর সমসাময়িক কবিদের এড়িয়ে চলেছেন বলেই হয়ত চলার পথে কিছুটা প্রতিকূলতা তাঁর সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকের কথাবাণে আহতও হয়েছিলেন বহুবার। সংসার, শিক্ষকতা সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর হেরার ধ্যান ছিল সাহিত্যের জন্য। তাঁকে দেখি অন্যসব প্রখ্যাত কবিদের মতো, যিনি আত্মবিশ্বাসের পাখায় ভর করে চলছেন নিঃসঙ্কোচে:

‘আমি একটু অন্যরকম পেখম মেলার ইচ্ছে রাখি

বুকে আমার একটু জখম অন্যরকম

রক্তপাতের পরে যেমন নিঃস্ব মানুষ নিশ্চেতনায় ঘুমিয়ে থাকে

আমি তেমন ঘুমিয়ে ছিলাম দীর্ঘসময়

আত্মঘাতী যুদ্ধ শেষে একটু বাঁচার ইচ্ছে রাখি।’

খোন্দকার আশরাফ হোসেন একজন বিনম্র কবি। বিশেষত তাঁর জীবন ও কবিতার গ্রাম ঘুরে এসে সেই বিনম্রতার স্পর্শ পাঠকমাত্রই অনুভব করতে পারবেন। আশির দশকের যে কবিরা কবিতার গ্রামকে শ্যামলে-সবুজে, ফুলে-ফসলে ভরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন তাদের মধ্যে আশরাফ হোসেন উল্লেখযোগ্য নাম। তাঁর ধীরস্থির অথচ আত্মবিশ্বাসী পথচলায় তিনি শব্দকে পরম মহার্ঘ জেনেছেন, ঘরের প্রিয়ার মতো আত্মস্থ করেছেন এবং কবিতার শরীরে শব্দ বুনে গেছেন অসম্ভব পারঙ্গমতায়। এ কারণেই প্রথম চর্চার প্রভাব, পরবর্তী সময়ের কৌতূহল ও নিরীক্ষার নদী পেরিয়ে তাঁর স্বরটি পাঠক মহলে আলাদা হয়ে বেজে উঠেছিল। এই আলাদা বা স্বতন্ত্র্য হওয়া কেবল ব্যতিক্রমই নয়, এ পৃথক পথপ্রাপ্তি আমাদের কাছে এও জানান দেয়- সাহিত্যের গোলকধাঁধায় নিজেকে খুঁজে পাওয়া কবি আশরাফ হোসেন। আত্মবিশ্বাসের অটল পাহাড় নিয়ে কবি নিঃসঙ্কোচে হেঁটেছেন যেন তিনি জানতেন তিনি পারবেনই। জীবিতবস্থাতেই আয়নার সামনে অপরাধী আসামির মতো নিজেকে দাঁড় করিয়ে নিজের মুখোমুখি হয়েছেন বার বার; মূল্যায়ন করেছেন নিজেকে নিজেই। আমরা তাঁকে দৃঢ় অথচ কোমল নিরঙ্কার কণ্ঠে বলতে দেখি; সংকোচহীন, দ্বিধাহীন আশরাফ বলছেন, ‘কিছু কিছু কবি যারা আত্মগত, সুবেদী, সুস্থির এবং সমাজ ভাবনাদীপ্ত, প্রচ--প্রখরভাবে রাজনীতিমগ্ন নয়, শিল্পসম্মতভাবে সমাজভাবনাকে প্রকাশ করে, যাকে বলা যেতে পারে অনুভবদীপ্ত উচ্চারণ; এগুলোর দিকে কবিতাকে যারা নিয়ে গেছে আশির দশকে আমি নিজেকে তাদের মধ্যে একজন মনে করি।’ আমরা ইতোপূর্বেও অনেককেই দেখেছি, রবীন্দ্রনাথকেওÑ যাঁরা নিজেদের লেখা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। এখন এই সময়ে এসে আশরাফ হোসেনের কবিতার দিকে তাকালে ‘আত্মগত’, ‘সুস্থির’, ‘অনুভবদীপ্ত’ ইত্যাদি আত্মমূল্যায়ন যথার্থ হয়েছে বলেই আমাদের কাছে মনে হয়।

দুই.

অনেক বোদ্ধাজনই বলেছেন কবি মাত্রই দার্শনিক। কেননা, যথার্থ কবিতা শিল্পকে ধারণ করার পাশাপাশি ধারণ করে রাখে জীবনদর্শন ও জীবনবোধ। সমাজবোধ ও সমাজমনস্কতার কারণেই কবিকে চারদিকে সতর্ক চোখ পেতে রাখতে হয়, পর্যবেক্ষণ করতে হয় ফুল, গান, আগুন ও পাথর, সংসার ও সংঘর্ষ। আশরাফ হোসেন কবি হিসেবে যতটা রাজনীতিমনস্ক ছিলেন তার চেয়ে বহুগুণে ছিলেন সমাজ ভাবনায় দীপ্ত। সমাজে ছড়িয়ে পড়া অর্থলোভী, স্বার্থ ও নারীলোভী; মগজহীন ও ধূর্ত মানুষের কর্মকা- কবিকে বারবার রক্তাক্ত করেছে। মা, মাটি, জল-সবকিছুকে বাণিজ্যিকীকরণ হতে দেখে কবি কখনও হতাশ হয়েছেন, কখনও ছুড়েছেন ঘৃণার তীব্র তীর। তাঁর এমন অসংখ্য কবিতা খুঁজে নেয়া সম্ভব, যে কবিতাগুলোতে পুঁজিবাদকে বিষাক্ত শরবিদ্ধ ও ঘৃণাবিদ্ধ করা হয়েছে। পাঠকের অনুধাবনার্থে এমনি স্বরবিদ্ধ একটি কবিতার পাঠ নেয়া যাক :

‘জীবনের প্রান্ত ঘিরে বেড়ে ওঠা পুঁইডালিমের লতা

সোমত্ত নদীর মতো নারীদের যত কথকতা

তপ্ত ললাট ঘিরে শুশ্রƒষার হাত ছেড়ে

আমাদের মাতা ও ভগ্নিরা সব দল বেঁধে

বাণিজ্যমেলায় যাচ্ছে

যাচ্ছে সব বাণিজ্যমেলায় যাচ্ছে।’

-ট্রেড ফেয়ার/আয় (না) দেখে অন্ধ মানুষ

এই যে হেঁটে যাওয়া অনুভূতিহীন অর্থবিত্ত আর মোহের দিকে, মমতার দৃষ্টি ছেড়ে ছুটে যাওয়া ঝকমকে হীরা-জহরতের দিকে- তা যে সমাজকে, সমাজস্থ মানুষকে কোথায় নিয়ে যাবে অথবা বিলীন করে দিবে কোন গিরিখাতের তলায়- তা অনুভব করা সচেতনদের জন্যে দুরূহ কিছু নয়। ধাববান ঘূর্ণির পথে মানুষকে হাঁটতে দেখে আশরাফ কেবল বাণই ছোড়েননি, প্রমত্ত হাতির মতো উন্মাদও হয়ে উঠেছেন কখনও কখনও। ক্ষিপ্ত কবিকে বলতে শুনি : ‘মুছে দাও মানুষের পদচিহ্ন, তার হাতের সকল কারুকাজ/হৃদয়ের অক্ষর বিন্যাস, তার কাব্য-ইতিহাস :/মানুষ নামের ব্যর্থ ভাস্করতা বামিয়ান বুদ্ধ মূর্তির মতো/ধুলায় বিচূর্ণ করে ছুড়ে দাও ঈশ্বরের মুখে।’

