মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২২.৮ °C
 
২৯ এপ্রিল ২০১৭, ১৬ বৈশাখ ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

নান্দাইলে চার খুনের নেপথ্যে পারিবারিক কোন্দল

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৫
  • সন্দেহভাজন ঘাতকের লাশ উদ্ধার, আটক ১

বাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ ॥ শুক্রবার রাতে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চ-িপাশা ইউনিয়নের বাঁশহাটি গ্রামে একই পরিবারের পিতা- পুত্রসহ চার সদস্য খুন হয়েছে। গুরুতর জখম হয়েছেন বানেছা (৪৫) নামে এক গৃহবধূ। তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে অপারেশনের পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বানেছা এখন শঙ্কামুক্ত। পারিবারিক কোন্দলের জের ধরে এই হত্যাকা- ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তের পর জানিয়েছে নান্দাইল থানা পুলিশ। তবে এ নিয়ে ভিন্ন কথাও রয়েছে এলাকায়। এক সঙ্গে একই পরিবারের চার সদস্য খুনের ঘটনাকে অস্বাভাবিক দাবি করে অবিলম্বে খুনীদের গ্রেফতার ও বিচার চায় স্বজন ও এলাকাবাসী। নান্দাইলের চ-িপাশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এমদাদুল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এ রকম খুনের ঘটনায় তিনি হতবাক।

এদিকে এই হত্যাকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগে ইসমাইল হোসেন খোকন নামে একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। শুক্রবার রাত সাড়ে ১০ টার দিকে এই হত্যাকা-ের পর ভোর ৫ টার দিকে বাড়ির পাশে পুকুরপাড় থেকে সন্দেহভাজন অভিযুক্ত জামাল (২২)-এর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। জামালের পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। উদ্ধার করা পাঁচ জনের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির পর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য শনিবার পুলিশ কিশোরগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মঈনুল হক ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হারুণ অর রশিদসহ নান্দাইল থানা পুলিশের কর্মকর্তারা। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকা-ের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের লোকজন এসে বিল্লালের বাড়িতে ভিড় জমায়। শনিবার সকাল থেকে এই ভিড় আরও বাড়তে থাকে। এ সময় বাঁশহাটি গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনহারাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে গ্রামের বাতাস। কেবল নির্বাক থাকে বানেছার বেঁচে যাওয়া দুই প্রতিবন্ধী সন্তান। একসঙ্গে চারজন হত্যাকা-ের সময় তারা আরেক ঘরে ছিল। এদিকে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকা-ে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছে স্বজন ও এলাকাবাসী।

পুলিশ জানায়, বাঁশহাটি গ্রামে শুক্রবার রাতে আকস্মিক হামলায় নিহতরা হচ্ছে কাঠমিস্ত্রি বিল্লাল হোসেন (৫৮), পুত্র কাঠমিস্ত্রি ফরিদ (৩০), শিক্ষার্থী পাভেল (১৬) ও হিমেল (১৫)। পাভেল ও হিমেল স্থানীয় বাশাটি হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। এই চারজনকে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে ঘটনাস্থলেই হত্যা করা হয়। হামলায় গুরুতর আহত বিল্লালের স্ত্রী বানেছাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়েছে। বানেছার পিঠে ছুরিকাঘাতের জখম রয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন বানেছা জানান, শুক্রবার সকালে স্থানীয় ফিশারিতে বঁড়শি ফেলে একটি কৈ মাছ ধরে দেবর কাজলের পাঁচ বছরের শিশুপুত্র কোরবান। লাল মিয়া ছিল এই ফিশারির পাহারাদার। এই ঘটনায় কোরবানকে মারধর করে লাল মিয়া। এর প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে লাল মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের মারধর করে বোন কোহিলা বেগম ও তার মেয়েরা। বোন-ভাগ্নিদের হামলার সময় ছোট ভাই বিল্লাল ও তার ছেলেরা লাল মিয়ার পক্ষ হয়ে প্রতিরোধ না করার জের ধরে শুক্রবার রাতে নির্মম নৃশংসতার শিকার হয় বিল্লাল ও তার পরিবারের সদস্যরা। বানেছা আরও জানায়, শুক্রবার তারাবি নামাজের পর লাল মিয়ার পুত্র সিএনজি চালক জামাল তাদের বাড়িতে এসে কুশলাদি জিজ্ঞাসার এক পর্যায়ে প্রথমে এক পুত্রকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। একই সঙ্গে আরেক পুত্র ও স্বামী বিল্লালকে কুপিয়ে আঘাতের পর বানেছাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় জামাল। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় পিতা-পুত্রসহ চারজন। গুরুতর আহত হয় বানেছা। এলাকাবাসী বানেছাকে উদ্ধার করে নান্দাইল স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যালে পাঠিয়ে দেয়। হামলার পর বানেছার বসতঘর রক্তে ভেসে যায়। শনিবার সকালে গিয়ে বসতঘরের নানা জায়গায় ও হাঁড়ি -পাতিলসহ আসবাবপত্রের গায়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ লেগে থাকতে দেখা যায়। বানেছার ভাতিজা শহীদুল ইসলাম জানায়, বাঁশহাটি গ্রামের পাশাপাশি থাকেন সহোদর লাল মিয়া, বোন কোহিলা। আরেক পাশে থাকেন সহোদর বিল্লাল ও কাজল। কাজলের শিশুপুত্র কোরবানকে মারধরের জেরে বোন কোহিলা ও তার মেয়েদের হামলার সময়ে বিল্লাল কেন লাল মিয়ার পক্ষ নেয়নি, এমন ক্ষোভেই শুক্রবার রাতে এই হত্যাকা- ঘটে বলে জানায় শহীদুল। স্থানীয় সূত্র জানায়, বড় ভাই লাল মিয়ার সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ চলছিল বোন কোহিলা, ভাই কাজল ও বিল্লালের। লাল মিয়ার দুই পুত্র কামাল ও জামাল অটোরিক্সার চালক। কামাল এলাকায় ও জামাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অটোরিক্সা চালাত। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় ক’দিন আগে কামালের অটোরিক্সা আটক করে নান্দাইল থানা পুলিশ। এই অটোরিক্সা ছাড়িয়ে আনতে কোহিলার কাছে নগদ ৪০ হাজার টাকা ধার চেয়েছিল ভাই লাল মিয়া। কোহিলা টাকা ধার না দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয় লাল মিয়া। নান্দাইল পুলিশ প্রথমে টাকা ধার নিয়ে এমন বিরোধের জেরে হত্যাকা- ঘটতে পারে বলে দাবি করলেও পরে ভোল পাল্টে পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই এই হত্যাকা- বলে জানায়।

শনিবার রিপোর্ট পাঠানো পর্যন্ত সময়ে (বিকেল সাড়ে ৪টা) এই ঘটনায় থানায় কোন মামলা দায়ের করতে আসেনি স্বজনরা। তবে নান্দাইল থানা পুলিশ জানিয়েছে, লাশের ময়নাতদন্ত ও দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নিহতদের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করতে আসবে বলে কথা হয়েছে। তবে এটি শনিবার সম্ভব না হলেও রবিবার মামলা হবে। সন্দেহভাজন খুনীদের গ্রেফতারে শনিবার দিনভর বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এ পর্যন্ত খোকন নামে একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকে লাল মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা বসতবাড়ি ফেলে পালিয়ে গেছে। পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা শনিবার ঘটনাস্থল থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মনিটরিং করেছেন। একই সঙ্গে দিনভর থানা পুলিশের সঙ্গে জেলার উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাদের বৈঠক ও তদন্ত তদারকির কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৫

০৫/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: