১৯ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ফারুকী হত্যার জট খুলতে শুরু করেছে


গাফফার খান চৌধুরী ॥ এবার বহুল আলোচিত চ্যানেল আইয়ের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যারও জট খুলে যাচ্ছে। হত্যার সঙ্গে জেএমবি জড়িত। পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খান হত্যায় গ্রেফতারকৃত তারেকুল ইসলাম তারেক ওরফে মিঠু ও হোসেনী দালানে বোমা হামলায় গ্রেফতারকৃত চান মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে ফারুকী হত্যা রহস্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মিঠু ও চান মিয়া মাওলানা ফারুকী হত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল। ফারুকীকে সরাসরি জবাইয়ে অংশ নেয়া চারজনের মধ্যে অনত্যম ছিল তারেক। চান মিয়া হত্যা মিশনে অংশ নেয়াদের গাড়িতে করে ফারুকীর বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল। হত্যার সময় চান মিয়া বাড়ির বাইরে গাড়ি নিয়ে অবস্থান করে পুরো এলাকার ওপর নজর রাখছিল। হত্যার পর চান মিয়ার গাড়িতে করে সবাই চলে যায়। এক সপ্তাহ আগে থেকে ফারুকীর বাড়ি রেকি করা হয়েছিল। আর চ্যানেল আইয়ে শান্তির পথে ও কাফেলা নামক ইসলামী অনুষ্ঠান শুরুর পর ফারুকীকে হত্যার পরিকল্পনা করে জেএমবি। থানা ও ডিবি পুলিশ হয়ে সিআইডি পুলিশের কাছে হস্তান্তর হওয়া ফারুকী হত্যা মামলাটির তদন্তভার আবার ডিবির কাছেই হস্তান্তর হচ্ছে।

ফারুকী হত্যা মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খিজির খান হত্যায় গ্রেফতারকৃত তারেকুল ইসলাম তারেক ওরফে মিঠু ও হোসেনী দালানে বোমা হামলায় গ্রেফতার চান মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

মিঠু ও চান মিয়া জেএমবির পলাতক সদস্য ফারুকের নেতৃত্বে কাজ করে। এর মধ্যে মিঠু খিজির খান হত্যা, গোপীবাগে সিক্সমার্ডারের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। এমন জবানবন্দীর পর মিঠু ও চান মিয়াকে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে ফারুকী হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সূত্র বলছে, দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। যেদিন থেকে চ্যানেল আইয়ে ইসলামের পথে ও কাফেলা নামক অনুষ্ঠান শুরু হয়, সেদিন থেকেই অনুষ্ঠানটির ওপর মনিটরিং শুরু করে ফারুকের নেতৃত্বে থাকা জেএমবি সদস্যরা। মাসখানেক অনুষ্ঠান চলার পর ফারুকীকে হত্যার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় তারও কিছু দিন পর। সবমিলিয়ে ফারুকীকে প্রায় ৩ মাস পর্যবেক্ষণে রাখার পর জেএমবির এই গ্রুপটি হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর হত্যার এক সপ্তাহ আগে থেকে ফারুকীর বাসা রেকি করা শুরু করে।

২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট হত্যাকা-ের দিন চান মিয়ার গাড়িতে করে ৮-১০ জনের দলটি সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন পূর্ব রাজাবাজারের ১৭৪ নম্বর মুন্সী বাড়ির সামনে যায়। প্রথমে ২ জন বাড়িতে ঢোকে। তারা হজে যাওয়ার কথা বলে নুরুল ইসলাম ফারুকীর সঙ্গে কথা বলা শুরু করে। এরপর আর ৫-৬ জন বাড়িতে ঢোকে। প্রথমে প্রবেশ করা দুইজন ফারুকী ও তার বাড়িতে থাকা মারুফকে ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে। অন্যরা বাসার ভেতরে ঢুকে মাওলানা ফারুকীর স্ত্রী লুবনা ইসলাম (৪২), ফারুকীর মা জয়গুন নেছা (৭০), গৃহকর্মী শরীফা খাতুন (৩৫) ও দুইজন মহিলা মেহমানকে একটি বেডরুমে নিয়ে হাত-পা-মুখ বাসার পর্দার কাপড় কেটে বেঁধে আটকে রাখে। এ সময় কলিংবেল টিপে তিন পুরুষ প্রবেশ করলে তাদেরও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে হাত-পা-মুখ বেঁধে পাশের আরেকটি বেডরুমে আটকে রাখা হয়। এরপর ফারুকীকে ড্রইংরুম থেকে ডাইনিং রুমে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। যে চারজন গলা কেটে ফারুকীকে হত্যা করে, তাদের মধ্যে মিঠু একজন। মিঠু ফারুকীকে সরাসরি হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে অন্যতম। বেশি সওয়াবের আশায় মিঠুও গলা কেটে ফারুকীকে হত্যায় অংশ নেয়। আর চান মিয়া বাড়ির বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করে আশপাশের এলাকার ওপর নজর রাখছিল। হত্যার পর চান মিয়ার গাড়িতে করেই সবাই চলে যায়। ফারুকী হত্যার সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত সাজিদও জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। হত্যাকা-ে সরাসরি অংশ নেয়া চারজনের অপরজন পলাতক ফারুক বলে জানা গেছে। সহযোগী আরও ৫-৬ জনকে শনাক্ত করার কাজ চলছে। ফারুককে গ্রেফতারের বিষয়ে ভারতের সহায়তা চাওয়া হয়েছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে। ফারুক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ভারতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ফারুকী হত্যা মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি সূত্র বলছে, জেএমবির ফারুকের নেতৃত্বে থাকা জেএমবি সদস্যরা ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ত্রিশালে জঙ্গী ছিনতাইয়ের ঘটনাটিও ঘটায়। ত্রিশালে জঙ্গী ছিনতাইয়ে জেএমবির ব্যবহৃত প্রাইভেটকারের চালক ছিল গ্রেফতারকৃত চান মিয়া। তারেক ইতোমধ্যেই গত ৫ অক্টোবর রাত পৌনে ৮টার দিকে রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন মধ্যবাড্ডার গুদারাঘাট এলাকার জ- ব্লকের ১০/১ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলায় খানকা শরীফে গলা কেটে বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খান ও ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়ারীর রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ৬৪/৬ নম্বর আয়না নামের বাড়ির দোতলায় দরবার শরীফে ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি দাবিকারী লুৎফোর রহমান ফারুক (৬০), তার ছেলে মনির হোসেন (৩০), অনুসারী সাইদুর রহমান (৩০), মজিবর রহমান (৩২), রাসেল (৩০) ও বাসার তত্ত্বাবধায়ক মঞ্জুর আলম ওরফে মঞ্জুকে (৩৫) গলা কেটে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। এ ব্যাপারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকি জনকণ্ঠকে বলেন, নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যায় জড়িতদের মধ্যে অনেকের সম্পর্কেই বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যাকারীদের মধ্যে ২ জন অন্য দুইটি মামলায় গ্রেফতারকৃত অবস্থায় রয়েছে। ভারতে গ্রেফতারকৃত সাজিদকেও ফারুকী হত্যার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে ভারত সহযোগিতা করছে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই হত্যারহস্য উদ্ঘাটিত হতে যাচ্ছে।