মাটির পৃথিবীর নম্রতা ও উদারতা ধুলোয় আজ গড়াগড়ি খাচ্ছে অথচ সেই কোটি বছরের প্রাচীন চাঁদ এখনো আকাশে উঠছে, জ্যোৎস্না বিলাচ্ছে- কবির কাছে এ চাঁদ মূল্যহীন। চাঁদকে তাঁর মনে হয় ‘ভাঙ্গা রডের মাথায় কেউ যেন ঝুলিয়ে রেখেছে/এ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি।’ আর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের মুখকে তাঁর মনে হয় ‘পাঁচ টাকার ঘষা কয়েনের মতো।’ কেননা, আশরাফ হোসেন এসব প্রপঞ্চনা, জাগতিক প্রাপ্তির লোভে কাতর নন। কবিতায় যেমন বলেছেন ‘আমার কণ্ঠে সুর নেই হাঁটুও/নমনীয় নয় নতজানু হবো’- ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সেরকমই ছিলেন নির্মোহ, নিরুত্তাপ। তবে আশরাফ হোসেন আশাবাদী প্রত্যাশাসঞ্চারী মানুষ। প্রবঞ্চনা, প্রতারণা থেকে মানুষ তাঁর ট্র্যাকে ফিরবে, আপন মহিমায় দীপ্ত হবে তিনি এমনটিই বিশ্বাস করতেন। কারণ তিনি জানেন ‘মানুষেরা বেঁচে থাকে, মরে যায় মর্মভেদী ঝড়।’

তিন.

এখানে এ নিবন্ধে আরেকটি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে। সেটি হলো আশরাফ হোসেনের প্রেম। অর্থাৎ চিয়ায়ত প্রেমকে দেখা ও প্রেম নিয়ে খোন্দকারের দর্শন। তাঁর কবিতার নানা বিষয়-আশয় নিয়ে অনেকে লিখলেও কাউকেই খুব একটা আশরাফের প্রেমিকপ্রবণ কবিতাগুলোকে নিয়ে লিখতে দেখিনি। সেটা হয়তো অনেকে এমনিতেই এড়িয়ে গেছেন, অনেকে হয়তো প্রয়োজন বোধ করেননি। আশরাফীয় প্রেম রবীন্দ্রনাথের ‘ভালোবেসে প্রেমে হও বলি’ নয়। কিংবা খুব বেশি যে কাছে পাবার ব্যাকুলতা তেমনও নয়। এখানেই আশরাফ হোসেনের বিশেষ্যত্ব। মোহর কবিতার কথা এ প্রসঙ্গে আনা যেতে পারে। মোহর কবিতায় তিনি লিখেছেন : ‘তৃপ্তি পেছনে ছুটলাম, সে আমাকে দেখালো নদী,/ পিপাসা ঝুলিয়ে রাখলো আগডালে ঘুড়ির মতো,/ প্রেম বললো, একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকো সারস।’ এই যে ছুটছেন, অপেক্ষা করছেন-এ ধারণা তাঁর নিজের কাছেই বেশিদিন টিকে থাকেনি। তিনি খুব শীঘ্রই বুঝতে পেরেছিলেন তৃষ্ণার কুকুর হয়ে লাভ নেই, হতে নেই। পরের কবিতাগুলোতেই আমরা আশরাফ হোসেনের বোধের তারতম্য লক্ষ্য করি। আশরাফ হোসেনই পরবর্তীতে বলেছেন : ‘কে কবে পেয়েছে বলো হৃদয়ের শতভাগ পুরো?/প্রেম তো আশ্বিনা আম, শাঁস নয়, আঁটিটাই বড়ো॥’ এসব বলেছেন বলে তিনি যে আবার প্রেমহীন থেকেছেন তেমনটিও হয়নি। তিনি তাঁর কাক্সিক্ষত প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করেছেন, সেই অপেক্ষা অর্থ প্রেমিকাকে প্রাপ্তি নয়, প্রিয়াকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন, কিন্তু সেই খোঁজাও প্রিয়াকে পাবার জন্যে নয়। কবি চাইতেন তাঁর হৃদয়রমণীকে তিনি আজীবন খুঁজে বেড়াবেন। কারণ, তিনি জানতেন খুঁজে বেড়ানোর মতো হৃদিক প্রত্যাশার মধ্যে আনন্দ আছে, আছে বৃক্ষশীতল প্রশান্তি। ‘মির্জা গালিবের না-লেখা কবিতা’য় তাঁর সহজ স্বীকারোক্তি :

‘তোমাকে খুঁজবো আমি দিনমান, খুঁজবো বৃথাই,

শুধুই খুঁজবো পথে, পাবো না জেনেও, যদি পাই

ব্যর্থ হবে তোমাকে আমার খোঁজা, তোমাকে চাওয়ার

তৃষ্ণাটুকু বেঁচে থাক, সেই তো পাওয়ার।’

চার.

আশরাফ হোসেন পুরাতন ঘটনাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর কবিতায়। আমরা দেখি তার কবিতায় কখনো তিনি মিহির-খনাকে এনেছেন, আবার কখনো সুনীলের নাদেরালী, জীবনানন্দের বনলতা সেনকে নিয়ে এনেছেন। নতুনভাবে পুরাতনকে উপস্থাপন করতে পেরে আশরাফ হোসেন নিজেও আনন্দ পেতেন। তাঁর উপস্থাপন শৈলীও ছিল যথাযথ। মধুসূদন যেমন মেঘনাদবধে রাম ও রাবণকে নবরূপে এঁকেছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশরাফও সেই কাজটি করেছেন। দুটি উদাহরণ দেয়া যাক :

১। ‘এবং সোমত্ত মেয়ে কোন দুঃখে ভাসালো বাসরঘর

গাঙুরের জল থেকে ধানসিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উজানী নগর

তারপর ফুটপাথ তারপর অনম্র পাথর

তারপর বুক ঘষে চোখ ঘষে ক্ষয় হলো দেহের কবর

মনমাঝি জানে নাকি তার যে খবর।’

-মনমাঝি

২। দশদিগন্তে হাওয়া লেগেছে, নতুন চাঁদের কাঁখে

পুরোন চাঁদের রূপোর রেখা আলোর বৃত্ত আঁকে

কোদালে-কুড়ালে মেঘের গা, আলুথালু বইছে বা,

যে জানে সে বাঁধবে আল,

আজ না হয় জল হবে কাল।

-মিহিরকে খনা।

আশরাফ হোসেনের কবিতায় দার্শনিক জিজ্ঞাসা থাকে। থাকে বিচিত্র উত্তরও। সহজ-সহজ শব্দে, পরিচিত জগতের মধ্য দিয়েই তার চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে বেশিরভাগ কবিতায়। তিনি প্রচলিত শব্দ প্রয়োগেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। আরণ্যক কবিতায় দেখি তিনি মানুষের বহিরঙ্গের সাজসজ্জার ব্যস্ততা দেখে প্রশ্ন করেছেন- ‘সুন্দরবনে কে কবে দিয়েছে ঝাঁট বলো?’ তাঁর মতে সাবান ঘষে, দাড়ি কামিয়েই পরিচ্ছন্ন হওয়া যায় না। প্রকৃত পরিচ্ছন্নতা হতে হবে মনের। আত্মাকে নিজের মতো করে বাড়তে দিতে হবে, দিতে হবে শুদ্ধতা। ‘ক্ষমা দিয়ে আগুন ধোয়া যায় না’, ‘যারা সাগরে পেতেছে শয্যা শিশিরের ভয়ে’, ‘কি নিচ্ছ ঠোঁটের ফাঁকে, সুদূরের পাখি?/আমি নিচ্ছি দুটো খড়, এই মৃত্যু আরেক জীবন’- এমন অসংখ্য লাইন আমাদের বিস্মিত ও বিমুগ্ধ করে।

একদিকে ইংরেজীর অধ্যাপক, অন্যদিকে অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক পরিচয় ছাপিয়েই খোন্দকার আশরাফ হোসেনের বড় পরিচয় তিনি কবি। শব্দখনিতে বৈভব, আবেগ ও আবেশে প্রখর, উপস্থাপনে নান্দনিকতাই তাঁকে সৃষ্টিমুখর সফল কবি করেছে।