মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২০ আগস্ট ২০১৭, ৫ ভাদ্র ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

এখনই সময়

প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর ২০১৫

মোঃ রফিকুল ইসলাম

শৈশবে মহান মুক্তিযুদ্ধে দখলদার পাকিস্তানী বর্বর বাহিনীর এদেশীয় দোসররা আমাদের ও প্রতিবেশী হিন্দুদের বাড়িঘর ও জমিজমা দখল করেছিল। উদ্বাস্তু অবস্থায় সেই প্রথম দখল বিষয়টি উপলব্ধি করি। স্কুলজীবনে ইতিহাসের পাতায় জেনেছি রাজ্য দখলের গল্প; সমাজ থেকে জেনেছি প্রভাবশালী মোড়ল-মাতবর ও লাঠিয়ালদের দ্বারা চর এলাকা বা দুর্বল প্রতিপক্ষের জমিজমা, পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি ও জমিজমা দখলের গল্প। বাংলাদেশে অনেককেই রাজনীতি করতে দেখি শুধুমাত্র ধন-সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের জন্য, যার অন্যতম একটি উপায় হচ্ছে দখলবাজি এবং দখলবাণিজ্য। বিভিন্ন শাসনামলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছোটবড় অনেক নেতাকর্মী এবং তাদের ছত্র-ছায়ায় সুযোগ-সন্ধানী নীতিহীন কিছু উচ্চাভিলাষী বিভিন্ন অপকৌশলে বা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দখল করে নেয় খাল-বিল, নদী-নালা, পাহাড়-অরণ্য, সরকারী বিভিন্ন দফতর-অধিদফতরের জমি, প্রান্তিক ও দুর্বল ভূমি-মালিকদের জমি। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে গ্রাম-গঞ্জ-শহর সর্বত্র। শহর-নগরে এ দখলবাজরা দখলবাণিজ্য চালানোর জন্য আরও দখল করছে ফুটপাথ, রাস্তা, পার্ক ইত্যাদি। এ যেন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ কথাটির সার্থক বাস্তবায়ন। দখলবাজি ও দখলবাণিজ্য একটি অপরাধমূলক ও বেআইনী কাজ হওয়ায় সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে যেমন, আয়বৈষম্য, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, মারামারি-খুনোখুনি, মামলা-মোকদ্দমা, জালিয়াতি, সরকারী জমিজমা হ্রাস, প্রাকৃতিক সম্পদের বিলুপ্তি এবং পরিবেশ এবং প্রতিবেশের ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদির ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি; যা সভ্য সমাজে কাম্য নয়।

সমাজে পুরোপুরি আইনের শাসন কার্যকর না হলে ব্যক্তি বা ব্যক্তির পক্ষে প্রচলিত দখলবাজি ও দখলবাণিজ্য প্রতিরোধ করা অসম্ভব। সরকার আইন প্রয়োগে কঠোর হলে সহজেই তা প্রতিরোধ করতে পারে। কেউ যদি রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখনই তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আমরা একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, এদেশে সামরিক শাসনামলগুলোর প্রথমদিকে বা সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথমদিকে সরকার আইনপ্রয়োগে কঠোর থাকায় দখলদাররা রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবৈধ দখল ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে তাদের স্থাপনা সরিয়ে নেয়। কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা আবার অবৈধ জায়গায় ফিরে আসে। এ রহস্যের ও আইনপ্রয়োগের ব্যর্থতার দায়ভার নিশ্চিতভাবে নির্বাচিত সরকারগুলোর উপরেই পড়ে। জমির ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মিত হলে সরকার ও বিচার বিভাগ সক্রিয় হলে তা পুনরুদ্ধার করা মোটেই অসম্ভব নয়।

প্রভাবশালী দখলদাররা যে হারে দেশব্যাপী নদী-নালা, খাল-বিল, পাহাড়-অরণ্য বিভিন্ন অপকৌশলে দখল করে ধ্বংস করছে, তাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা। যার প্রতিক্রিয়া শহরের ব্যাপক জলাবদ্ধতা, উষ্ণায়ন বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং ভূমি ও পাহাড় ধসের মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। জমি দখল হলে তা দেশের আয়তনের উপর প্রভাব ফেলে না কিন্তু, সমস্ত উৎপাদনের ভিত্তি ও দেশের প্রাণ যে প্রকৃতি, তা ধ্বংস হলে সরকারের পক্ষে তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। কোন জমি দখলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর প্রকৃতি ধ্বংসে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশ। নগরায়নের এ যুগে অনেক পুঁজিপতি রিয়েল এস্টেট/হাউজিং ব্যবসার জন্য আবাদি জমি দখলে নিয়ে উচ্ছেদ করছে কৃষকদের। জমিদারদের মতো তাদের এ ভূমিকা দেখে মনে পড়ে কবিগুরুর ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটি- এ জগতে হায়, সেই বেশি চায়, আছে যার ভূরিভূরি; রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি। কিন্তু, আধুনিক সভ্য সমাজে তা একেবারেই কাম্য নয়।

দুর্গাপুর, নেত্রকোনা থেকে

প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর ২০১৫

২৯/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: