২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

যেখানে ব্যাংক নেই, সেখানে এজেন্ট ব্যাংকিং


রহিম শেখ ॥ ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত এলাকাগুলোতে এ সুবিধা দিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চালু হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং সুবিধা। গ্রাহকদের জন্য সার্ভিস চার্জবিহীন এই বিশেষ সেবা চালুর জন্য ১০ ব্যাংক লাইসেন্স নিয়েছে। এর মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে চারটি। বর্তমানে ২২২টি আউটলেটের মাধ্যমে ব্যাংকের শাখা নেই এমন এলাকায় ব্যাংকিং সেবা দেয়া হচ্ছে। দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে এ সেবা। বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম দেখে প্রশংসা করেছেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু।

জানা গেছে, কোন ব্যাংকের শাখা নেই এমন পল্লী একালাগুলোতে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি বিধিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ ৬ জানুয়ারি এক সার্কুলার জারি করে গ্রামের পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন দেয়া হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, এজেন্টের কাছ থেকে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নগদ অথগ্রহণ করতে পারবেন গ্রাহক। এক হিসাব থেকে আরেক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করতে পারবেন। ব্যাংক হিসাবে কত টাকা জমা রয়েছে তাও জানা যাবে। এছাড়া এই সেবার আওতায় ব্যাংক হিসাব খোলার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহ, ঋণের জন্য আবেদন, ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের আবেদন করার সুযোগ পাবেন গ্রাহক। এ সেবার মাধ্যমে বীমার প্রিমিয়ামও জমা দেয়া যাবে। তবে এজেন্টের মাধমে ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে না। এর জন্য নির্দিষ্ট ব্যাংকের নিকটস্থ কোন শাখায় যেতে হবে।

এজেন্ট কোন চেক বইও ইস্যু করতে পারবে না বা কোন ব্যাংক কার্ডও ইস্যু করতে পারবে না। এজেন্ট বিদেশী মুদ্রা সংক্রান্ত কোন লেনদেন করতে পারবে না। এজেন্টদের কাছ থেকে কোন চেকও ভাঙানো যাবে না। এজেন্টরা মোট লেনদেনের ওপর কমিশন পাবেন। তবে এজেন্সি পেতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্যতা থাকতে হবে। পাশাপাশি এক লাখ টাকা জামানত দিতে হবে ব্যাংককে। গত মঙ্গলবার গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের রাজাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্র অবস্থিত ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এমন কার্যক্রম দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান, প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল, ব্যাংক এশিয়ার নির্বাহী পরিচালক ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন প্রমুখ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, প্রথম বছরে মাত্র ২৭টি আউটলেট খোলা হয়েছিল। এখন আউটলেটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২২টি। এজেন্ট ব্যাংকিং হলো, সমঝোতা স্মারকের চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ করা এজেন্টের মাধ্যমে ব্যাংকের গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা দেয়া। কোন ধরনের চার্জ ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেয়ার নিয়ম রয়েছে। এছাড়া কোনভাবেই গ্রাহক যেন প্রতারিত না হন সেজন্য প্রতিনিধি নিয়োগের আগে অবশ্যই তার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, বিশ্বস্ততা ও সততার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে হয়। প্রথমে শুধু পল্লী এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন দেয়া হলেও পরে পৌর ও শহর অঞ্চলেও এজেন্ট ব্যাংকিং করার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাপ্ততথ্য মতে, এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় বেশি এগিয়ে থাকা ব্যাংক এশিয়ার এজেন্টরা এখন পর্যন্ত ১১৫টি আউটলেটের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছেন। এছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৯০টি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ১২টি এবং সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ৫টি আউটলেট খুলেছে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিলেও কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি বেসরকারি খাতের স্ট্যান্ডার্ড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, এক্সিম, সাউথ বাংলা এ্যাগ্রিকালচার এ্যান্ড কমার্স, মধুমতি ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক।

ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আরফান আলী জনকণ্ঠকে বলেন, কোন অবস্থাতে গ্রাহক যেন প্রতারিত না হন, সেজন্য পুলিশ ও সিআইডি ভেরিফিকেশন নিয়ে এজেন্ট নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। বেশ সফলতার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। ব্যাংক এশিয়ার এজেন্টদের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার এ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। যেখানে লেনদেন হয়েছে সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা। এছাড়া ৩৫ কোটি টাকার আমানত এসেছে। প্রবাসীদের পাঠানো ১০০ কোটি টাকার রেমিটেন্স সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণের কৃষি ও এসএমই ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। তবে এখনও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে না ওঠা ও কোন কোন এলাকায় আইসিটি নেটওয়ার্ক পেতে সমস্যা দেখা দেয়ায় কিছু চ্যালেঞ্জ তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মোঃ শিরিন, এখনও দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। তাদের এ সেবার আওতায় আনতে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যেহেতু গ্রাহকের কোন সার্ভিস চার্জ নেই, সেহেতু গ্রাহক পর্যায়ে বিষয়টি ইতিবাচক হবে বলে আমরা মনে করছি। এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার আওতায় স্বল্প পরিমাণ টাকা নিজ হিসাবে জমা দেয়া ও তোলা যাবে। বিদেশ থেকে আসা রেমিটেন্স সংগ্রহ করা যাবে। ছোট আকারের ঋণ বিতরণ ও ঋণের কিস্তি আদায়, বিদ্যুত ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা যাবে। সাধারণ মানুষের টাকা উত্তোলন ও জমার এ ব্যবস্থাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। তবে কিছু এজেন্ট গ্রাহক পর্যায়ে অতিরিক্ত চার্জ আদায় করছে বলে অভিযোগ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। ব্যাংক থেকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে এজেন্টদের। আর এখনও আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় এসব এজেন্টের অধিকাংশই রয়েছেন লোকসানে। লোকসান কাটাতে অনেক ক্ষেত্রে তারা সার্ভিস নেন বলে ব্যাংকগুলো মনে করছে। এজেন্টদের লোকসান কাটাতে এখন একই এজেন্টকে একাধিক আউটলেটের অনুমোদন দিচ্ছে ব্যাংক। একই মালিক একাধিক আউটলেট খোলার অনুমতি পাওয়ার ফলে কোন এজেন্ট এক স্থানে লোকসানে থাকলেও অন্য স্থান থেকে লাভ বা পরবর্তীতে লাভে আসতে পারবেন এমন আশায় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

এজেন্ট হতে পারেন যারা ॥ কোম্পানি আইনের আওতায় অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান, আইটিভিত্তিক আর্থিক সেবা দিতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানির প্রতিনিধি, ফার্মেসি মালিক, চেইন শপ, পেট্রোল পাম্প বা গ্যাস স্টেশনের মালিক, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ অফিস, এমআরএর অধীনে অনুমোদন পাওয়া এনজিও, কো-অপারেটিভ সোসাইটির অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কুরিয়ার, ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র এজেন্ট হতে পারে।

এজেন্ট যা করতে পারে ॥ এজেন্ট ক্ষুদ্রঋণ প্রদান ও আমানত গ্রহণ, নির্দিষ্ট হারে অর্থ লেনদেন, সুবিধাভোগীর কাছে রেমিটেন্সের অর্থ পৌঁছে দিতে পারে। এজেন্টের মাধ্যমে গ্রাহক ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় ভাতাভোগীর অর্থ প্রদান, এ্যাকাউন্ট ব্যালান্স জানা ও এ্যাকাউন্ট ফরম সংগ্রহ করতে পারেন। এছাড়া এজেন্টরা যে কোন পরিমাণের ঋণ আবেদন, ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের আবেদন ফরম ও চেক জমা নিতে পারে।